গরু মোটাতাজাকরণ করে সহজে লাভবান হওয়া যায়

কৃষিবিদ ড. এম এ মজিদ

উৎপাদন খুবই কম। এ দেশের অধিকাংশ গরু হাড্ডিসার হওয়ার প্রধান কারণ পরিমিত পরিমাণ খাদ্য সরবরাহ না পাওয়া এবং বিভিন্ন প্রকার রোগব্যধির আত্রমণ। দেশের অধিকাংশ গরুই কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাই যে পরিমাণ খাবার খায় তাও শরীরের কাজে লাগে না। সুতারাং গরুকে যদি কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়ানো হয় এবং সুষম খাদ্য সরবরাহ করা হয়, তাহলে গরুর স্বাস্থ্য ভাল হবে এবং বেশি মাংস উৎপাদন হবে। কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে যেমন- বেশি দামে বিক্রি করা, কোরবানী, বিয়েশাদী ইত্যাদি উপলক্ষে এক থেকে দুই বছরের পুরুষ গরুকে (বকনা কম বৃদ্ধি পায় তবে অসুবিধা নাই) বিশেষ পদ্বতিতে উন্নত মানের খাদ্য প্রদান করে অল্প সময়ে অধিক মাংসল করে গড়ে তোলাকে গরু মোটাতাজাকরণ বলে।

সুবিধাঃ (১) অল্প সময়ে অধিক মুল্যে গরু বিক্রি করা যায়। (২) কম সময়ের মধ্যে মুলধন খাটিয়ে লাভবান হওয়া যায়। (৩) অধিক মাংশ দেশের চাহিদ মেটায়। (৪) কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। (৫) আর্থিক ক্ষতির ঝুকি কম। (৬) বাড়ির উচ্ছিষ্ট খাদ্য যেমন- ভাতের মাড়, তরকারির খোশা, চাউলের কুঁড়া, খুদ ইত্যাদি খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়।

005

গরু মোটাতাজাকরণ পদ্বাতি :

(১) কর্মসূচির উপযুক্ত সময়ঃ কোন বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে (যেমন- কোরবানী, বিয়েশাদী প্রভৃতি) এ কর্মসূচী গ্রহণ করলে ভাল হয়। তবে বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে করলে শীতের সময় এ কাজ ভাল হয়; কারণ এ সময় আবহাওয়া ঠাণ্ডা থাকে এবং রোগ বালাই কম হয়।

(২) গরু নির্বাচনঃ (ক) গরুর বয়স দেড় থেকে আড়াই বছর হলে ভাল তবে এর কম বেশি হলেও চলে। (খ) উচু, লম্বা, চওড়া, প্রশস্ত কিন্তু শরীরে মাংস কম (কারণ কম মাংস হলে সস্তা হবে)। (গ) সংকর জাত হলে বেশি ভাল হয়। (ঘ) চামড়া ঢিলা, ঘাড় খাটো ও পায়ের হাড় চওড়া। (ঙ) রং এর দিক থেকে সুন্দর হতে হবে যেমন- লাল বা কালো হলে ভাল হয়। (চ) নীরোগ কিন্তু অপুষ্ট। (ছ) পা ছোট, সোজা ও দেহের আকৃতি বর্গাকার হলে ভাল হয়।

(৩) বাসস্থান নিমার্ণঃ প্রতিটি গরুর জন্য ১.৫ মি. ২ মি. আয়তন বিশিষ্ট ঘর তৈরি করতে হবে। টিনের বা শনের দ্বারা ছাউনি দিতে হবে, তবে তাপ যেন বেশি না লাগে  তার জন্য চালার নীচে ছামিনা বা কোন পর্দা দিতে হবে। গরুর ঘরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করতে হবে এবং প্রয়োজনে বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরের এক পাশ্বদিয়ে নালা রাখতে হবে এবং ঘরটি একটু ঢালু হলে মল মূত্র সহজে বের হবে ও ঘর পরিস্কার থাকবে।

(৪) কৃমি ও অন্যান্য পরজীবীর চিকিৎসাঃ কৃমি গবাদি পশুর জন্য মারাত্ত্বক ক্ষতিকর। তাই গরু ক্রয়ের পর প্রত্যেক গরুকে গোবর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে কৃমি নাশক ঔষধ খাওয়ানো উচিত। গরু যদি কলিজা কৃমি বা ফুঁক আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে ফেসিনেক্স ট্যাবলেট প্রতি ৭৫ কেজি ওজনের মাংসের গরুর জন্য একটি করে খাওয়ানো যেতে পারে। পশুর শরীরে উকুন, আঠালি, মাছি প্রভৃতি দ্বারা আক্রান্ত হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে দমন করতে হবে।

(৫) সুষম খাদ্য সরবরাহঃ মোটাতাজাকরণের জন্য বিশেষ ধরণের খাবার দিতে হবে, যার মধ্যে শর্করা, আমিষ, চর্বি, ভিটমিন ও মিনারেলযুক্ত খাবার থাকে ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করতে হবে। এ জন্য কাঁচা ঘাস, গমের ভুসি, চাইলের কুঁড়া, ভুট্টা ভাংগা, তরকারির উছিষ্টাংশ, ঝোলা গুড় খাবার দিতে হবে। মোটাতাজাকরণে ইউরিয়া ও ঝোলা গুড় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া যাবে না। ইহা খড় বা মোলাসেস ব্লক তৈরি করে খাওয়ানো যায়। মোটাতাজাকরণের জন্য ১০০-১৫০ কেজি ওজনের একটি পশুকে প্রতি দিন (ক) সবুজ ঘাঁস ১০-১৫ কেজি। (খ) ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খড় ৩-৪ কেজি। (গ) দানাদার খাদ্য – চাউলের কুঁড়া ১ কেজি, গমের ভুসি ১.২৫ কেজি, খৈল ৪০০ গ্রাম, হাড়ের গুড়া ৫০ গ্রাম, লবণ ৫০ গ্রাম, ঝোলা গুড় ২৫০ গ্রাম ও পরিস্কার পানি প্রয়োজনমত খাওয়াতে হবে।

(৬) রোগব্যাধি ও চিকিৎসা : পশুর যে কোন প্রকার রোগ হলে বা বৃদ্ধি ঠিকমত না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আগে থেকে টিকা দিতে হবে।

পশু মোটাতাজাকরণ করে অল্প সময়ে মুলধন খাটিয়ে অধিক পরিমাণ অর্থ উপর্জন করা যেতে পারে। তাই এ পদ্বতি অবলম্বন করে অধিক পরিমান মাংস উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মেটানো যেতে পারে এবং বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক অর্থ আয় করা যেতে পারে।

————————————–

লেখক :

প্রভাষক, কৃষিশিক্ষা বিভাগ, সিটি কলেজ, নাটোর।

মোবাইলঃ ০১৭২২-৪০৩২২০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare