চালের যৌক্তিক মূল্য ও কৃষকের লাভ-ক্ষতি

নিতাই চন্দ্র রায়

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা ছলিমপুর গ্রামের  একজন প্রগতিশীল কৃষক মোঃ আঃ রাজ্জাক প্রতি বছর এক একরের মতো জমিতে আমন ধানের চাষ করেন। এবারও তিনি আমন মৌসুমে ১ একর ১৩ শতক জমি থেকে ব্রিধান -৪৯ জাতের ৫৪ মন ধান উৎপাদন করেন এবং প্রতিমন ধান ১ হাজার ৬০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে ৫৭ হাজার ২৪০ টাকা আয় করেন। ৫৪ মন ধান উৎপাদনে তাঁর খরচ হয়েছে ২৭ হাজার টাকা। এতে তাঁর লাখ হয়েছে ৩০ হাজার ২৪০ টাকা। জমির খাজনা ১৫  হাজার টাকা বাদ দিলে তাঁর প্রকৃত লাভ হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ২৪০ টাকা। অনেক দিন পর ধান উৎপাদন করে লাভ হওয়াতে এবং আমন ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়াতে তিনি বেশ আনন্দিত। তাঁর কথা-বোরো ধানে খরচ বেশি। সেচ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক বাবদ যে খরচ হয়, ধান বিক্রি করে  সেই পরিমাণ অর্থও তোলা যায় না। ধানীখোলা গ্রামের আর একজন ক্ষুদ্র কৃষক মোঃ সেকান্দর আলী তাঁর ৫৬ শতক জমিতে এ বছর ব্রি-৪৯ জাতের আমন ধানের চাষ করে ধান পেয়েছেন মাত্র ৬ মণ। অসময়ে বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয় এবং গাছ হেলে পড়ার কারণে ফলন বিপর্যয় ঘটে। ৫৬ শতক জমিতে  ধান চাষে তার খরচ হয় ১০ হাজার টাকা। আর ধান বিক্রি করে আয় হয় ৬ হাজার ৬০০ টাকা। এতে তাঁর লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা। বাংলাদেশের কৃষি যেহেতু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, তাই এ ধরনের ফলন বিপর্যয়ে  কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এখানে কৃষি বিমা নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের বাঁচানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে কৃষক। উন্নত দেশগুলির অতিরিক্ত কার্বন নিসঃরণের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে বাষ্পীভবন। বাড়ছে বৃষ্টিপাত। আর এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে অসময়ে। মানছে না অতীতের কোনো নিয়ম-কানুন ও সময়সূচি, যার সাথে সামঞ্জস্য নেই আমাদের শস্য বিন্যাসের। ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য যখন বৃষ্টির প্রয়োজন, তখন হচ্ছে খরা আর যখন প্রখর সূর্যালোকের প্রয়োজন, তখন বৃষ্টি ভাসিয়ে নিচ্ছে মাঠের পাকা ফসল। গত বোরো মৌসুমে চৈত্র মাস থেকেই আগাম বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে পাকা ধান ডুবে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের সর্বস্বান্ত করে দেয়। আবার কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের অতি বৃষ্টিতে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পৌষ মাসের বৃষ্টিতে সবজি চাষিদেরও কম ক্ষতি হয়নি। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্বির সঙ্গে সঙ্গে  ফসলের পোকা-মাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ  বৃদ্ধি পাচ্ছে। বালাইনাশক ক্রয়ের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। বিনষ্ট হচ্ছে শস্যের গুণগতমান। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। বাড়ছে নদীভাঙ্গন ও লবণাক্ততা। এসব কারণে মাটি হারাচ্ছে তার উর্বরতা শক্তি। তাহলে কীভাবে বাঁচবে কৃষক?

আমন ধান কাটার পর পাবনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা নাটোর ও রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক মসুর, খেসারি ডাল, ধনে ও কালোজিরা  চাষ করে কিছু বাড়তি অর্থ আয় করতো। এবার কার্তিক মাসে মাসে অতিবৃষ্টির কারণে সে সুযোগটিও পাননি তাঁরা। আগে উত্তরাঞ্চলে বছরে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ ইঞ্চির বেশি বৃষ্টি হতো না। খরা প্রবণ ওই অঞ্চলে একসময় প্রচুর আখের চাষ হতো। আগাম আখের সাথে সাথি ফসল হিসেবে আলু, পেঁয়াজ, রসুন , মসুর, সরিসাসহ চাষ হতো নানা রকম শীতকালীন শাক-সবজির। আখ বিক্রি করে কৃষক অন্য ফসলের চেয়ে অনেক বেশি লাভ করতেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে। আখের জমিতে প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস পানি জমে থাকে। জলাবদ্ধতার কারণে আখের ফলন, চিনি ও গুড় আহরণ হার কমে গেছে। আখ চাষ এখন অলাভজনক হয়ে পড়েছে। এতে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হাজার আখ চাষি বিপদে পড়েছে। সরকার বারবার আখের দাম বাড়িয়েও মিল এলাকায় আখের আবাদ, ফলন ও চিনি উৎপাদন এবং চিনি আহরণ হার বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে না। ভারতে দৈনিক গড়ে সূর্যালোক পাওয়া যায় ১২ ঘণ্টা বাংলাদেশে পাওয়া যায় ৬ ঘণ্টা। কম সূর্যালোক ঘণ্টার কারণে বাংলাদেশে চিনি আহরণ হার ও ভারতের চেয়ে অনেক কম-প্রায় অর্ধেক। এছাড়া পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের উষ্ণ আবহাওয়া এবং উঁচু জমি আখের উচ্চ ফলন ও চিনি আহরণ হারকে ত্বরান্বিত করে। আখের চেয়ে ঘাত সহিষ্ণু ফসল পৃথিবীতে  আর দ্বিতীয়টি নেই। আখ খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, পোকা-মাকড় ও ঝড়-জলোচ্ছাসের সাথে যুদ্ধ করে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। অন্য ফসল তা পারে না। তাই কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আখের মতো ঘাত সহিষ্ণু ফসলের চাষাবাদ, গবেষণা ও এর বহুমুখী ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। সেই সাথে উপকূলীয় অঞ্চলে আখের বিকল্প সুগারবিট চাষের কথাও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বিবেচনা করতে হবে  লবণাক্ত সহিষ্ণু ধান ও পাট চাষ বিষয়ে।

দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশার কারণে রোপণকৃত বোরো ধানের চারা লাল হয়ে মারা যাচ্ছে। এতে বেশ বিপাকে পড়ছে কৃষক। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কথা-এক একর জমিতে বোরো ধান রোপণে  জমি তৈরী, চার উৎপাদন, সার প্রয়োগ, পানি সেচ, চারা লাগানোসহ খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকা। পুনরায় চারা লাগাতে আবার একর প্রতি অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এতে কৃষক একদিকে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন অন্যদিকে বিলম্বের কারণে ফলন কম হওয়ার  আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল থেকে সময় মতো বন্যার পানি নেমে না যাওয়ার কারণে  বোরো ধানের চারা রোপণ  কাজও বিলম্বিত হচ্ছে এবং হতাশায় ভোগছে হাওরাঞ্চলে হতভাগ্য কৃষক।

গত ১৫ নভেম্বর, সরকারের খাদ্য অধিদপ্তর যখন প্রতিটন আমন ধানের দাম করে ২৬ হাজার ৬৭ টাকা ৫৬ পয়সা নির্ধারণ করে , তখন টিসিবির মূল্য তালিকা অনুযায়ী প্রতি কেজি স্বর্ণা. বিআর-১১ ও গুটিস্বর্ণা চাল বাজারে বিক্রি হয়েছে  প্রতি কেজি ৪২ টাকা ৪৮ টাকা কেজি দামে। একমণ ধানে সর্বোচ্চ ২৭ কেজি চাল পাওয়া যায়।  সে হিসেবে সরকার নির্ধারিত ধানের দর অনুযায়ী  প্রতি কেজি চালের দাম হবে ৩৮ টাকা। অথচ বাজারে এ দামে সর্বনি¤œ মানের চালও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কোনো কৃষক সরকারের কাছে এ দামে চাল বিক্রির চিন্তাও করেনি। চাতাল মালিক, মিলারও কৃষকদের দাবি, চালের উচ্চ  মূল্য এবং বাজারে ধানের দাম পর্যালোচনা না করেই সরকার আমন ধানের দাম  নির্ধারণ করেছে। এজন্য বোরোর মতোই আমন সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে  এবং বিদেশ থেকে চাল আমদানি করেই খাদ্য ঘাটতি পূরণ করতে হবে। জেলা খাদ্য কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলে ছিলেন- বোরো ধানের দামের চেয়ে মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে সরকার ধানের দাম প্রতি কেজি ২৬ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করলেও তা যৌক্তিক হয়নি। কারণ বাজারে চালের দর এখন ও অনেক চড়া। এ ছাড়া নানা প্রতিকূলতার কারণে কৃষকের প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ টাকা।  গত বোরো মৌসুমে সারা দেশে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান সংগ্রহের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও অধিকাংশ জেলাতে সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। কোনো কোনো জেলায় এ কর্মসূচি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। অনেক মিল মালিক সরকারের সাথে চাল সরবরাহ চুক্তি ও করেনি। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারে চালে দাম বেশি থাকায় চুক্তি করলেও কোনো কোনো মিল মালিক সরকারি গুদামে কোনো চালই সরবরাহ করেনি। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে বোরোতে ১৫ লাখ টন ধানচাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পৌনে তিন লাখ টন ধানচাল সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি। চালের বাজার নিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধানচালে দাম নির্ধারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্যের ফলে দেশের ধান উৎপাদনে নিয়োজিত কৃষকেরা যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি বেশি দামে চাল কিনে সাধারণ ভোক্তারও ক্ষতিগ্রস্ত হন।  গবেষণায় বলা হয়, প্রতিবেশি দেশ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফা করছেন অতিমাত্রায়।  কৃষকরা দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ করে প্রতি কেজি ধানে ১ থেকে ২ টাকার বেশি মুনাফা করতে পারে না। দাম নির্ধারণে অক্ষমতার কারণে। অনেক সময় তারা বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হন। অন্যদিকে ধান থেকে চাল তৈরি প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যবসায়ী ও মিলাররা সেই ধান কেনে কৃষকের বিক্রি দামের চেয়ে দেড়গুণ বেশি দাম দিয়ে।  এতে মিলারদের ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়াতে ধানের দামের ৫০ শতাংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।  কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ২৪ টাকা দামে ধান কিনে তার সঙ্গে আরো পঞ্চাশ শতাংশ খরচ যোগ করেও চালকল মালিকদের যৌক্তিক মুনাফাসহ প্রতি কেজি চালের দাম ৪০ টাকার মধ্যে থাকাই যুক্তিযুক্ত।

বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী মহোদয়গণের মতে প্রতি কেজি চালের দাম ৪০ টাকার আশেপাশেই থাকবে। চালের দামের সাথে কৃষকের উৎপাদন খরচের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। প্রতিমণ বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। ওই ধান যদি তাঁরা ১০০০ টাকা মণের নিচে বিক্রি করেন, তা হলে কৃষকে লোকসান গুণতে হবে? ধান বিক্রি করে যদি আমাদের অন্নদাতা কৃষকে লোকসানই দিতে হয়, তাহলে তাঁরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে- যে দেশে এক কেজি লবণের দাম ৪০ টাকা,  আটার দাম ৩৫ টাকা , পানির লিটার ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচের কেজি ৬০ টাকা এবং একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা, সেদেশে  এক কেজি চালের দাম ৪০ টাকার কম হলে কৃষক বাঁচবেনা। বাঁচবেনা কৃষি নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি।

————————————–

লেখকঃ সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ, ৪৫/১ হিন্দু পল্লী, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

মোবাইলঃ ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare