চামড়া শিল্পঃ বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির হাতছানি

 

নিতাই চন্দ্র রায়

স্বাধীনতার  ৫০ বছর পুর্তি উপলক্ষে ২০২১ সালে সরকার ৬০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তার মধ্যে শুধু পোশাক  খাত থেকে রপ্তানি হবে ৫০ বিলিয়ন ডলার আর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি হবে ৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে চামড়া শিল্প থেকে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। এটিকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে যা যা দরকার তার সব কিছুই করবে বর্তমান সরকার।

সম্প্রতি রাজধানীর হোটেল ওয়েসিনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রডাক্ট অফ দ্যা ইয়ার-২০১৭ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এসব কথা বলেন। ৭তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রপ্তানিতে যেসব পণ্যের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে চামড়া অন্যতম। রপ্তানি ক্ষেত্রে  প্রতিবছর একটি পণ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে প্রডাক্ট অফ দ্যা ইয়ার-২০১৭ ঘোষণা করেছেন এবং সরকার সে মোতাবেক এখাতের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।  বর্তমানে চামড়াজাত দ্রবাদি রপ্তানি খাতে ১৫ শতাংশ হারে নগদ আর্থিক প্রণোদনা এবং সাভারে চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তরিত শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রাষ্ট ও ফিনিশিড লেদার রপ্তানির বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে রপ্তানি ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।  এক তথ্যে জানা যায়, শুধু পশুর শরীর থেকে সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রতি বছর মোট চামড়ার প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া লবণের উচ্চমূল্য, পর্যাপ্ত ঋণের অভাব এবং চামড়ানগরীতে রাস্তাঘাটের দূরবস্থা ও ত্রুটিপূর্ণ বর্জ্য ব্যস্থাপনার কারণেও ব্যাহত হচ্ছে এ শিল্পের কাঙ্খিত অগ্রগতি। গ্রীষ্মকালে কোরবানি ঈদ হলে ট্যানারি মালিকগণের পক্ষে চামড়া সংরক্ষণ বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে চামড়া ছাড়ানোর ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই লবণ দিয়ে তা সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু পরিবহনের দীর্ঘসূত্রিতা, অতি মুনাফা প্রবণতার কারণে অনেক সময় চামড়া যথাযথ সময়ে এবং পরিমাণ মতো লবণ দেওয়া হয়না। আবার সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করায় বহু চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। ৭৫ কেজি এক বস্তা লবণের দাম সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে থাকে। বর্তমানে তা ১  হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।  এ কারণে একটি চামড়া সংরক্ষণে ১০ কেজি লাগলে দেওয়া হচ্ছে ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ। এতে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঈদের তিন মাস আগে ট্যানারি মালিকগণ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় লবণ মিল মালিকদের ৫ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দিলেও ট্যানারি মালিকদের কোনো লবণ আমদানির অনুমতি দেয়নি। ফলে লবণের দাম কমেনি।

পরিসংখ্যানে প্রকাশ, গত কোরবানি ঈদে এক কোটি ৫ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল সারা দেশে। কিন্তু এ বছর হাওর এলাকা ও দেশের উত্তারঞ্চলে বন্যার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে কোরবানি পশুর সংখ্যা ২৪ শতাংশ কমে ৮০ লাখ হতে পারে। এর মধ্যে গরুর চামড়া ৫০ লাখ এবং অন্যান্য পশুর চামড়া হতে পারে ৩০লাখ।  উল্লেখ্য, দেশে সংগ্রহকৃত চামড়ার ৪৮ শতাংশ পাওয়া যায় কোরবানির ঈদের সময় এবং বাকিটা পাওয়া যায় সারা বছরের জবাইকৃত পশু থেকে।

২০১২-১৩ অর্থ বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হতে আয় হয় ৯৮ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। তার পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে  এখাতে আয় হয় ১১২ কোটি ৪১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার এবং ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়। তারপর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে  তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। এতে দেখা যায় প্রতি বছরই এ খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে রপ্তানি আয় ও পণ্যের পরিমাণ। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে চামড়ার পাশাপাশি জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট ও মানিব্যাগ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া চামড়ার তৈরী নানা ফ্যান্সি পণ্যের চাহিদাও রয়েছে। বাংলাদেশে প্রচুর হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এসব পণ্য তৈরী করে বিশ্ব বাজারে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার হলো- ইটালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স জার্মানি, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। এর বাইরে জাপান, ভারত, নেপাল ও অস্ট্রেলিয়াতেও সম্প্রতি  সময়ে পণ্যটির বাজার গড়ে ওঠেছে। তবে বিশ্বে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো জাপান। মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ যায় জাপানের বাজারে। বিশ্বে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বর্তমান বাজার ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের হিস্যা হলো শতকরা ০.৫ ভাগ। তবে এটা আরো অনেক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালে এদেশে মোট ৩০ টি ট্যানারি ছিল। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হলেও মূলত নব্বই-এর দশক  থেকে এই চামড়া শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব  দেয়া হয়। যদিও এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত প্রায় ৮ লাখ শ্রমিকের অবস্থা এখনও শোচনীয়। কাজের সময় কোনো রকম মাস্ক ব্যবহার  না  করা এবং চামড়ার প্রক্রিয়াকরণ কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষতিকর দিক সর্ম্পকে তাদের সম্মক ধারণা না থাকার  কারণে প্রতি বছরই বহু শ্রমিক আক্রান্ত হচ্ছে নানা জটিল রোগ ব্যাধিতে। নানা সমস্যা সত্ত্বেও চামড়া শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভাল মানের কাঁচা মালের প্রাপ্যতা এবং সস্তা শ্রমিকই এগিয়ে নিয়ে গেছে সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী এ শিল্পটিকে। সাভার ট্যানারি নগরীতে ১৫৫ টি প্রতিষ্ঠানে মধ্যে প্রায় ৭০ টি কারখানা  চালু হলেও বাকিগুলো এখনও চালু হয়নি।

চলতি বছর বিভিন্ন কারণে কোরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে। কোরবানির পশুর চামড়া মজুদদার ও পাচারকারিদের হাতে চলে যাওয়া, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর নিয়ে টানাপড়েন, ট্যানারি গুলোর পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়া এবং বিদেশী ক্রেতাদের আস্থাহীনতা গোটা চামড়া শিল্পে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। সরকার বরাবরের মতো এবারও ঈদুল আজহায় পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু তা গড়পড়তা বাজারের চেয়ে কম। এরপর ট্যানারি মালিকরা এক জোট হয়ে সেই দাম আরো কমিয়ে দেয়। এই সুযোগে মজুদদার ও এক শ্রেণির মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কিছুটা বাড়তি দামে কাঁচা চামড়া সংগ্রহে তৎপর হয়ে ওঠে। আর মৌসুমী ক্ষুদে ব্যবসায়ীরাও কিছুটা লাভের আশায় ঝুঁকে পড়ে তাদের দিকে। কোরবানির দিনই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা এভাবে মাঠ পর্যায়ের বেশিরভাগ চামড়া মজুদদার ও পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এদিকে ট্যানারিগুলো পর্যাপ্ত ঋণ না পেয়ে নগদ অর্থে অধিক দামে চামড়া কিনতে পারছে না। এ অবস্থায় সংগৃহীত চামড়া অজানা স্থানে মজুদ করছে ব্যবসায়ীরা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব কাঁচা চামড়া নগদে একটু বাড়তি দামে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশের বাজারে চামড়ার মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। ফলে সংগৃহীত চামড়ার বড় অংশই সে দেশে পাচার হয়ে যাওয়া আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর এ আশঙ্কা  সত্যি হলে, দেশের চামড়া শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসবে। দেশও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হবে।

ঈদুল আজহার আগে রাষ্ট্র মালিকানাধীন চারটি ব্যাংক চামড়া কেনার জন্য ৭৬৮ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ঋণ দেয়া হয় ৩০০ কোটি টাকারও কম। গত বছর এ খাতে ৪৬৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছিল। কোরবানি পশুর চামড়া নিয়ে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। তাই এসময় ট্যানরি মালিকদের  ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বাড়ানো হলে তারা অগ্রিম মূল্য দিয়ে চামড়া কিনতে পারতেন। সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে  প্রচুর ব্যয় করার কারণে অনেক ট্যানারি মালিক গত বছর ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। এজন্য ব্যাংকগুলো এবছর ওই সব ট্যানারি মালিকদের আবার নতুন ঋণ দিতে পারেনি।

বাংলাদেশ ট্যানার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানের মতে, ট্যানারিগুলিতে প্রক্রিয়াকরণ শুরু হলে যে তরল বর্জ্য নির্গত হবে, তাতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। কারণ এখনই বর্জ্য সড়ক উপচে পড়ছে। শ্রমিকরা হাঁটতে পারছেনা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের। বিসিক যদি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক ভাবে না করে তাহলে ট্যানারি মালিকরা কিছুই করতে পারে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়  বড় ধরনের ত্রুটি থাকায় হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্পের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত সৃষ্টি হচ্ছে।  তাই পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। প্রয়োজনে চীনা ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করে অভিজ্ঞ ইউরোপীয় ঠিকাদার নিয়োগ  করা উচিত।

২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে চামড়াও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়। এধারা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রপ্তানি থেকে ৯ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখা এই চামড়া খাতকে শক্তিশালী করতে ট্যানারি কারখানার আধুনিকায়ণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো, চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণের উৎপাদন বৃদ্ধি, সঠিক পদ্ধতিতে পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ , সংরক্ষণ এবং পাচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা  গ্রহণসহ ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক  প্রচার এবং সচেতনা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

————————————–

লেখকঃ

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ

৪৫/১ হিন্দু পল্লী , ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

ইমেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare