জিংক সমৃদ্ধ নতুন জাতের ধানঃ বাংলাদেশেই প্রথম উদ্ভাবন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বে সর্বপ্রথম জিংকসমৃদ্ধ একটি উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)৷ ধানটির নাম ব্রিধান ৬২ যা ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধে সহায়ক৷ প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. সাইদুল ইসলাম গত ২৮ আগষ্ট এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন জিংক সমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন৷ গত ২৬ আগস্ট জাতীয় বীজ বোর্ডের ৮০তম সভায় এধান কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অবমুক্তির অনুমোদন দেয় জাতীয় বীজ বোর্ড৷ গাজীপুরে ব্রি কার্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্রি- ধান ৬২-র প্রধান গবেষক ড. আলমগীর হোসেন ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের উর্ধতন কর্মকর্তা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন৷
fr01478
জিংক সমৃদ্ধ ধানের বৈশিষ্ট: ড. সাইদুল ইসলাম জানান, আলোচিত ব্রি- ধান ৬২ জাতটি এখন পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে আগাম ও স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত৷ বায়ো ফর্টি ফিকেশন পদ্ধতিতে বিশ্বে এ রকম ধানের জাত এই প্রথম উদ্ভাবিত হলো৷ তিনি আরো জানান, দেশি ধানের জাত জিরা কাটারি ও ব্রি- ধান৩৯-এর সংকরায়ণ (জৈব গুণ উন্নত ও সমৃদ্ধ) করে প্রচলিত ব্রিডিং পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে৷ মাত্র ১০০ দিনে এ ধান ফলন দেবে৷ গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৫ টন৷ তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব৷ এ ধানগাছের গড় উচ্চতা ১০২ সেন্টিমিটার৷ চাল লম্বা, সরু ও সাদা৷
ব্রির মহাপরিচালক জানান, এখন পর্যন্ত অন্যান্য দেশে জিংকসমৃদ্ধ যেসব সনাতন জাত রয়েছে সেগুলোয় জিংক এর সর্বোচ্চ গড় মাত্রা ১৪ থেকে ১৬ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)৷ আর উদ্ভাবিত ব্রি- ধান ৬২- জিংক এর মাত্রা গড়ে ১৯ পিপিএম৷ অর্থাত্‍ এটি মধ্যম মাত্রার জিংকসমৃদ্ধ জাত৷ জিংকসমৃদ্ধ জাতের ধানের চাল গণমানুষের মাইক্রোনিউটিয়েট চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করবে৷ বিশেষ করে শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি হবে অত্যন্ত সহায়ক৷ দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪০ ভাগের বেশি স্টান্টেড অর্থাত্‍ বেঁটে হয়ে থাকে৷ আর একই বয়সের ৪৪ ভাগ শিশু জিংক ঘাটতির শিকার৷ দস্তা, আয়রন এবং ভিটামিন এ তিনটি অত্যাবশ্যক micronutrients, যার অভাবে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস পায়৷ সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ শিশু জিংকের ঘাটতিজনিত রোগে মারা যায়৷ মানব দেহকোষের গঠন, দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধ, যৌন ক্রিয়া বৃদ্ধি ইত্যাদিতে জিংকের ভূমিকা রয়েছে৷
22
যেভাবে কাজ শুরম্ন হয়: ব্রি-ধান ৬২ ধানের উদ্ভাবকদের অন্যতম ব্রির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলমগীর হোসেন জানান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পার্থ সারথি বিশ্বাস ও রকিবুল হাসানকে নিয়ে তিনি ২০০২ সালে গবেষণা শুরু করেন৷ কয়েক বছর আগে রকিবুল বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেলে তারা দুজন চেষ্টা চালিয়ে চার বছর আগে সফল হন৷ প্রয়োজনীয় গবেষণা শেষে সোমবার জাতীয় বীজ বোর্ড জাতটির অনুমোদন দেয়৷ নতুন জাত উদ্ভাবন করতে পেরে তারা খুব খুশি৷
ডঃ মোঃ আলমগীর হোসেন , বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ( BRRI ) এর উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের একজন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, যিনি ২০০৩ থেকে ধানের মধ্যে জিঙ্ক Biofortification করার দীর্ঘ এবং শ্রমসাধ্য গবেষণায় নেতৃত্ব দেন৷ তিনি এবং তাঁর দল প্রাকৃতিকভাবে উচ্চ ঘনত্বের দস্তা সমৃদ্ধ আদিজাতের ধান চিহ্নিত করতে সৰম হন৷ তারপর তিনি বিভিন্ন জাতের ধানের সাথে উক্ত দসত্মা সমৃদ্ধ আদি জাতের সংকরায়ন করেন৷ যার ফল স্বরূপ সফলতা ধরা দেয় বিজ্ঞানীদের হাতে৷ তিনি জানান, এছাড়াও বোরো মৌসুমে চাষের জন্য উপযুক্ত অন্য একটি দসত্মা সমৃদ্ধ ধানের জাত যাতে ২৪ পিপিএম পর্যনত্ম দস্তা আছে তার সফল ট্রায়েল সম্পন্ন হয়েছে ৷ খুব শীঘ্রই বোরো মৌসুমের জন্য দস্তা সমৃদ্ধ ধান অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হবে বলে তিনি জানান৷
এদিকে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নতুন এ ধানের জাত উদ্ভাবনের তথ্য জানান৷ কৃষিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এ জাত উদ্ভাবন করেন৷ তিনি বলেন, বিরি- ধান ৬২ নামে এ ধান কোন হাইব্রিড ধান নয়৷ দেশীয় ধানের সঙ্গে পরাগায়নের মাধ্যমে এ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে৷ পুষ্টিগুণেও এ ধান সমৃদ্ধ থাকবে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এ ধানের প্রতি কেজি চালে ১৯ মিলিগ্রাম জিংক ও ৯ শতাংশ প্রোটিন থাকবে, যা পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করবে এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করবে৷ আগামী আমন মৌসুম থেকে এ ধান কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে ও এ ধান চাষের জন্য প্রচারাভিযান চালানো হবে৷ তিনি জানান, আন্ত্রিক রোগ (পেটের রোগ) প্রতিরোধে এ ধানের চাল সহায়ক ভূমিকা রাখবে৷

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *