জৈব-বৈচিত্র সংরক্ষণে মালচ প্রযুক্তি

সাধারণভাবে বললে যে কোন আচ্ছাদন ছাড়া মাটিকে আচ্ছাদিত করাকেই মালচিং বলে। আর মালচিং এর জন্য ব্যবহৃত বস্তুকে বলে মালচ। কেউ কেউ মালচকে ঈশ্বরের কম্বল (এড়ফ’ং নষধহশবঃ) বলেও অভিহিত করে থাকেন কেননা বন্য গাছ-পালার নিচে মালচ প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠে। প্রাকৃতিক মালচ হিসেবে সাধারণত খড়কুটা, ঘাস, পাতা, ফসলের পরিত্যাক্ত অংশ, কাঠের ছোট টুকরা বা বাকল প্রভৃতি ব্যবহৃত হয় তবে কৃত্রিম মালচ হিসেবে কোন কোন কৃষক প্লাস্টিকের সিট ব্যবহার করেন। মালচের রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। যেমন: মালচ বৃষ্টির পানির গতি হ্রাসের মাধ্যমে মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, গরম ও ঠান্ডায় মাটির তাপমাত্রায় নিয়ন্ত্রনে ইনসুলেটর হিসেবে কাজ করে, প্রায় বাস্পীভবন ৪০ শতাংশ ইভারেশন হ্রাসের মাধ্যমে মাটিতে প্রচুর পরিমাণে পানি ধরে রাখে, উচ্চ তাপমাত্রায় মাটি ফেটে যাওয়া এবং মাটির উপরিভাগে কঠিন স্তর (ঐধৎফ পৎঁংঃ) সৃষ্টিতে বাধাদান করে মাটির ভঙ্গুরতা রক্ষার মাধ্যমে কর্ষণে সহায়তা করে, মাটিতে হিউমাস ও জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, মাটিতে আলো পৌছাঁনোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে আগাছা বীজের অঙ্কুরোদগমে বাঁধার সৃষ্টি করে এবং অসমতল মালচ শামুক জাতীয় প্রাণিদের চলার পথে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের তাড়াতে সহায়তা করে।  এছাড়া মালচ কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে জৈব বৈচিত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা আজকের আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। মালচ মাটির উপরে একটি উষ্ণ, আর্দ্র এবং স্যাঁতস্যাঁতে চাদরের মত আবরণ তৈরি কারে যাকে উপকারী কীট-পতঙ্গের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান বলা যায়। যদিও কীটÑপতঙ্গ ছাড়াই মালচ মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে তথাপি কীট-পতঙ্গ প্রাকৃতিক মালচ কে ছোট ছোট করে ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে মাটিতে মিশিয়ে দেয় ফলশ্রুতিতে মাটির উর্বরতা এবং গঠন সম্মৃদ্ধি লাভ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে সমস্ত জমিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যাবহৃত হয় সে সব জমিতে প্রাকৃতিক মালচ ধীরে ধীরে ভাঙ্গে এবং মাটির উপরে একটি আলাদা স্তর হিসেবে থেকে যায়।  কাজেই একথা জোড় দিয়ে বলা যায় যে কীট-পতঙ্গ মালচের কার্যকারিতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। আমরা সবাই জানি কেচোঁজাতীয় প্রাণি মাটির অনেক উপকার করে তাই এদের কৃষকের বন্ধু বলা হয়  । তবে শুধু কেচোঁই নয় অনেক পরিণত কীট-পতঙ্গ এবং  লার্ভা কৃষকের বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ জাতীয় কীট-পতঙ্গ মাটিতে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র বা টানেল তৈরী করে যার মাধ্যমে পানি এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান সরাসরি উদ্ভিদের শিকড়ে পৌছে। এছাড়াও এজাতীয় কীট পতঙ্গ মাটিতে পানি ও বায়ুচলাচল বাড়ানোর মাধ্যমে মাটির গঠনগত উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। শক্ত কাদা জাতীয় মাটিতে এ ধরণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টানেলগুলো বৃষ্টি পানি ছাড়াও অক্রিজেন এবং এরোবিক ব্যকটেরিয়া সরাসরি শিকড়ে পৌছাঁতে সহায়তা করে। অন্যদিকে জলাবদ্ধ মাটিতে এ ধরনের ক্ষুদ্র টানেল পানি অপসারণে নর্দমার কাজ করে। সাধারণভাবে একথা বলা যায় যে জমিতে পর পর কয়েক বৎসর কীটনাশক ব্যবহার না করলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং কর্ষণের অনেক কাজই কীটপতঙ্গ করে দিতে পারবে। যা একদিকে কমাবে কৃষকের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি এবং উৎপাদন খরচ  আর অন্যদিকে রক্ষা করবে প্রাকৃতিক পরিবেশ।

যাইহোক শুধু কীট-পতঙ্গই নয় আরও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণি যেমন- কেচোঁ, শতপদী (ঈবঃরঢ়বফবং  ) প্রভৃতি উপকারি প্রাণির বাসস্থান হিসেবে মালচ কাজ করে। এসকল ক্ষুদ্র উপকারি বন্ধুরা বিছা (ঈধঃঃবৎঢ়রষষধৎ), ছোট নরম শামুক জাতীয় প্রাণী (ঝষঁম), মাছি জাতীয় কীট পতঙ্গের লার্ভা প্রভৃতি ভক্ষণের মাধ্যমে ব্যয়বহুল কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করে। তাছাড়া মালচ লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র জীবের (গরপৎড়-ড়ৎমধহরংস ) বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে যারা মাটির জৈব পদার্থ ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে মাটিকে সম্বৃদ্ধ করে তোলে। উদাহরণ হিসেবে অবিভক্ত গোল কৃমির (ঘড়হ-ংবমসবহঃবফ ৎড়ঁহফ ড়িৎস) কথা বলা যায় যারা প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হয়। এ জাতীয় উপকারি কৃমিগুলো মালচের নিচে মাটির উপরের স্তরে বাস করে এবং মাছি, উইপোকা, কাটুইপোকা প্রভৃতি কীট-পতঙ্গ মেরে ফেলে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে মালচ নানাভাবে কৃষকের উপকার করার পাশাপাশি বিভিন্নধরনের উপকারী কীটপতঙ্গ এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণির বাসস্থান হিসেব কাজ করে জৈব বৈচিত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাজেই শস্য উৎপাদনে (বিশেষ করে শুস্ক মৌসুমে)  মালচের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক যেমন পেতে পারেন অধিক উৎপাদন তেমানি জৈব বৈচিত্র সংরক্ষণের পাশাপাশি মাটি ও পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নে রাখতে পারেন কার্যকরী ভূমিকা ।

(বিদেশী ম্যগাজিন অবলম্বনে লিখিত)

মোঃ মামুন-উর-রশিদ

সহকারী অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ ্ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগ,

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি ফেলো,

চায়না কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বেইজিং

 

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare