গলদা চিংড়ির আগাম ব্রুড উৎপাদন কৌশল

জান্নাত ঝুমা

বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানী বাণিজ্যে গলদা চিংড়ির (Macrobrachium rosenbergii) ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই চিংড়ি চাষের প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে সময়মত মজুদের জন্য গুণগত মানসম্পন্ন পোনার অপ্রাপ্যতা অন্যতম। গলদা চিংড়ির চাষের সময় তুলনামূলকভাবে বেশী (৬-৮ মাস)। এই চিড়ির ব্রুড তৈরীর জন্য সর্বানুকূল তাপমাত্রা হচ্ছে ২৮-৩২০ সে.। শীত মৌসুমে তাপমাত্রা কম থাকার কারণে সাধারণত মার্চের শেষ হতে এপ্রিল মাসে গলদার ব্রুড সহজপ্রাপ্য হয় এবং এরপর পোনা তৈরীতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে। এতে চাষীদের কাছে গলদার পোনা মে মাসের শেষ নাগাদ সহজপ্রাপ্য হয় এবং এরপর পোনা হতে বাজারজাত উপযোগী চিংড়ি তৈরীর জন্য ৪-৫ মাসের বেশী সময় পাওয়া যায় না। কারণ নভেম্বর মাস হতে পানির তাপমাত্রা ২০০ সে. এর নীচে নেমে যায় এবং এই তাপমাত্রায় গলদার বৃদ্ধি বাঁধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে চাষী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি ফেব্রুয়ারি মাসে গলদার ব্রুড সহজপ্রাপ্য করা যায়, তাহলে মার্চের শেষ নাগাদ চাষীদের কাছে পোনা সহজপ্রাপ্য করা যাবে। এতে চাষী বাজারজাত উপযোগী গলদা চিংড়ি তৈরীর জন্য যথেষ্ট সময় পাবে। এ লক্ষ্যে গলদার আগাম ব্রুড উৎপাদনে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনষ্টিটিউট এর বাগেরহাট জেলায় চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের অর্থায়নে খুলনার পাইকগাছাস্থ লোনাপানি কেন্দ্রে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, গ্রীন হাউজ পদ্ধতিতে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গলদা চিংড়ির ব্রুড উৎপাদন করা সম্ভব।

পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি

যে এলাকায় পুকুরের পানি প্রয়োজনবোধে পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা যায়, সে এলাকায় গ্রীন হাউজ পদ্ধতিতে আগাম পরিপক্ক গলদা চিংড়ি উৎপাদন পুকুর নির্বাচন করা বাঞ্চনীয়। তাছাড়া, গ্রীন হাউজ পুকুরের জন্য এমন স্থান নির্বাচন করা আবশ্যক, যেখানে সার্বক্ষণিক সূর্যের আলো পাওয়া সম্ভব হবে। সাধারণতঃ পুকুরের আকৃতি আয়তাকার এবং আয়তন ১৮০-২০০ বর্গমিটার হলে গ্রীন হাউজ তৈরী এবং এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয়।

গ্রীন হাউজ তৈরী

শীত মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর হতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুকুরের পানির তাপমাত্রা গলদা চিংড়ির প্রজনন অঙ্গের উন্নয়ন উপযোগী মাত্রায় (২৮-৩২০ সে.) রাখার জন্য পুকুরের উপরে গ্রীন হাউজ তৈরী করা হয়। এ ধরণের হাউজ তৈরীর জন্য প্রথমে বাঁশের চটা দিয়ে দোচালাকৃতি ফ্রেম তৈরী করা হয়। এই ফ্রেমের উপরে স্বচ্ছ পলিথিন নিয়ে এমনভাবে ঢেকে দেয়া হয় যাতে কোথাও কোন ফাঁক না থাকে এবং প্রয়োজনে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য দু’পাশে কিয়দংশ খুলে দেয়া যায়। দোচালার ফ্রেম এমনভাবে স্থাপন করতে হয়, যাতে দুই চালের মাঝ বরাবর পানি হতে চালার দূরত্ব ১৮০-২০০ সে.মি. থাকে। এতে গ্রীন হাউজের ভিতরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। পলিথিনের পুরুত্ব ০.৪-০.৫ মিলিমিটার হলে নির্দিষ্ট মাত্রায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। অধিক পুরু পলিথিন ব্যবহারের ফলে তাপমাত্রার অতি বৃদ্ধিতে চিংড়ির পীড়ন হতে পারে। পলিথিন যাতে বাতাসে উড়তে না পারে সেজন্য একটি বাঁশের চটার তৈরী ফ্রেম পলিথিনের উপরে স্থাপন করা যেতে পারে।

পুকুর প্রস্তুতি

পুকুরের তলা হতে ৬-৮ সেন্টিমিটারের বেশী কাদা তুলে ফেলে, প্রতি ১০০ বর্গমিটারে ২.৫০ কেজি হারে পাথুরে চুন ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর পুকুরে ১.০-১.৫ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পানি সরবরাহ করে ২৫ পিপিএম হারে পানিতে ডলো চুন প্রয়োগ করতে হবে। পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য অপর্যাপ্ত হলে ২.০-২.৫ পিপিএম হারে ইউরিয়া এবং ২.৫-৩.০ পিপিএম হারে টিএসপি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। চিংড়ির আশ্রয়ের জন্য পুকুরে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ২/৩ স্থানে ঝোঁপ তৈরী করা যেতে পারে, যা চিংড়ির খোলস পাল্টানোর সময় আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করবে।

চিংড়ি মজুদ

নভেম্বর মাসের ২য় সপ্তাহে যখন সাধারণতঃ পুকুরের পানির তাপমাত্রা কমতে শুরু করে তখনই গ্রীন হাউজযুক্ত পুকুরে চিংড়ি মজুদ কতে হবে। প্রতি দুই বর্গমিটারে ১টি অর্থাৎ প্রতি শতাংশে ২০টি হারে বাছাইকৃত সুস্থ সবল স্ত্রী ও পুরুষ চিংড়ি ৫ঃ১ অনুপাতে পুকুরে মজুদ করতে হবে। প্রতিটি স্ত্রী চিংড়ির ওজন ৬০-৮০ গ্রাম এবং পুরুষ চিংড়ির ওজন ১০০-১২০ গ্রাম হওয়া বাঞ্চনীয়। স্ত্রী চিংড়ির ওজন যত বেশী হবে তত ডিমের পরিমাণ ও বাজার মূল্য বেশী হবে। মজুদকৃত পুরুষ চিংড়ির দ্বিতীয় চলন পদ যাতে নীল ও লম্বা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, এ ধরণের পুরুষ চিংড়ি প্রজনন প্রক্রিয়ায় অধিকতর সক্রিয় থাকে।

খাদ্য সরবরাহ

গলদা চিংড়ির ব্রুড তৈরীর জন্য ৪৫% প্রোটিনসমৃদ্ধ দানাদার খাদ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। প্রতিদিন সকালে ও বিকালে মোট মজুদকৃত চিংড়ির ওজনের ৩-৪% হারে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। প্রতি কেজি চিংড়ির খাদ্যে ১-২ মিলি হারে কড লিভার তৈল মিশিয়ে নিয়ে প্রয়োগ করলে ডিম পরিপক্কতা ত্বরান্বিত হতে সহায়ক হয়।

পানি ব্যবস্থাপনা

গ্রীন হাউজ পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ির আগাম ব্রুড উৎপাদনে পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য পুকুরে সার্বক্ষণিকভাবে একটি থার্মোমিটার ঝুলিয়ে রাখতে হবে এবং সকাল-দুপুর-বিকালে পুকুরের পানির তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। কোন কারণে যদি পানির তাপমাত্রা ৩২০ সে. এর বেশী হয়ে যায় তাহলে পলিথিনের কিয়দংশ খুলে দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পিএইচসহ পানির অন্যান্য গুণাগুন যথাযথ মাত্রায় রাখার জন্য প্রতি পনের দিন অন্তর পানিতে ১০-১৫ পিপিএম হারে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে। পানির স্বচ্ছতা যদি ৩০ সেন্টিমিটারের চেয়ে কমে যায় তাহলে পুকুরের ১০-১৫% পানি পরিস্কার স্বাদু কিংবা অল্প লোনা (২-৩ পিপিটি) পানি দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে। অধিক লবণাক্ত পানি চিংড়ির পরিপক্কতায় বিলম্ব ঘটাতে পারে। এ ছাড়া প্রতি পনের দিন অন্তর পানিতে চুন প্রয়োগের পূর্বে কিছু পানি পরিবর্তন করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। তবে কোনভাবেই একবারে ১০% এর বেশী পানি পরিবর্তন করা উচিত হবে না। এতে তাপমাত্রা অধিক বমে গিয়ে চিংড়ির পীড়ন হতে পারে। চিংড়ির গায়ে কালো দাগ বা শ্যাওলা পরিলক্ষিত হলে, প্রতি ১০০ বর্গমিটারে ৩৫০-৪০০ গ্রাম হারে জিওলাইট প্রয়োগ করা যেতে পারে।

চিংড়ির পরিপক্কতা পরীক্ষা

মজুদের পনের দিন পর থেকে প্রতি সাত দিন অন্তর ঝাঁকি জাল টেনে চিংড়ির পরিপক্কতা পরীক্ষা করতে হবে। চিংড়ির পেটে কমলা রংয়ের ডিম পরিলক্ষিত হলেই সে চিংড়ি ধরে পোনা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারীতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায় যে, সম্পূর্ণ শীত মৌসুমে পুকুরে গ্রীন হাউজ পদ্ধতিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গলদা চিংড়ির প্রজননক্ষম ব্রুড উৎপাদন করা সম্ভব।

আয়-ব্যয়

দু’শত বর্গমিটার একটি পুকুরে গলদা চিংড়ির ব্রুড উৎপাদনের জন্য টা. ৭,৭৪০/- ব্যয় করে টা. ১২,৬১২/- নীট মুনাফা হতে পারে।

পরামর্শ

             পুকুরের উপরে এমনভাবে গ্রীন হাউজ তৈরী করতে হবে যাতে বাতাসে পলিথিন খুলে না যায়।

             মজুদের জন্য সুস্থ ও সবল চিংড়ি নির্বাচন করা বাঞ্চনীয়

             পুকুরে পানি ব্যবস্থাপনার উপর যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare