জাম ফলের বহুগুন

কালো জাম

ড. মোঃ আবুল খায়ের মিয়া*
জাম একটি পরিচিত ঐতিহ্যবাহী গ্রীষ্মকালীন ফল। দিন দিন জাম গাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে প্রজাতিটি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। ইহা একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া জাম ফলের জন্য উপযুক্ত। ইহার উৎপত্তি স্থান বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল ও আফগানিস্তান বলে ধারণা করা হয়। ইহার ইংরেজি নাম Blackberry। কোন কোন সময় ইহা Jaam, Jamun, Jambul, Jambolan বা Jambang নামে পরিচিত। জাম Myrtaceae পরিবারের উদ্ভিদ এবং বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium cuminii| গাছের উচ্চতা ৩০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং জীবনকাল প্রায় ১০০ বছর। কচি অবস্থায় ফল সবুজ থাকে এবং পাকলে কালো বর্ণ ধারণ করে। ফল মিষ্টি হালকা টকযুক্ত ও সু-স্বাদু এবং সুঘ্রান যুক্ত। ফলের আকার অনুযায়ী দু’ধরনের জাম দেখা যায়। বড় জাম কে কালোজাম এবং ছোট জামকে ক্ষুদে জাম বলা হয়। বড় জাম আকারে বড়, মাংসল, নরম ও অত্যন্ত রসালো। ক্ষুদে জাম আকারে ছোট, শক্ত ও অপেক্ষাকৃত কম রসালো। মার্চ মাসে জাম গাছে ফুল আসে এবং জুন-জুলাই মাসে জাম পাঁেক। কালো জাম আগাম পাকে এবং ক্ষুদে জাম নাবিতে পাকে। কালো জাম গাছের আকার আকৃতি ও পাতা বড় হয় এবং ক্ষুদে জাম গাছের আকার আকৃতি ও পাতা অপেক্ষাকৃত ছোট হয়। বাংলাদেশে সর্বত্রই জাম গাছ দেখা যায়। তবে যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলায় ইহার উৎপাদন বেশি দেখা যায়। স্থানীয় ভাল জাতের বীজ নির্দিষ্ট স্থানে রোপন করে বা এক বছর বয়সের চারা রোপন করে জামের আবাদ করা যায়।

উপকারীতাঃ
জাম গাছের ও ফলের বহুবিধ ব্যবহার ও উপকারিতা রয়েছে। ইহা মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির অভাব পুরন করে। পশু পাখির খাদ্যের উৎস। জাম কাঠ একটি উৎকৃষ্ট মানের কাঠ। কাঠ সহজে পানিতে পঁচে না। ইহা আসবাবপত্র, গৃহনির্মান, যন্ত্রপাতি, নৌকা ও কুঠির শিল্পের কাজে ব্যবহৃত হয়। ইহা পরিবেশ সংরক্ষনে সহায়তা করে। ইহার বহুবিধ ওষধি গুন রয়েছে। জামের কচিপাতা পেটের পীড়া নিরাময়ে সাহায্য করে। জাম ফলের রস হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। রক্ত পরিস্কার করে ও রক্তের লোহিত কনিকা গঠনের সহায়তা করে। জামের বীজ থেকে প্রাপ্ত পাউডার বহুমূত্র রোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। পাকা জাম সৈন্ধব লবণ মাখিয়ে ৩-৪ ঘন্টা রেখে চটকিয়ে ন্যাকড়ায় পুঁটলি বেধেঁ টানিয়ে রাখলে যে রস বের হয় তা পাতলা দাস্ত, অরুচি ও বমিভাব দূর করে। জাম ও আমের রস একত্রে পান করলে বহুমুত্র রোগীর তৃষ্ণা প্রশমিত হয়। জামের ছাল পানিতে ভিজিয়ে রেখে চিনিসহ ছালের রস পান করলে আমশয় রোগ দুর হয়। জামের পাতা ও ছালের রস উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করে। জাম ফলের রস রক্তের অতিরিক্ত চিনি হ্রাস করে।
পুষ্টিগুন ঃ
জামে প্রচুর পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ইহাতে উৎকৃষ্টমানের শ্বেতসার, আমিষ ও চর্বি রয়েছে। জাম ফলে উন্নতমানের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। বিভিন্ন প্রকার এনজাইম, কো-এনজাইম ও কো-ভ্যালেন্ট হিসেবে খনিজ উপাদানসমূহ মানুষের শরীরে বিপাকীয় কাজে অংশ গ্রহন করে। এই জন্য মানব পুষ্টিতে জাম ফলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। ফলটি ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, ম্যাংগানিজ, কপার, লৌহ ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ। জাম ফলের গুরুত্বপূর্ন পুষ্টি উপাদান নিম্মের সারণিতে উল্লেখ করা হলো।

খাদ্যোপাদানের নাম  শতকরা হার (%) ও IU
শ্বেতসার ৭৮
আমিষ ৯
চর্বি ৪
অন্যান্য উপাদান ৯
ভিটামিন অ ৬ (৩০৮ ওট)
ভিটামিন ঈ ৫০
ভিটামিন ঊ ৮
ভিটামিন ক ৩৬
বিটাক্যারোটিন ১৮৪ মাইক্রোগ্রাম/১০০ গ্রাম
থায়ামিন ২
রিবোফ্লাবিন ২
নায়াসিন ৫
ভিটামিন ই৬ ২
ফোলেট ৯
প্যানটোথেনিক এসিড ৪
খনিজ উপাদান ক্যালসিয়াম ৪
লৌহ ৫
ম্যাগনেসিয়াম ৭
ফসফরাস ৩
পটাসিয়াম ৭
জিংক ৫
কপার ১২
ম্যাংগানিজ ৪৭
সেলিনিয়াম ১

ব্যবহারঃ
জাম ফল সরাসরি খাওয়া যায় বিধায় পুষ্টি উপাদানের প্রায় সবটুকুই শরীরের কাজে লাগে। জাম থেকে রস, স্কোয়াশ ও অন্যান্য সংরক্ষিত খাদ্য তৈরি করা যায়।

উপসংহারঃ
জাম ফলের বহুবিধ উপকারীতা ও ব্যবহার রয়েছে। তাই ফলটির উপর গবেষণা করা প্রয়োজন। ইহার আবাদ বৃদ্ধি বাংলাদেশে মানব পুষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখতে সহায়ক হবে। বাড়ির আশেপাশে, স্কুল কলেজের পাশে, পতিত জমিতে জামের আবাদ বৃদ্ধির সম্ভবনা রয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে একটি করে জামগাছ থাকলে পরিবারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। প্রজাতিটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের মনযোগী হওয়া আবশ্যক।

*প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর।

 

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *