চালে আর্সেনিক বিষ

আর্সেনিকের বিষাক্ততার কথা নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজন হলেও খাদ্যচক্রে এর উপস্থিতির কথা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে৷ আর্সেনিকের প্রকোপ দিন দিন বেড়ে চলেছে৷ সম্প্রতি ন্যাচার গ্রুপের বিজ্ঞান ভিত্তিক জার্নালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, আর্সেনিকযুক্ত মাটিতে উত্‍পাদিত চালের মাধ্যমে ক্যান্সার হতে পারে৷ ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজির বিজ্ঞানীরা পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন গ্রামের ৪১৭ জনের ওপর গবেষণা করে এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন৷ পানীয় জলের মাধ্যমে মানবদেহে আর্সেনিক প্রবেশের বিষয়টি সকলের জানা থাকলেও এবার চালের মাধ্যমে প্রবেশের বিষয়টি নূতন সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে৷ বাংলাদেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬১টি জেলায় ভূগর্ভস্থ পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে এবং সাড়ে তিন কোটি হতে সাত কোটি মানুষ ভবিষ্যতে আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন৷ তার উপর খাদ্যচক্রে আর্সেনিক ঢুকে পড়ার এ প্রমাণ সকলের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি করে তুলেছে৷
আর্সেনিক সমস্যার মূল কারণ অতিমাত্রায় নলকূপের পানির উপর নির্ভরশীলতা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হ্রাস৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী ১ লিটার পানিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক থাকলে সে পানি দূষিত৷ তবে বাংলাদেশের মান অনুযায়ী ১ লিটার পানিতে ৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যনত্ম আর্সেনিক থাকলে তাকে নিরাপদ পানি বলা হয়৷ পানিতে স্বল্প মাত্রায় আর্সেনিক সব সময়ই থাকে৷ কিন্তু মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়ে গেলে তা পানকারীর শরীরের নানা রকম রোগের উপসর্গ তৈরি করে এবং পরবর্তীতে নানা ধরনের রোগব্যাধি সৃষ্টি করে৷ গবেষকদের মতে, আর্সেনিকযুক্ত পানি পানরত ব্যক্তির যকৃত্‍, ত্বক, কিডনি, ফুসফুস ও হৃদপিন্ডের ক্যান্সার হতে পারে৷ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আর্সেনিকের কারণে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জনের হাত-পা ইত্যাদি অংশে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে৷ দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বশেষ জরিপে বাংলাদেশে ৫৬ হাজার ৭ শত ৫৮ জন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত করা হয়েছে৷ আর্সেনিকের কারণে ত্বকে কালো-সাদা দাগ, বৃষ্টির ফোঁটার মতো দাগ, শক্ত অাঁচিলের মতো দাগ থেকে শুরু করে ত্বকের ঘা, গ্যাংগ্রিন এবং ত্বকের ক্যান্সার তৈরি হয়ে থাকে৷ ত্বক ছাড়াও কিডনি, লিভার, পরিপাকতন্ত্র, ফুসফুস, মূত্রথলি, স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদপিন্ডে আর্সেনিকজনিত সমস্যা হতে পারে৷
গত শতাব্দীর ৮০ র দশকে সর্বপ্রথম আর্সেনিক বিষে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়৷ তারপর হতে দিন দিন এর প্রকোপ ও বিস্তৃতি বেড়ে চলেছে৷ খাদ্যচক্রে (ভড়ড়ফ পযধরহ) এতদিন আর্সেনিকের উপস্থিতি না মিললেও এবার চালে পাওয়া গেল আর্সেনিক৷ বিষয়টি নিয়ে দেশের সচেতন মহল এবং বিজ্ঞানীদের ভাবতে হবে৷ সরকারী ভাবে এর ভয়াবহতা ঠেকানোর জন্য নিতে হবে নতুন পদৰেপ৷ বিশেষ করে আমাদের প্রধান প্রধান খাদ্যবস্তুতে এর উপস্থিতি রোধে বিশেষ সতর্কতা মূলক পদৰেপ নিতে হবে৷ জনসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি, আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত রোগী ও ভবিষ্যত্‍ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের চিকিত্‍সার জন্য একটি আর্সেনিক সেন্টার স্থাপন করাও জরুরি৷ আর্সেনিক সমস্যা সমাধানের উপায় বের করতে ভারত এবং বাংলাদেশ একসাথে কাজ করতে পারে৷ কেননা, পশ্চিম বাংলার ভূগর্ভস্থ পানিতেই প্রথম আর্সেনিক বিষের সন্ধান পাওয়া যায়৷ তাছাড়া বাংলা বেসিনের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত৷

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *