টবেই উৎপাদন হবে পছন্দের আম

ড. মোঃ শরফ উদ্দিন

আম এদেশের মানুষের অতি পছন্দের একটি ফল। ছোট-বড় সব বয়সের মানুষের কাছে এটি পছন্দের একটি ফল। পুষ্টিমাণের দিক থেকেও আম অন্য কোন ফলের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমে রয়েছে শ্বেতসার, চর্বি, আমিষ, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ দ্রব্য এবং ভিটামিন’স। আমে রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। অন্যান্য যে কোন ফলের তুলনায় মানুষ এটি বেশী পরিমাণে খেয়ে থাকে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন আম চাষাবাদের জন্য অনেক জমি দরকার, জমিটি হতে হবে সুনিষ্কাশিত, মাটি হতে হবে দোঁআশ বা বেলে দোঁআশ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের দেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। এছাড়াও প্রতিদিন কমছে চাষাবাদযোগ্য জমি। কিন্তু আমাদের প্রায় সকলের আছে একটি বাড়ি আর বাড়ির রয়েছে ছাদ এবং উঠানে রয়েছে সামান্য জায়গা। অনেক মানুষের বাড়ির সামনে অলসভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় কিছু জায়গা বছরের পর বছর, যেখানে অনায়াসে বসানো যাবে কয়েকটি টব। তাহলে পছন্দের এই ফলটি চাষ করবেন কিভাবে?  প্রায় দেখা যায়, অনেক ক্রেতা বারি আম-৩ জাতটি ছোট টবে লাগিয়ে রাখেন যেখানে ১৫-২০ কেজি পরিমাণ মাটি বা জৈব পদার্থ ও মাটির মিক্সার থাকে। কিন্তু কয়েক বছর পর আর সেই গাছ থেকে কাঙ্খিত ফলন পান না অথবা গাছটি বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। ফল বিজ্ঞানিরা সবসময়ই চেষ্টা করেন কিভাবে ফলের উৎপাদন বাড়ানো যায়, নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল ক্রেতাসাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে, বছরের বেশিরভাগ সময় ফলের সরবরাহ থাকে। বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, টবে অনায়াসেই পেয়ারা, লেবু, কামরাঙ্গা, জামরুল, ডালিম, বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি চাষাবাদ করা যায়। আর আমের মধ্যে বারি আম-৩ বা আম্রপালি জাতটি অনেকে চাষ করে থাকেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু বারি আম-৩ (আম্রপালি) জাতটিই নয়, পছন্দের অন্য জাতগুলিও চাষ করা যাবে এই বিশেষ ধরণের টবে। কনক্রিটের তৈরী টবে যে কোন জাতের আম ১০-১২ বছর এবং অন্যান্য ফল (কুল, পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙ্গা, ডালিম, জামরুল, আতা শরিফা, বিভিন্ন ধরণের লেবু, মাল্টা প্রভৃতি) ১৫-২০ বছর পর্যন্ত সফলভাবে জন্মানো সম্ভব। বর্তমানে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বাড়ির ছাদে ফল-সবজি বাগান বেশ ভালো ভাবেই গড়ে উঠেছে। এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। বাড়ির ছাদে যারা ফল বাগান বা সবজি বাগান করে থাকেন তাদের একটি বিষয়ের উপর এ সময়ে বিশেষ নজর দিতে হবে তা হলো নিয়মিত পানির ব্যবস্থা করা। এবং সম্ভব হলে দিনে একবার আপনার টবের গাছগুলো সাথে সাক্ষাৎ করা। পানি শুধু গাছের গোড়ায় না দিয়ে কিছু অংশ পাতায় ছিটিয়ে দিলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। খেয়াল করে দেখবেন, গাছও কথা বলে। বাড়ির মালিক গাছের দিকে দৃষ্টি দিলেই এই ভাবের আদান-প্রদান হয়। এইতো কয়েক দিন আগে কথা হলো মিরপুর-২ এর নিবাসি মামুনুর রশীদ এর সাথে। জানালেন প্রতিদিন একবার বাড়ির ছাদে না উঠলে ভালো লাগে না। টব স্থাপনের জন্য সেই রকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই টবটি যে কোন জায়গায় স্থাপন করা যাবে। যদি জায়গাটি নিচু, অনুর্বর, অনাবাদি এবং উলু বা কাশ দ্বারা আবৃত থাকে সেস্থানেও এই পদ্ধতিতে আম চাষ করা যাবে। তবে বাড়ির ছাদে স্থাপনের জন্য টবের ওজনের বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। টবের বাইরে বেলে মাটি না এঁটেল মাটি, পানির স্তর উপরে বা নিচে, আগাছায় ভরা সেটি মূখ্য বিষয় নয়। টবের গাছে জন্মানো ফলগুলি একটু কষ্টের তাই রোগ ও পোকা, কবুতর, পাখি যেন ফলগুলি খেতে বা নষ্ঠ করতে না পারে সেজন্য সময়মত ফ্রুট ব্যাগিং অথবা নেটের ব্যবস্থা করা উচিৎ। তবে টবে আম চাষ করার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে জাতগুলো যে এলাকায় ভালো ফলন দেয় সেগুলো নির্বাচন করতে হবে।

 

rangunia-mango-pic-2

উৎপাদন পদ্ধতি বিশেষ ধরণের এই টবটি তৈরীর জন্য খোয়া (ইটের টুকরা), সিমেন্ট, বালি ও চিকন রডের প্রয়োজন হয়। টবের আকার ৩২ ী ৩২ ী ৩০ ইঞ্চি (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা) এবং টবের ভিতরের আকার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ২৫ ইঞ্চি। টবের উপরের প্রান্তে ৪ ইঞ্চি পাড় বা কিনারা করলে দেখতে সুন্দর হয়। টবটি ভালোভাবে স্থানান্তরের জন্য চার প্রান্তে ৪টি হুক রাখতে হবে। টবটির নিচের প্রান্তে ৩টি পানি নিষ্কাষণের জন্য ছিদ্র রাখতে হবে। টবটি ভরাট করার সময় নিচের অংশে ছোট ইটের টুকরা ব্যবহার করতে হবে।

এরপর ৫০ ভাগ দোঁআশ মাটি এবং ৫০ ভাগ পচানো গোবর সার অথবা জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। এরপর পছন্দনীয় আমের জাতের কলম সংগ্রহ করে লাগাতে হবে। তবে গুটি আমের গাছ লাগিয়ে সেটিকে পছন্দের সায়ন দ্বারা কলম করা যায়। টবে জন্মানোর জন্য নিচের দিকে বা মাটির কাছাকাছি গ্রাফটিং করা চারাগুলি নির্বাচন করতে হবে। মাটির উপর থেকে ৫-৮ ইঞ্চি দুরুত্বে কলম করলে সবচেয়ে ভালো হবে। প্রাথমিক অবস্থায় সব টবগুলো পাশাপাশি রাখলেই চলবে। এক-দুই বছর পর নির্দিষ্ট জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। প্রতি বছর গাছের চাহিদা অনুযায়ী সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। রাসায়নিক সারের চেয়ে জৈব সার বেশি কাযকরী। তবে সকল ধরণের খাদ্যোপাদান নিশ্চিত করতে হবে। গোবর সার বা জৈব সার বা কেঁচো সার, ডিএপি, এমপি, জিপসাম, দস্তা সার এবং বোরিক পাউডার। সবগুলো সার একবারে প্রয়োগ না করে দুই থেকে প্রতিবারে প্রয়োগ করা ভালো। সার প্রয়োগের পর পানির ব্যবস্থা করতে হবে। যখন বৃষ্টিপাত কম হয় এবং মাটি শুষ্ক অবস্থায় থাকে তখন প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে হবে। গাছ লাগানোর প্রথম দুই বছর গাছে শক্ত খুটির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কেহ ৩/৪টি আমের জাত পছন্দ করেন কিন্তু তার মাত্র একটি টব রাখার মতো জায়গা আছে তাহলে দ্বিতীয় বছরে প্রত্যেকটি ডালে কাঙ্খিত জাতের সায়ন দ্বারা টপ ওর্য়াকিং করতে হবে। এই পদ্ধতিতে একটি গাছে অনেকগুলো জাতের সমাবেশ ঘটানো যায়। টবে জন্মানো গাছের ফলন বাগানো জন্মানো গাছের ফলনের চেয়ে কিছুটা কম তবে সন্তোষজনক। প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমন, বাড়ছে তাপমাত্রা, উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী। এমতাবস্থায়, বাড়ির ছাদে বিভিন্ন ফল ও সবজির সমাগম হলে বাড়িতে বসবাস অনেকটাই আরামদায়ক হতে পারে। প্রতিবেশিরা ফল খেতে না পারলেও পরিবেশের শীতলতা অনুভব করতে পারবেন অতি সহজেই। আমগাছ আমাদের জাতীয় বৃক্ষ এবং সর্বাধিক পছন্দনীয়। সুতরাং আমের চাহিদা পূরণে শুধু বাগানের দিকে চেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই, টবে জন্মানো আম গাছই আপনার পরিবারের আমের চাহিদা পূরণ করবে বলে আমাদের আশাবাদ।

————————————–

লেখকঃ ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare