গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুর গুড়

নিতাই চন্দ্র রায়

খেজুরর গুড় বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেজুরের গুড় ছাড়া শীতকালে পিঠা-পায়েশ তৈরির কথা ভাবাই যায় না। শীত আসার সাথে সাথে সারা দেশে খেজুরগুড় তৈরি ধুম পড়ে যায়। গাছিরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে রস সংগ্রহ, রস জ্বাল ও গুড় তৈরি কাজে।

খেজুর গাছ রাস্তার ধারে, বাড়ির আশে-পাশে, জমির আইলে, পুকুর পাড়ে, রেল লাইনের পাশের পরিত্যক্ত স্থানে অযতœ-অবহেলায়  জন্মাতে দেখা যায়।  খেজুর গাছ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ, যা থেকে  প্রতি বছর কৃষক  গুড় তৈরির  মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। সারা দেশে বিক্ষিপ্তভাবে  এই বন্য প্রজাতির গাছটির  চাষ হলেও  যশোর  এবং নাটোর জেলায় সবচেয়ে বেশি খেজুরের চাষ  হয়ে থাকে। বৃহত্তর রাজশাহী, ফরিদপুর ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলা সমূহেও  প্রচুর  পরিমাণে খেজুরের গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে।

খেজুর গাছের ব্যবহার বহুবিধ। এর পাতা, কান্ড, ফলসহ গাছের প্রতিটি অংশ কোনো না কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়।  খেজুরের পাতা কাঁচা ঘরের ছ্ওানি, বেড়া, এবং কাঠ ঘরের খুঁটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।  খেজুরের পাতা দিয়ে পাখা, ঝুড়ি, মাদুর ও বিভিন্ন খেলনা তৈরি করা হয়।  খেজুরের শুকনো ডাল  বা পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।  খেজুর রসে শতকরা  ১৫ থেকে ২০ ভাগ শর্করা বিদ্যমান, যা থেকে উন্নত মানের সুস্বাদু গুড় ও সিরাপ তৈরি করা হয়।  খেজুরের গুড় আখের গুড়ের চেয়ে অধিক মিষ্টি ও পুষ্টিকর। এছাড়া খেজুরের গুড় সুন্দর ঘ্রাণ ও স্বাদের জন্য  প্রসিদ্ধ।  খেজুরের গুড়ে আখের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট ও খনিজ পদার্থ বিদ্যমান।  শীতকালে গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস একটি জনপ্রিয় পানীয়।  এ ছাড়া খেজুরের গুড় দিয়ে মিঠাই, মন্ডা, সন্দেশ ও রকমারী পিঠা প্রস্তুত করা হয়। খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা ও পায়েশ খুবই সুস্বাদু।

খেজুর গাছ থেকে বেশি পরিমাণে গুড় উৎপাদনের জন্য এদের পরিচর্যা প্রয়োজন। সতেজ গাছ থেকে বেশি পরিমাণে রস পাওয়া যায়।  খেজুর গাছে বছরে দুই বার সার প্রয়োগ করতে হয়।  রস আহরণ শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে একবার এবং  শীতকাল শুরু হওয়ার পূর্বে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আর একবার।  প্রতিবার গাছের বয়স ভেদে ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম টিএসপি ও ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পটাশ সার গাছের চারপাশে প্রয়োগ করলে  গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে এবং  রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।  এছাড়া সময় মতো গাছের চারপাশের আগাছা দমন করা উচিত।  যেহেতু খেজুর গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে, তাই  বাঁশের খুঁটি দিয়ে চারপাশে ৩ থেকে ৪টি গর্ত  করে উল্লিখিত পরিমাণ সার এক সঙ্গে মিশিয়ে গর্তের ভিতরে দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে।  খেজুরের পুরুষও স্ত্রী উভয় প্রকার গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়।  গবেষণায় দেখা গেছে তুলনামূলকভাবে  স্ত্রী গাছের তুলনায় পুরুষ গাছে রস কম হয়। তবে পুরুষ গাছের রসে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে।  রস সংগ্রহের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বছর বয়সের সুস্থ ও সবল গাছ নির্বাচন করতে হবে।  যেসব গাছ দেখতে সুস্থ ও সবল, সেসব গাছ নির্বাচন করলে অধিক রস পাওয়া যায়। গাছির দক্ষতা ও গাছ কাটার  ওপরও  রস সংগ্রহ অনেকটা নির্ভর করে।  পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, গাছের বেড়ের এক তৃতীয়াংশ অংশ লম্বা ও ৭.৫ সেমি প্রস্থ করে গাছ কাটলে বেশি পরিমাণ রস পাওয়া যায় এবং গাছের কোনো রকম ক্ষতি হয় না। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি গাছ পরিস্কার কাজ শুরু করতে হয়। গাছ পরিস্কার করার পর পর্যাক্রমে প্রতিদিন গাছ কাটতে হয়, যাতে গাছে রস নিঃসরণ শুরু হয়।  কোনো কোনো গাছ কাটা শুরুর ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যেই রস নিঃসরণ শুরু হয়। এরপর কাটা অংশের যেখানে রস নিঃসরণ শুরু হয়, সেখানে একটি ইউ আকৃতির চিকন  বাঁশের কাঠির আধা ইঞ্চি পরিমাণ গাছে ঢুকিয়ে দিতে হয়। ইউ আকৃতির কাঠির মধ্য দিয়ে রস ফোঁটায় ফোঁটায় গাছের ঝুলন্ত হাড়িতে জমতে থাকে। তবে গাছ একবার কাটলে ৩ থেকে ৪ দিন রস সংগ্রহ কর উচিত এবং পরবর্তী ২ থেকে ৩দিন গাছ শুকাতে হয়।  এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে গাছ দীর্ঘস্থায়ী হয়।  প্রাপ্ত বয়স্ক একটি গাছে নভেম্বর মাস হতে মধ্য মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে দৈনিক ১০ থেকে ২০ লিটার রস পাওয়া যায়।  রস সংগ্রহের পর প্রতিবার হাড়ি ধুয়ে পরিস্কার করে রোদে শুকাতে হয়। এতে সংগৃহীত রস গাজানো বন্ধ থাকে।  অনেক সময় কাঠ বিড়ালী, বুলবুলি, কাক, বাদুর ইত্যাদি পাখি খেজুরের হাড়িতে বা রসের নলে বসে রস খায়। এসব পাখির মাধ্যমে যাতে কোনো রোগ জীবাণু ছড়াতে না পারে সেজন্য গাছে হাড়ি ঝুলানোর সময় হাড়ির মুখ জাল বা নেট দ্বারা ঢেকে দিতে হয়।

স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত মানের খেজুরের গুড় বা সিরাপ উৎপাদনের জন্য রস সংগ্রহের পর পরিস্কার কাপড় দিয়ে রস ছেকে চুলার ওপর বসানো লোহার বা স্টিলের কড়াইয়ে ঢালা হয়। চুলার ওপর কড়াই বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে কড়াই  ও চুলার মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে। আরও খেয়াল রাখতে হবে যেন চিমনী থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসে কড়াইয়ের রসের সাথে মিশতে না পরে। রস জ্বাল দেয়ার প্রথম অবস্থায় রসের উপরিভাগে যে গাদ ভেসে উঠে তা দ্রুত সম্ভব ছাকনি বা হাতা দিয়ে ফেলে দিতে হবে। তারপর রস ঘনীভূত হলে ঘনীভূত রস হাতা দিয়ে অল্প তুলে ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলে দেখতে হবে শেষের ফোঁটার আঠালো ভাব দেখা যায় কিনা। ঘনীভূত রস আঠালো বা সিরাপের মতো দেখা গেলে তা নামিয়ে সিরাপ তৈরি করতে হবে। গুড় তৈরি করতে চাইলে কড়াইয়ের ফুটন্ত ঘনীভূত রস হাতলের সাহায্যে লাগাতার নাড়তে হবে এবং চুলার তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। গুড় তৈরির জন্য চুলা থেকে ঘনীভূত রস নামানোর সময় নিশ্চিত করতে চাইলে হাতলের সাহায্যে এক চিমটি পরিমাণ গুড় কিছু ঠান্ডা পানিতে ছেড়ে দিতে হবে। গুড় দ্রুত জমাট বদ্ধ হলে বুঝতে হবে গুড় চুলা থেকে নামানোর উপযোগী হয়ে গেছে এবং চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে দ্রুত ঠান্ডা করতে হবে।

শীত মৌসুমে সংরক্ষিত গুড়ে তেমন ক্ষতি না হলেও বর্ষা মৌসুমে সংরক্ষিত গুড়ের প্রায় ৩০ ভাগই খাবার অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। অর্ধ তরল প্রকৃতির গুড় সচরাচর মাটির বড় বড় পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়।  মাটির পাত্রে গুড় সংরক্ষণ তুলনামূলকভাবে খরচ কম বিধায় অধিকাংশ গুড় ব্যবসায়ী মাটির পাত্রে গুড় সংরক্ষণ করে থাকেন।  কোনো কোনো এলাকায় ২০ কেজি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন  টিনের পাত্রে গুড় সংরক্ষণ করা হয়, তবে এই পদ্ধতি কিছুটা ব্যয়বহুল।  এক গবেষণায় দেখা গেছে, রং করা মাটির পাত্রে মোম বা পলিথিন দিয়ে মুখ বন্ধ করে গুড় সংরক্ষণ করলে দীর্ঘদিন গুড় ভাল থাকে।

৫০ থেকে ৬০টি খেজুর গাছের একটি বাগান থেকে রস সংগ্রহ করে সিরাপ বা গুড় তৈরি করে একজন গুড় উৎপাদনকারী  ৫ থেকে ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিবারেরর সারা বছরের ভরণপোষণ মিটাতে পারে।

বাংলাদেশে হাইওয়ে আছে ২ হাজার ৫’শ মাইল, গ্রাম্য কাঁচা রাস্তা রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মাইল, ইট বিছানো রাস্তা রয়েছে প্রায় ১হাজার ৫’শ মাইল। নিয়মিত বাঁধ ও বেড়িবাঁধ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাইল। মিটার গেজ রেল পথ রয়েছে ১২ শত মাইল ও ব্রড গেজ রেল পথ রয়েছে ৬ শত মাইল। এই ১ লাখ ৬ হাজার মাইল রাস্তার দু’ধারে ১৫ ফুট দূরে দূরে  অব্যহৃত জমির  ১/৪ অংশে লাগানো সম্ভব হলেও ১ কোটি ৪৫ লাখ  খেজুর গাছ লাগানো সম্ভব।  এ ছাড়া বরেন্দ্র  এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির  আইল  ও রাস্তার দু’ ধারে পুকুর ও খালের পাড়ে কয়েক কোটি খেজুর গাছ লাগানো সম্ভব। প্রতি বছর যদি এক কোটি গাছ হতে  গড়ে ১০ কেজি হিসেবে  গুড় উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তবে এক লাখ টন খেজুর গুড় উৎপাদন সম্ভব, যার বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৬০ টাকা হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা। খেজুর চাষ বৃদ্ধি, উন্নত ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসম্মত সিরাপ ও গুড় উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং  দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হবে। বিদেশে খেজুর গুড়ের বেশ চাহিদা রয়েছে।তাই সিরাপ ও গুড় প্রস্থত কুঠির শিল্প হিসেবে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে। দামে সস্তা হওয়ার কারণে এক শ্রেণির অসাধু ইট ভাটার মালিক  ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ধ্বংস করছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী হাজার হাজার খেজুর গাছ। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় খেজুর গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে দেশ থেকে। তাই এ ব্যাপারে এখন থেকেই  সরকারিভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে খেজুর গাছ নিধনের মতো গর্হিত কাজ।

————————————–

লেখক:

মহাব্যবস্থাপক(কৃষি), নর্থ বেঙ্গল, সুগারমিলস্ লিঃ, গোপালপুর, নাটোর

মোবাইল: ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়া

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *