জুম ধান জাত সংরক্ষণ

ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

todays-amazing-pic43

পাহাড়ী কৃষির অন্যতম ঐতিহ্য হলো জুম চাষ। পাহাড়ী জনগোষ্ঠির কাছে জুম চাষ তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এক অনিবার্য অংশ। প্রাচীন কাল থেকে এক গর্তে একাধিক ফসলের বীজ পুতে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একেকটি ফসল কর্তন করে নেবার যে পদ্ধতি সহজ ভাষায় এটিই হলো জুম চাষ। এই জুম চাষের একটি অন্যতম ফসল হলো ধান। অনেক আগে থেকেই পাহাড়ের ঢালে জন্ম লাভ করা নানা রকম ধান থেকে পাহাড়ী মানুষ বাছাই করে নিয়েছে নানা রকম স্থানীয় জাত। জুম চাষে ব্যবহৃত নানা রকম ধান জাতের মধ্যে ধান ও চালের বর্ণ, চালের আকার আকৃতি আর স্বাদে গন্ধে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে এসব ধান জাত চাষের মধ্য দিয়ে এদের সংরক্ষণ করে আসছে জুম চাষীগণ। পাহাড়ে এখন নানা রকম শস্যের প্রবর্তন করা হচ্ছে। অনেক স্থানে গড়ে উঠছে ফলের বাগান। বাড়ছে শাক-সবজি আর মশলা চাষের এলাকা। পাহাড়ী এলাকায় বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। জুম চাষও আজ নানা সমস্যার মুখে পতিত হচ্ছে। ফলে জুম চাষে ব্যবহৃত নানা রকম ফসলের জাতের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে পাহাড়ী ধানের জাতগুলোও।

জুম মাঠের প্রধান ফসলই হলো ধান। জুম মাঠের সিংহ ভাগ স্থানই দখল করে রাখে ধান। মাঝে মাঝে ধান গাছের সাথে একই গর্তে জুমিয়ারা রেখে দেয় অন্যান্য ফসলের গাছ। তাতে বছরের বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করতে পারে অন্যান্য ফসল আর এক সাথে কর্তন করে আনা হয় ধান ফসল। মে-জুনে পুতে দেয়া ধান বীজ সেপ্টেম্বরে এসেই কর্তন উপযোগী হয়ে উঠে। এক বিশেষ ধরনের চাকু যাকে বলা হয় ‘ছরি’ তা দিয়ে এ ধান কর্তন করে নেয় জুমিয়ারা। জুম চাষ থেকে পাওয়া ধানই জুমিয়াদের খাবারের প্রধান উৎস।

জুম ধানের স্থানীয় জাতগুলোর অধিকাংশই আসলে আউশ ধান। ‘আগাম’ বা ‘আশু’ এদের সংগ্রহ করা যায় বলে আর মৌসুমটাও উপযোগী বলে জুম ধানের প্রধান অনুসঙ্গ আসলে আউশ ধানই। পাহাড়েই যুগের পর যুগ আবাদ হয়ে আসছে বলে এসব ধান জাতের অধিকাংশই পেয়েছে পাহাড়ী নাম। নামই বলে দেয় যে এরা পাহাড়ে উদ্ভাবিত ধান। গেলং, রেঙ্গুই, লেংদা, মেলি, সাইপা, কোকরী, চাংখী, রাঙ্গি, চিনল, লংলং, মেনেসা, শেরেপাই, কোবা, আমেই, কামরাং, মমবই, বৈলাম, বার্তুই, মিধুং, চবিচি, চক্কল, ক্রচী, লেঁদা, লেগেং, মবি, রাঙ্গি, করাক এসব বৈচিত্র্যময় পাহাড়ী নাম পেয়েছে একেকটি ধানের জাত। তবে একেবারে বাঙলা নামও পেয়েছে কোন কোন জুম ধান। সোনামুখী, কামরাঙ্গা, মধুমালা, মধুমালতী, সূর্যমুখী, কুমারী এরকম কিছু চমৎকার নামও লাভ করেছে কোন কোন পাহাড়ী ধান। এসব ছাড়াও রয়েছে ফুলবাদাম, ছুরিধান, তুর্কীধান, মেলিধান, হারি, লাল হারি, কালা হারি, সাদা হারি, বৈলাম, সোনালী চিকন, কটকটালী এমনি আরো কত কত ধান জাত। এগুলো অল্প কয়েকটি জুম ধান জাতের উদাহরণ মাত্র। বাস্তবে এখনও পাহাড়ী এলাকায় বিভিন্ন জুম চাষিদের হাতে রয়েছে নানা বৈচিত্র্যময় সব ধান জাত।

খাগড়াছড়িতে পাঁচশয়ের অধিক জুমিয়াদের মাঠ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে, এখানকার জুম চাষে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ধান জাতগুলো হলো- হরিণ বিন্নি, কামারাং ধান, গ্যালংগ ধান, লংকা পোড়া ধান, উতমি বিন্নি, বিন্নি ধান, কামারাং বিন্নি, লক্ষী বিন্নি, ডপচোদই ধান, গুড়ি ধান, তুর্কি ধান, আংগু ধান, কবরক ধান, মেরি ধান, পাট্টি ধান, পটিয়া ধান, মধুমালতি ধান, মনআঙ্গি ধান, এমি ধান, বাদেইয়া ধান, লঙ্গর ধান। এদের মধ্যে মাঝারি স্বাদের ধান জাত হলো পনেরটি। পাঁচটি ধান জাত- হরিণ বিন্নি, উতমি বিন্নি, বিন্নি ধান, কামারাং বিন্নি, লক্ষী বিন্নির ভাত আঠালো এবং এদের চাল পিঠা বানাবার জন্য ব্যবহার করা হয়। আংগু ধান অবশ্য আঠালোযুক্ত নয় তবে এদের উত্তম স্বাদ রয়েছে। কত রকম জীববৈচিত্র্য রয়েছে আমাদের জুম ধানে।

জুম চাষীদের শত শত স্থানীয় ধান জাত এতদিন সংরক্ষিত হয়ে আসছিল জুম চাষ আর পরবর্তী জুম চাষের জন্য জুমিয়াদের গৃহে এসব ধান জাতের বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমে। ফলে এতদিন প্রায় অনেকটাই এসব জাত নিরাপদ ছিল জুমিয়াদের হাতে। এদের কৃত্রিমভাবে জিন ব্যাংকে সংরক্ষণের বিষয়টি এতদিন খুব জরুরী হয়ে পড়েনি। জুম চাষ দিন দিন অলাভজনক হয়ে উঠছে। আগে দীর্ঘ একটি বিরতি দিয়ে পাহাড়ের এক একটি নির্দিষ্ট স্থানের অনাকাড়িক্ষত গাছপালা আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলা হতো। এভাবে জুম চাষ এলাকাটি গাছগাছালি মুক্ত করে চলতো নানা স্থানে গর্ত করে নানা ফসলের বীজ রোপণের কাজ। এখন অনেকটাই পাহাড়ী এলাকায় শুরু হয়েছে ফলমূল শাক-সবজিসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ। তাছাড়া পাহাড়ী জনগোষ্ঠির পাশাপাশি পাহাড়ী এলাকায় বেড়েছে সমতল ভূমির জনগোষ্ঠিও, ফলে কমছে জুম চাষের এলাকা। সে কারণে দু’ তিন বছর বাদেই একই স্থানে চলছে জুম চাষ। আগে যেখানে আট দশ বছর পর পর একটি নির্দিষ্ট স্থানে জুম চাষ হতো এখন তা হচ্ছে বড় জোর দুই কি তিন বছর পর পর। তাতে ফলন যাচ্ছে কমে। মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। একই স্থানে স্বল্প মেয়াদে বারবার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলায় মাটির গঠনই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মাটির নিচে আমাদের অলক্ষ্যে বসবাসরত নানা রকম জীব আর জীবাণু। ফলে অনেকটাই নিরুৎসাহিত হচ্ছে এখন জুম চাষ। জুম চাষের ফলন খানিকটা হ”াস পাওয়ায় এবং ফলমূল, শাক-সবিজ ও মশলা জাতীয় ফসল চাষ সরকারি ভাবে উৎসাহিত করায় জুম চাষে খানিকটা ভাটা পড়তে শুরু করেছে। ফলে জুমিয়াদের হাতে থাকা ধান জাতগুলো আর আগের মত নিয়মিত জুম চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে কোন কোন জাত বিলুপ্ত হয়েছে তো কোন কোন জাত বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। এটি সত্যি সত্যি এক মহা ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জুম চাষে ব্যবহৃত সব ফসলের জাতের ক্ষেত্রেই। আজ তাই এসব ফসলের জাত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা অতি জরুরী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাহাড়ী জুম চাষীদের হাতে রয়েছে অনেক মূল্যবান দুর্লভ সব স্থানীয় ধান জাত। বিন্নি ধানের নানা রকম জাত রয়েছে তাদের সংগ্রহে। রয়েছে দুর্লভ সব লাল চাল, কালো চাল এবং বাদামী চাল বিশিষ্ট ধান জাত। এদের ভাতও যথাক্রমে লাল, কালো এবং বাদামী। লাল আর কালো চাল এখন অত্যন্ত দামী চাল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে এদের বাড়তি এন্টি অক্সিডেন্ট গুণাগুণ থাকার কারণে। বাড়তি দামে এদের বিক্রি করা হয় প”থিবীর কোন কোন দেশে। এসব ধান জাত সংরক্ষণ করা হচ্ছে পরম যতেœ এবং এদের এখন অন্য ধানের সাথে পরাগ বিনিময় করে উদ্ভাবন করা হচ্ছে গুণগত মান সম্পন্ন ধান। জুম চাষ কমে এলে কমে যাবে এমনি বহু ধান জাতের আবাদ। আর এক সময় সকলের অলক্ষ্যে এরা বিলুপ্ত হবে। সেটি কিছুতেই আমাদের কাম্য হতে পারে না বলেই এসব জুম ধানের জাত বৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ খুবই জরুরী। পাহাড়ী এলাকা ছাড়াও সমতল ভূমির ধান জাত উন্নয়নের পাশাপাশি সরাসরিও এসব কোন কোন জাত আবাদ করা সম্ভব হবে সমতল ভূমিতে।

পাহাড়ী জুম ধানের খুব বেশি জাত সংগ্রহ করা এখনও সম্ভব হয়নি বিজ্ঞানীদের। সরকারী ভাবে দুর্গম এলাকার ধান জাত সংগ্রহ অভিযান পরিচালনার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ না থাকায় বলা যায় বিলম্বিত হয়ে পড়ছে এসব দুর্লভ ধান জাত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ। বছর দুয়েক আগে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্গম এলাকার অসংগৃহীত ধানের মূল্যবান সব জিন সম্পদ সংগ্রহের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এতে কিছু জুম ধান জাত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হন ব্রী বিজ্ঞানীরা। তবে এই প্রকল্পের মূল টার্গেট কেবল পাহাড়ী অঞ্চল না হওয়ায় নিবিড়ভাবে ধান জাত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া কিছু সংখ্যক অপেশাদারী লোকজন এসব জিন সম্পদ সংগ্রহ অভিযানে যুক্ত হওয়ায় বিজ্ঞান সম্মতভাবে সব জাতের বীজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব মূল্যবান সম্পদ বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য জুম ধান জাত সংগ্রহ অভিযোগ পরিচালনা করা দরকার এখনই। এসব মূল্যবান জিন সম্পদ আমাদের ফসল উন্নয়নের মূল্যবান কাঁচামালা। এদের কিছুতেই আমরা বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিতে পারিনা। উদ্ভাবন করা দরকার বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতিও, মাটিকে নষ্ট না করে দিয়েও যেন চলে পাহাড়ী অঞ্চলে ধানসহ জুম চাষের অন্যান্য ফসলের আবাদ। মোটকথা, জুম ধানের বৈচিত্র্যময় এসব জাত সংরক্ষণে আমাদের গ্রহণ করতে হবে নানামুখী এবং বাস্তবানুগ কর্মসূচী।

————————————–

লেখকঃ

প্রফেসর, জেনেটিক্স এন্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগ এবং প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর,

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare