ছত্রাকনাশক ম্যানকোজেব: প্রেক্ষাপট ও করণীয়

ড. সেলিম আহম্মেদ, এ.এফ.এম.রুহুল কুদ্দুস ও এম.এম. কামরুজ্জামান

আমাদের কৃষক ভাইয়েরা ফসলের কাঙ্খিত ফলন পেতে বিভিন্ন বিক্রেতার পরামর্শ বা অন্যের দেখাদেখি বাছবিচার না করে বিভিন্ন ধরণের ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে থাকেন৷ এর ফলে, একই গ্রুপের ছত্রাকনাশক বিভিন্ন নামে একই ফসলে বার বার ব্যবহার করেন৷ সহজ সরল কৃষক ভাইয়েরা অসাধু বিক্রেতা বা প্রতিবেশীর কথামত ছত্রাকনাশক পরিবর্তন করে প্রায়শই প্রতারিত হন৷ এ দেশের অধিকাংশ কৃষক ভাইয়েরা ছত্রাকনাশকের বাণিজ্যিক নাম ভালোভাবে জানেন কিন্তু ছত্রাকনাশকের সক্রিয় উপাদান (ধপঃরাব রহমত্‍বফরবহঃ) সম্পর্কে সম্পূর্ণই অজ্ঞাত৷ আমাদের দেশের ছত্রাকনাশকের বাজারে একই গ্রুপের বিভিন্ন বাণিজ্যিক নামের ছত্রাকনাশক পাওয়া যায় তার উদাহরণ, জ্বর নিরাময়ের ওষুধ যেমন নাপা, এইচ, রেনোভা, ফাস্ট বা প্যারাপাইরল এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ৷ উল্লেখিত সব ওষুধই প্যারাসিটামল গ্রুপের এবং বিভিন্ন কোম্পানী বিভিন্ন নামে বিক্রি করে থাকে যেমন নাপা বেক্সিমকো কোম্পানীর, প্যারাপাইরল গ্লাক্সো স্মিথ কোম্পানীর, এইচ স্কয়ার কোম্পানীর, রেনোভা অপসনিন ও ফাস্ট এসিআই কোম্পানীর৷ এখন আমরা যদি জ্বরে আক্রান্ত হই ও নাপা খেয়ে থাকি কিন্তু জ্বর না কমার কারণে পূণরায় এইচ খেয়ে থাকি তাহলে জ্বর কমার কথা নয় কারণ সকল ওষুধই একই গ্রুপের৷ ফসল মৌসুমে কৃষক ভাইয়েরা ফসলের রোগ নিরাময়ে ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যাপক ব্যবহার করে থাকেন৷ কৃষক ভাইয়ের জ্ঞাতকরণের লক্ষ্যে বাজারে ম্যানকোজেব জাতীয় সক্রিয় উপাদান সমৃদ্ধ ছত্রাকনাশকের (১৭ টি) বাণিজ্যিক নামের সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো:
ইন্ডোফিল এম ৪৫ (অটো ক্রপ কেয়ার), ডায়থেন এম ৪৫ (বায়ার), জাজ ৮০ ডবি্লউপি (সিনজেন্টা), নেকজেব (ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার), হেম্যানকোজেব (পদ্মা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড), এমকোজেব ৮০ ডবি্লউপি, কোজেব ৮০ ডবি্লউপি, গ্যালভেন এম, ম্যানজেট ২০০, পেনকোজেব ৮০ ডবি্লউপি, সানকোজেব, ভন্ডজেব, ভিটামিল ৭২ এমজেড, ম্যানকোজেব ৮০ ডবি্লউপি, এডকোজেব ৮০ ডবি্লউপি, নেমিসপোর ৮০ ডবি্লউপি, সিনাজেব ৮০ ডবি্লউপি, প্রভৃতি৷
এদের কার্যকারিতা সবারই এক যেমন প্যারাসিটামল গ্রুপের সমস্ত ঔষধের কার্যকারিতা এক৷
ম্যানকোজেব কি এবং কেন?
ম্যানকোজেব হলো ছত্রাকনাশকের সক্রিয় উপাদান (ধপঃরাব রহমত্‍বফরবহঃ)৷ এটি বহুমুখী (নত্‍ড়ধফ ংঢ়বপঃত্‍ঁস), স্পর্শক ও প্রতিরোধক ক্রিয়াসম্পন্ন ডাইথায়োকার্বামেট জাতীয় ছত্রাকনাশক৷ বাতাসের সাহায্যে ইহা আইসোথায়োসায়ানেটে রুপান্তরিত হয়ে ছত্রাক এনজাইমের সালফাহাইড্রাল (-ঝঐ) গ্রুপকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়৷ আবার কখনো ম্যানকোজেব, ছত্রাক এনজাইমের উপাদান বিনিময় ঘটিয়ে ছত্রাক এনজাইমের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে৷ ইহা ছত্রাকের স্পোর অংকুরোদগম রোধক হিসেবে কাজ করে এবং একই সাথে গাছের উপরিভাগে হালকা প্রলেপ সৃষ্টি করে৷ ফলে রোগজীবাণু গাছের সংস্পর্শে আসা মাত্র মারা যায় এবং বাহির থেকে রোগজীবাণু গাছের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না৷ এ ধরণের ছত্রাকনাশক, রোগের প্রতি প্রতিরোধ (ফরংবধংব ত্‍বংরং:ধহপব) ঝুঁকি কম তৈরী করে৷ ইহা লোয়ার গ্রুপের ছত্রাক দ্বারা সৃষ্ট রোগ যেমন মিলডিউ, ব্লাইট, এনথ্রাকনোজ, লিফ স্পট দমনে ভালোভাবে কাজ করে৷ এটি জিঙ্ক ও ম্যাংগানিজ আয়ন সমৃদ্ধ হওয়ায় ব্যবহারের পরপরই গাছ দ্রুত সবুজ ও সতেজ হয়৷ বিজ্ঞানীরা সাধারণত ০.২% হারে (প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে) পাতায় প্রয়োগ করার সুপারিশ করে থাকেন৷
গোলআলুর জমিতে ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার:
ফরিদপুর অঞ্চলে কিছু পকেট এরিয়াতে ব্যাপক গোলআলুর আবাদ হয়ে থাকে৷ কৃষক ভাইয়েরা গোলআলুর নাবি ধ্বসা (ষধঃব নষরমযঃ) রোগের ব্যাপারে ভীত থাকেন৷ বিশেষ করে যখন কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া বিরাজ করে৷ আলু গাছ রোগ নিরাময় রাখতে তারা বিভিন্ন ছত্রাকনাশক বিক্রেতার কাছে যান ও তাদের পরামর্শ মতো দিশেহারা হয়ে ছত্রাকনাশকও পরিবর্তন করে ফেলেন৷ আলুর চারা মাটি ভেদ করে বের হবার দুই সপ্তাহ পর থেকে, ৪-৫ বার দুই গ্রুপের ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে থাকেন৷ এর মধ্যে প্রতিরোধক হিসেবে ৩ বার ম্যানকোজেব ছত্রাকনাশক ও পরবতর্ীতে প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে ১-২ বার ম্যানকোজেব + মেটালেক্সিল জাতীয় সক্রিয় উপাদান সমৃদ্ধ ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেন৷ প্রথম যে ৩ বার ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেন তার মধ্যে ১ম বার ইন্ডোফিল এম ৪৫ (অটো ক্রপ কেয়ার), ২য় বার নেকজেব (ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার) ও ৩য় বার হেম্যানকোজেব (পদ্মা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড)৷ বিক্রেতার কথামতো নির্দিষ্ট ছত্রাকনাশক না পাওয়ায় কৃষক পাগলপারা হয়ে যান৷ মনে করেন যে তার ফসল আর ভালো হবে না৷ এক্ষেত্রে কৃষকের আত্ম্নতৃপ্তি যে, বারবার বিভিন্ন বাণিজ্যিক নামের ছত্রাকনাশক (অথচ একই গ্রুপের) প্রয়োগ করায় ফসল রোগমুক্ত থাকবে৷ এভাবে বাণিজ্যিক নাম পরিবর্তন দ্বারা কৃষক প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হন৷ যেমন: ২০১৩-১৪ রবি মৌসুমের প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি হেম্যানকোজেবের দাম ৬৫৪ টাকা, নেকজেবের দাম ৭৮০ টাকা ও ইন্ডোফিল এম ৪৫ এর দাম ৭৩২ টাকা৷

হেম্যানকোজেব যদি তিন বারই ব্যবহৃত হতো তাহলে খরচ পড়তো ১৯৬২ টাকা (৬৫৪ টাকা ী ৩ বার)৷ আর যদি কৃষককে শিখানো ছত্রাকনাশকের নামতা অনুযায়ী তিন বার ভিন্ন ধরণের বাণিজ্যিক নাম সমৃদ্ধ ছত্রাকনাশক ব্যবহার হয় তাহলে কৃষক ভাইয়ের খরচ পড়ে ২১৬৬ টাকা (৬৫৪ টাকা + ৭৮০ টাকা + ৭৩২ টাকা)৷ এর ফলে, একক ছত্রাকনাশক ব্যবহারের চেয়ে ২০৪ টাকা (২১৬৬ টাকা – ১৯৬২ টাকা) বেশী খরচ পড়ে৷ এভাবে কৃষক নিজের অজান্তেই উত্‍পাদন খরচকে বাড়িয়ে তোলেন৷
এক্ষেত্রে নিচে উল্লেখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে:
১) কৃষক ভাইদের ছত্রাকনাশকের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ৷
২) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কতর্ৃক ছত্রাকনাশক সম্পর্কিত আধুনিক গবেষণার ফলাফল কৃষকের মাঝে সমপ্রসারণ৷ এ ব্যাপারে বিএআরআই এর সরেজমিন গবেষণা বিভাগ অগ্রুী ভূমিকা পালন করতে পারে৷
৩) জেলা পর্যায়ে কৃষি সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন দপ্তর (কৃষি গবেষণা, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর, বিএডিসি, ছত্রাকনাশক কোম্পানী) এর মধ্যে কোঅর্ডিনেশন উন্নতকরণ৷
৪) ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও স্থানীয় প্রিন্ট মিডিয়াতে ছত্রাকনাশক প্রচার বৃদ্ধিকরণ৷
৫) স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর থেকে ফসল মৌসুমের পূর্বে ও পরে আবহাওয়া সম্পর্কিত বার্তা প্রচারকরণ৷
৬) ছত্রাকনাশক মোড়কের একপিঠে বানিজ্যিক নাম, গ্রুপের নাম এবং অপর পিঠে এর কার্যকারিতা, মাত্রা, ব্যবহারবিধি প্রভৃতি বিদ্যমান থাকে৷ যা কৃষকভাইদের জানা অপরিহার্য৷

লেখক : সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ফরিদপুর

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *