জাতীয় বাজেট ২০১৪-১৫: কৃষি খাতে বরাদ্দ কমেছে

কৃষিবার্তা ডেস্কঃ গত ৫ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। নতুন বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য আগের বছরের চেয়ে ১১১ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে বাজেটের মোট আকারে কৃষির অংশীদারি কমেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে (সংশোধিত) কৃষির জন্য বরাদ্দ আছে মোট বাজেটের ৫.৬৮ শতাংশ। প্রস্তাাবিত বাজেটে তা কমে ৪.৯৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে কৃষকদের অবদানের ‘স্বীকৃতির’ জন্য এ খাতে করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে কৃষি থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত থাকবে।

পাশাপাশি কৃষকদের উপকরণ সহায়তা দেওয়া, পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া কার্যক্রম গতিশীল রাখা, কৃষি গবেষণা, কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে নতুন বা বিশেষ কোনো উদ্যোগের কথা নেই বাজেট বক্তৃতায়। বরং অর্থমন্ত্রী এক অংশে বলেছেন, সরকার কৃষকের উৎপাদিত শস্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করেছে।

এবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ১২ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা ছিল। ফলে প্রকৃত বরাদ্দ বাড়ল ১১১ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছরের বাজেটের আকার দুই লাখ ১৬ হাজার ২২২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দুই লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা হয়েছে। ফলে বাজেটের আকার বেড়েছে ৫.৩৪ শতাংশ; কিন্তু কৃষির বরাদ্দ আনুপাতিক হারে বাড়েনি, বরং কমেছে। তবে অর্থমন্ত্রী কৃষি-সংশ্লিষ্ট সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে ‘এ দেশের কৃষি খাতকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে সরকারের নীতি-কৌশল যে কোনো মূল্যে অব্যাহত থাকবে।

বর্তমান সরকারের গত পাঁচটি বাজেটের মধ্যে কৃষি আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে। ওই বছর মোট বাজেটের ৮.৫২ শতাংশ ছিল কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য। এর পরের বছর তা কমেছে। পাশাপাশি গত পাঁচ বছরের মধ্যে আনুপাতিক বরাদ্দ হিসেবে এবার কৃষি মন্ত্রণালয়ই সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৭.২৪ শতাংশ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৬.৫৮ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬.৪০ শতাংশ।

বাজেট বক্তৃতায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-কৌশল অংশে কৃষিকে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, সরকার কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রণোদনা অব্যাহত রাখবে। বাজেট বক্তৃতায় ‘অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহে সম্পদ সঞ্চালন অংশে ৪ নম্বরে স্থান পেয়েছে কৃষি। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি। কৃষির অংশে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, গত মেয়াদে সরকার কৃষিক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায় সরকার।

অর্থমন্ত্রী উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে বরাবরের মতো সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে এতে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। তিনি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়তে সহায়তা, কৃষকের ডাটাবেইস করাসহ বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেন।

 

কৃষিতে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব :

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কৃষিতে জৈব প্রযুক্তি ও জেনেটিক প্রকৌশলের উদ্ভাবন ও ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার প্রস্তাব করেছেন। মুহিত বলেন, জৈব প্রযুক্তি এবং জেনেটিক প্রকৌশলের উদ্ভাবন ও ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। পাটের মতো অন্যান্য অনাবিষ্কৃত অর্থকরী ফসলের জীবন রহস্য আবিষ্কার, খরা, লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের সূচিত ধারাকে আরও বেগবান করা হবে। তিনি কৃষি গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সহনশীল রাখার জন্য দ্রুত প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হবে। অর্থমন্ত্রী কৃষির উৎপাদন খরচ কমাতে সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণে সহায়তা করার জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব করেন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটেও কৃষিতে ভর্তুকির জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার কোটি টাকা। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ১২ হাজার ২৭০ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ধরা হয় ১২ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা।

বিশেজ্ঞদের অভিমত: সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি কর্মসংস্থান, বেকারত্বমোচনসহ বিভিন্ন খাতে রয়েছে হতাশার চিত্র। ভর্তুকি না বাড়ার কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষকের সহায়তা বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভর্তুকি বা সহায়তা খাতে নতুন করে ভর্তুকি বাড়েনি। চলতি অর্থবছরেও একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। ফলে কৃষকের বেড়েছে সেচ খরচ। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে সার উৎপাদন খরচও বাড়ছে। সার ও সেচের খরচ বৃদ্ধির কারণে কৃষকের পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়বে। এদিকে বাজেটে জ্বালানি তেলের ট্যারিফ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যার ফলে জ্বালানি মূল্য আরেক দফা বাড়বে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি কৃষককে আঘাত করবে। অপরদিকে ভর্তুকি বৃদ্ধি না পাওয়ায় উৎপাদনের খরচের অধিকাংশ বোঝা সাধারণ কৃষককে বহন করতে হবে। যা গিয়ে উৎপাদন মূল্য বাড়িয়ে দেবে। এতে কৃষি পণ্যের দামও বৃদ্ধির আশংকা থাকছে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *