জৈব কৃষি উৎপাদনে ট্রাইকোডার্মা

ড. জি এন এম ইলিয়াস:

কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে কৃষির উপর নির্ভরশীল বিশাল জন গোষ্ঠির মাটির প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষা এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে – রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মুক্ত কৃষিপণ্য  উৎপাদনে’ ট্রাইকোডার্মা (এক ধরনের বিশেষ উপকারি ছত্রাক) ও ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করণে আমার এ প্রয়াস।

নিবন্ধের বিষয়টি নতূন এমন কথা বলা যাবে না, কেননা, বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে তো বটেই এমনকি সাধারণ মহলেও চিন্তা-ভাবনা, উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। যদিও উন্নত দেশের ন্যায় পার্শ্ববর্তী ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়োশিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদি দেশ অনেক পূর্ব হতে ’ ট্রাইকোডার্মা (ছত্রাক) ও ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করলেও আমাদের দেশে মাঠ পর্যায়ে বাণিজ্যিক ভাবে ইহার গবেষণা, উৎপাদন ও ব্যবহার নাটোর উন্নয়ন সোসাইটি’র (এনডিএস) ব্যানারে ড. জি এন এম ইলিয়াস ২০০১ ইং সালে প্রথম শুরু করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে যথেষ্ট উন্নতি হলেও কৃষিতে ঐরকম উল্লেখযোগ্য  উন্নয়ন বা আধুনিকতার ছোঁয়া আসেনি। কৃষি ও কৃষক এখনও পূর্বের ধারাবাহিকতায় চলে আসছে, যদিও কৃষক হাইব্রীড বীজ, যথেচ্ছ ভাবে ভূগর্ভের পানি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে  উৎপাদন ধরে রাখতে সচেষ্ট । কিন্তু শুধু হাইব্রীড বীজ, ভূগর্ভের পানি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের উপর ভিত্তি  করে বর্তমানের এই উৎপাদন চেষ্টা কত দিন কিভাবে ধরে রাখতে পারবে, সেটাই কৃষিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। কারণ –  কৃষি উৎপাদন জমি বা মাটি থেকে হয়, ইহা কোন কল-কারখানা থেকে হয় না। সেই জমি বা মাটি যদি তার উৎপাদন শক্তি ধরে রাখতে না পারে বা মাটি যদি তার উর্বরা শক্তি দিন দিন হারিয়ে ফেলে, তা হলে আমাদের উপায় কি ? মাটিতে সাধারণত  অজৈব উপাদান থাকে ৪৫ ভাগ, পানি ২৫ ভাগ, বায়ু ২৫ ভাগ এবং জৈব উপাদান থাকে ৫ ভাগ।

একমাত্র জৈব উপাদান ব্যতীত অন্যান্য উপাদান অস্থায়ী। যা ফসল অনুসারে প্রয়োজন মাফিক কৃত্রিমভাবে দেয়া  হয়ে থাকে। মাটির জৈব উপাদান ৫ ভাগ থেকে ২ ভাগ নেমে  এলেও উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন সম্ভব। গত প্রায় ১৫-১৬ বছর আগেও দেশের ফসলি জমির মাটির জৈব উপাদান গড়ে ৫ থেকে নেমে স্থান ভেদে ২-৩ ভাগ পর্যন্ত এলেও উপযুক্ত পরিচর্যায় ফসলের ভাল ফলন পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে অধিক ফলনের আশায় অনুমান ভিত্তিক যথেচ্ছ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে, গ্রাম-গঞ্জে অতিতের ন্যায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগীর আধিক্য কমে যাওয়া, জ্বালানীর অভাব হেতু ফসলের উচ্ছিস্টাংশ জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ায়, বিশ্রাম বিহীন অনবরত জমিতে ফসল উৎপাদন করায় জমি উহার স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। পূর্বে এতো অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হতো না, কারণ গ্রাম-গঞ্জে প্রচুর গবাদিপশুর গোবর-চনা, ফসলের উচ্ছিস্টাংশ (নাড়া), ঘাস-লতা-পাতা ইত্যাদি পচে জৈবসারে পরিণত হতো। ফলে মাটির জৈব পদার্থে কমতি হতো না। ইহাছাড়া, দুই ফসলের মাঝে জমি বিশ্রাম পেত অর্থাৎ বাড়তি ফসলের প্রয়োজন না থাকায় জমি পতিত থাকত ফলে উহার উর্বরা শক্তি বর্তমানের ন্যায় হারাতো না।  এভাবে চলতে থাকলে মাটির অন্যতম স্থায়ী উপাদন (জৈব পদার্থ) হয়তো একদিন বা অচিরেই শূন্যতে নেমে আসবে। তখন শত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও সেচ দিয়েও কাঙ্খিত মাত্রায় ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। ফসলি জমি পরিণত হবে বন্ধ্যা জমিতে।

অপর দিকে আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন মনে করি, তা হচ্ছে- অধিক রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবে বহু মাইক্রো-ম্যাক্রো অনুজীব (উদ্ভিদ-প্রাণী) আজ মাটি বা জমি থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে এবং জীব বৈচিত্র ধ্বংসের পথে, যাহা কৃষি বা কৃষকের উপকারি ছিল, যেমন- ব্যাঙ, কেঁচো, শামুক ইত্যাদি যা খালি চোখে দেখা যায়। কিন্তু ইহা ছাড়াও যা খালি চোখে দেখা যায় না বা অদেখা বহু মাইক্রোঅর্গানিজম (অনুজীব), যেমন- ট্রাইকোডার্মা, পেনিসিলিয়াম, এ্যাসপারজিলাস ইত্যাদি মাটিতে থেকে মাটির স্বাভাবিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবে এই সকল মাইক্রোঅর্গানিজমও আজ ধ্বংস বা বিলুপ্তির পথে। ফলে ফসলের কাঙ্খিত উৎপাদন আজ হুমকির সম্মখীন, অদূর ভবিষতে খাদ্য শস্য উৎপাদন খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি এবং তা কোন পদ্ধতির মাধ্যমে ?

পরামর্শ: রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাত্রাহীন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যেমন জরুরী তেমনি জমিতে জৈবসার (জৈব পদার্থ) ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করাটাও কম জরূরী নয়। মাটির জৈব পদার্থের  এবং মাইক্রোঅর্গানিজম এর পরিমাণ (Population density of microorganism especially trichoderma) বাড়াতে হবে। বিষয়টি কৃষকদেরকে ঠিকমত বুঝাতে পারলে তাহরা সচেতন হবে এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের  ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন এবং জৈব সার ও ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারে সচেতন ও উৎসাহিত হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরে সম্প্রতি টমেটো চাষের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি শতাংশ জমিতে ৫ কেজি হারে ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত জৈব সার প্রয়োগ করে ৫০% পর্যন্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।  এতে টমেটোর গুণগতমান ও উৎপাদন উভয়ই শুধু রাসায়নিক সারের তুলনায় অনেক ভাল হয়েছে। অন্যান্য সব্জি যেমন – বেগুন, লাউ, বাঁধা কপি, সীম, সরিষা ইত্যাদি চাষেও একই ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে।

ট্রাইকোডার্মা কি ? ইহা  এক ধরণের উপকারি ছত্রাক (অনুজীব), যা উদ্ভিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, বর্ধনে এবং সচেজতা বৃদ্ধি করে। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং ফসলের রোগ দমনে ট্রাইকোডার্মা বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত ও ব্যবহার হয়ে আসছে। ট্রাইকোডার্মা মাটির উর্বরাশক্তি, পুষ্টিমান ও উপকারী মাইক্রোঅর্গানিজম এর আধিক্য বৃদ্ধি করে, ফলে মাটির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট ভাল থাকে ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে।  কম্পোস্টিং প্রযুক্তিতেও ইহা বিশেষ অবদান রাখে, যেমন – কোন বাজে গন্ধ ছাড়া ৫-৬ মাসের স্থলে মাত্র ৪-৫ সপ্তাহে জৈব পদার্থকে জৈব সার বা কম্পোস্ট এ পরিণত করতে পারে।

জৈব পদার্থ বা কম্পোস্ট এর উপকারিতা: জৈব পদার্থ বা ট্রাইকো-কম্পোস্ট অনুর্বর মাটিকে উর্বর করে এবং উর্বরাশক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করে, ফলে মাটি পুষ্টি সমৃদ্ধ হয়, মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে। ট্রাইকো-কম্পোস্ট ফসলের গুনগতমান ভাল করে, রোগ দমনে সহায়তা করে, মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, মাটিতে অবস্থিত অজৈব পদার্থকে উদ্ভিদের  খাদ্যে পরিণত করতে সহায়তা করে, হরমোন সরবরাহ এবং মাটির অম্লতা এবং লবনাক্ততার মাত্রা ঠিক রাখতে সহায়তা করে, কেমিক্যাল সার ও কীটনাশকের আধিক্য জনিত বিষক্রিয়া কমাতে সহায়তা করে। সর্বপরি ট্রাইকো-কম্পোস্ট গাছের খাদ্যভান্ডার হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা রাখে।

উপসংহারে বলা যায় যে, বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান বড় চ্যালেঞ্জ, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যতিরেকে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। তাই, কৃষক পর্যায়ে ট্রাইকোডার্মা ও ট্রাইকো-কম্পোস্ট বা জৈব সার এর  উপকারিতা, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহার বিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সচেনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম হাতে নেয়া খুবই জরুরী । উন্নত দেশের ন্যায় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, থাইল্যান্ড, মালোয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে ট্রাইকোডার্মা ও ট্রাইকো-কম্পোস্ট এর  ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। যা আমাদের দেশেও বিশেষ প্রয়োজন।

 

লেখক: কারিগরী উপদেষ্টা, নাটোর উন্নয়ন সোসাইটি (এনডিএস) এবং মেসার্স রাশ এ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ, কাপুড়িয়াপট্টি, নাটোর-৬৪০০, সেল ফোন: ০১৭১১ ৮৩৮৮৭২

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *