জীব বৈচিত্র রক্ষায় প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বণ্য প্রাণী আমাদের দেশে রয়েছে। জীব বৈচিত্র রক্ষার প্রয়োজনীয় সব আইনি কাঠামোও দেশে রয়েছে। সম্প্রতি সংবিধানে জীব বৈচিত্র রক্ষায় রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। অথচ সরকারি বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবে জীব বৈচিত্র দিনে দিনে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্রের আধার এ দেশের বনভূমিগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। বন বিভাগ প্রাকৃতিক বন কেটে দ্রুত বাড়ে এমন জাতের আগ্রাসী প্রজাতির গাছ রোপণ করছে। বনকে জীব বৈচিত্র রক্ষার জায়গা হিসেবে না দেখে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বে যে ৭২ প্রজাতির শ্বাসমূলীয় গাছ রয়েছে, তার ৬৫টি আমাদের সুন্দরবনে রয়েছে। ১৯৫৯ সালে সুন্দরবনের প্রতি হেক্টর জমিতে ২৯৫টি গাছ ছিল, বর্তমানে তা কমে ১৩০টিতে নেমে এসেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে জীব বৈচিত্র ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে,সুন্দরবনের পাশে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে এ ধ্বংসের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে।

দেশে ভূমি ব্যবহার নীতিমালা করা হয়েছে। কৃষিজমি সুরক্ষা আইন হচ্ছে। একই রকমভাবে জলাশয়, বনভূমিগুলো যাতে ইজারা না দেওয়া যায়, সে জন্য একটি আলাদা খতিয়ান নম্বর থাকা উচিত। যা শুধু জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হবে, এমন আইন তৈরি করতে হবে। দেশের মোট পানিসম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার। এর ৭৫ শতাংশ আসে যৌথ নদীগুলো থেকে, ২০ শতাংশ পানি আমরা বৃষ্টি থেকে এবং ২ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে আসে। অথচ দেশের প্রয়োজনীয় পানির ৭৫ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়। এজন্য আমাদের অবশ্যই ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৫৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ঢাকার ৯০ শতাংশ জলাভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। জলাভূমিগুলো ইজারা দেওয়ায় এখানকার জীব বৈচিত্র ধ্বংস করে মাছের চাষ করা হচ্ছে। সামান্য কিছু টাকার জন্য জলাভূমিকেন্দ্রিক জীব বৈচিত্র ধ্বংস করা হচ্ছে। বিশ্বে যত পাখি রয়েছে, তার ৭ দশমিক ২ শতাংশ বাংলাদেশে দেখা যায়। বন ও জলাশয় ধ্বংসের কারণে দেশের অর্ধেক বণ্য প্রাণীর প্রজাতিই কোনো না কোনোভাবে বিপন্ন। জীব বৈচিত্র রক্ষায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এটি ঘটছে। আমাদের দেশে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে পাঁচ হাজার লিটার পানির দরকার হয়। ফলে কৃষি খাতেই আমাদের বিপুল পরিমাণে পানির দরকার হয়। জীব বৈচিত্রের জন্য পানি রাখতে হলে আমাদের এমন সব জাতের ফসল উদ্ভাবন করতে হবে, যাতে কম পানি দরকার হয়। সরকার ইলিশের প্রজনন সময়ে পাঁচ মাস জাটকা নিধন নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশের জলসীমায় ওই ইলিশ গেলে তারা ধরে খেয়ে ফেলে। তাই ইলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য সম্পদ ও জীব বৈচিত্র রক্ষায় আন্তরাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার।

আমাদের দেশে জলাভূমি ইজারা দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়, এর মৎস্য সম্পদের তদারক করে মৎস্য অধিদপ্তর, বণ্য প্রাণী দেখে বন বিভাগ, পানির মান ও পরিবেশ দেখে পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌপথ দেখে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, সেচ দেখে কৃষি মন্ত্রণালয়। এই সবগুলো সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় আনতে না পারলে জীব বৈচিত্র রক্ষা পাবে না। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাছাড়া শিশু-কিশোরদের পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জীব বৈচিত্র সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। পরিশেষে,সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদেরও সোচ্চার হতে হবে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *