টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে রাণীক্ষেত রোগের টিকা উৎপাদন

মো.ইউসুফ আলী,বাকৃবিঃ

রাণীক্ষেত একটি সংক্রামক রোগ যা গৃহপালিত ও বন্য পাখিতে দেখা যায়। ১৯২৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভাতে এই রোগটি প্রথম সনাক্ত করা হয়। ১৯২৭ সালে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল শহরে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তাই এই রোগের নামকরন নিউক্যাসল শহরের নামানুসারে করা হয় নিউক্যাসল রোগ। উপমহাদেশে ভারতের  রাণীক্ষেত নামক স্থানে ১৯২৮ সালে প্রথম এই রোগটি ধরা পড়ায় রোগটি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে “রাণীক্ষেত” নামেই পরিচিত। এই রোগের ফলে খামারের ১০০% মোরগ-মুরগী আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে ৭০-৮০% মোরগ-মুরগী মারা যায়। এ রোগটি আঁষধারৎঁং গোত্রের চধৎধসুীড়ারৎরফধব পরিবারের অর্ন্তগত ঘবপিধং:ষব ফরংবধংব ারৎঁং দ্বারা হয়ে থাকে।

 

কিভাবে রোগ ছড়ায়ঃ

প্রাথমিকভাবে রাণীক্ষেত রোগের জীবাণু অসুস্থ মুরগী থেকে সুস্থ মুরগীতে স্থানান্তরিত হয়। অসুস্থ মুরগীর চোখ, মুখ, নাক এবং মল দ্বারা জীবাণু আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। শ্বাস নেওয়া ও খাওয়ার মাধ্যমে, খামারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম, খাদ্য, পানি, লিটার, দূষিত টিকা দ্বারা এবং অসুস্থ মুরগীর সংস্পর্শে এলে এ রোগ সুস্থ মুরগীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

রোগ চেনার উপায়ঃ

রাণীক্ষেত রোগের লক্ষণগুলো স্ট্রেইনের উপর নির্ভর করে। ভ্যালোজেনিক স্ট্রেইন তীব্র সংক্রামক, ম্যাসোজেনিক স্টেইন দ্বারা আক্রান্ত মুরগীতে শ্বাসযন্ত্রের ও ¯œায়ুবিক লক্ষণ দেখা দেয় এবং ল্যানটোজেনিক স্ট্রেইন সাব ক্লিনিক্যাল রোগ তৈরী করে। আমাদের দেশে সাধারনত ভ্যালোজেনিক স্ট্রেইনের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। এই স্ট্রেইন দ্বারা সৃষ্ট রাণীক্ষেত রোগের  সুপ্তকাল ২-১৫ দিন। রাণীক্ষেত রোগের লক্ষণগুলো হলো – শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা (কাশি), ¯œায়ুবিক লক্ষণ (পেশির কম্পণ, ডানা ঝুলে পড়া, মাথা ও ঘাড় মুচরানো, পক্ষাঘাত), চোখের চারপাশে টিস্যু ফুলে উঠা, সবুজাভ পাতলা পায়খানা (চিত্র-১), ডিমের খোসা পাতলা হওয়া এবং ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া। তীব্র ক্ষেত্রে আকস্মিক মৃত্যু।

ময়নাতদন্তে মুরগীর বিভিন্ন অঙ্গে (প্রভেন্টিকুলাস, সিকাম, ট্রাকিয়া, গিজার্ড)  রক্তক্ষরণ লক্ষ করা যায়।

 

রাণীক্ষেত রোগের টিকা:

উন্নয়নশীল দেশে প্রাণিসম্পদ কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পোল্ট্রি শিল্পের সাফল্য টিকাদান কর্মসূচীর উপর নির্ভর করে। ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগসমূহ চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করা গেলেও ভাইরাস ঘটিত রোগ চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করা যায় না। কারণ কার্যকরী কোন এন্টিভাইরাল ঔষধ নেই। তাই ভাইরাস ঘটিত রোগ প্রতিরোধে টিকার উপর নির্ভর করতে হয়। যেহেতু রাণীক্ষেত একটি ভাইরাস  ঘটিত রোগ তাই প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য রাণীক্ষেত রোগের টিকা ব্যবহার করা অপরিহার্য।

 

মৃত টিকা ব্যবহারে সুবিধা:

বর্তমানে বাংলাদেশে রাণীক্ষেত রোগে নিয়ন্ত্রনে যেসব টিকা (বিসিআরডিভি, আরডিভি, বাংলা বিসিআরডিভি) ব্যবহার করা হয় তা জীবিত জীবানু দ্বারা তৈরি। জীবিত টিকার জীবাণু মাঝে মাঝে মিউটেশনের মাধ্যমে রোগের সংক্রামণ ঘটাতে পারে কিন্তু মৃত টিকা ব্যবহারে এ সম্ভাবনা নেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন মুরগীতে মৃত টিকা ব্যবহার করা গেলেও জীবিত টিকা এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না।

 

বাংলাদেশে অধিকাংশ পোল্ট্রি খামার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। খামার পর্যায়ে জীবিত টিকা বহন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। তাই অনেক সময় খামার পর্যায়ে জীবিত টিকা ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায় না। যেহেতু মৃত টিকা ৪-৮০ সেঃ  তাপমাত্রায় রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় তাই খামার পর্যায়ে মৃত টিকা ব্যবহার করা সুবিধাজনক।

 

মুরগীর ভ্রƒণ ব্যবহার করে রাণীক্ষেত রোগের টিকা উৎপাদন একটি সনাতন পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে টিকা উৎপাদন যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি উৎপাদন খরচও বেশী। তাই অল্প সময়ে অধিক পরিমানে রাণীক্ষেত রোগের টিকা উৎপাদনে টিস্যু কালচার পদ্ধতি অধিকতর কার্যকরী। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের প্রফেসর ড. বাহানুর রহমান এর তত্ত্বাবধানে ড. মারজিয়া রহমান, মোহাম্মদ ফেরদৌসুর রহমান খান, আল এমরান, লিয়াকত হেসেন, সুলতান আহমেদ ও সফিউল্লাহ পাভেজ গবেষনা করে সম্প্রতি টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে রাণীক্ষেত রোগের টিকা উৎপাদন করেছেন।

 

ভাইরাস পৃথকীকরন, সনাক্তকরন ও অভিযোজন

খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে মর্টার এবং পেষ্টেল দ্বারা প্রেষণ করে পিবিএস এর সাথে মিশিয়ে ইনোকুলাম তৈরী করা হয়। ৯-১১ দিন বয়সী মুরগীর ডিমের ভ্রƒণের এলানটয়িক থলিতে প্রস্তুতকৃত ইনোকুলাম প্রবেশ করানো হয়। রাণীক্ষেত রোগের জীবাণুর উপস্থিতিতে মুরগীর ডিমের ভ্রƒণ ৪৮-৭২ ঘন্টার মধ্যে মারা যায়। তারপর ডিমের খোসা ভেঙ্গে এলানটয়িক থলি থেকে তরল সংগ্রহ করে তা স্লাইড এইচ এ (ঐঅ) টেষ্টের মাধ্যমে রাণীক্ষেত রোগের জীবাণুর অস্তিত্ত্ব  পরীক্ষা করা হয়।  তারপর এই রাণীক্ষেত রোগের জীবাণু  সমৃদ্ধ এলানটয়িক তরল বেবি হ্যামষ্টার কিডনি-২১ (বি এ এইচ- ২১) কোষে অভিযোজনের জন্য প্রবেশ করানো হয়। বি এইচ কে-২১ কোষে রাণীক্ষেত রোগের জীবাণুর অভিযোজিত  হতে ৩-৫টি  প্যাসেজে বা সাব-কালচারের প্রয়োজন হয়।

 

উপযুক্ত মিডিয়া ব্যবহার করে বি এ এইচ- ২১ কোষ বোতলে জন্মানো হয়। কোষের সংখ্যা প্রায় ৯৫-১০০% হয়ে গেলে বোতলের মিডিয়া ফেলে দিয়ে তাতে ভাইরাস ইনফেকশন দেয়া হয় (চিত্র ১ ও ২)। ইনফেকশন চলাকালীন সময়ে ব্যবহ্যত মিডিয়া থেকে ভাইরাল জঘঅ আলাদা করে ‘ঋ’ জিন প্রাইমার জোড়া  এর মাধ্যমে রাণীক্ষেত রোগের জীবাণুর নিশ্চিতকরণ করা হয়।

 

টিকা  উৎপাদন পদ্ধতি

টিকা উৎপাদনের শুরুতে ঞঈওউ৫০ নির্ণয় করা হয়। বি এইচ কে-২১ কোষে রাণীক্ষেত রোগের জীবাণুর অভিযোজিত  তরলে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাইনারী ইথিলিন ইমিন যোগ করা হয় এবং ২৪ ঘন্টা ৩৭০ সে. তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া হয়। তারপর সোডিয়াম থায়োসালফেট যোগ করে বাইনারী ইথিলিন ইমিন এর কার্যকারীতা রহিত করা হয়। ডিমের ভ্রƒণের এলানটয়িক থলিতে মৃত টিকা প্রবেশ করিয়ে সক্রিয়তা পরীক্ষা করা হয়।

 

উৎপাদিত টিকার গুণগতমান

উৎপাদিত টিকার গুণগতমান পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অ্যানিম্যাল শেডে লেয়ার মুরগী পালন করা হয়। উৎপাদিত টিকা প্রয়োগের আগে মুরগীগুলোকে প্রতি গ্রুপে ৮টি করে ৪ গ্রুপে ভাগ করা হয়। পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত টিকা ৫৫ দিন বয়সী লেয়ার মুরগীর মাংসে ০.৫ মিলি (টিস্যু কালচার টিকার ক্ষেত্রে ঞঈওউ৫০ – ১০৭.৭/সষ এবং এলানটয়িক তরল টিকার ক্ষেত্রে ঊওউ৫০ – ১০৯.৫/সষ ) করে প্রয়োগ করা হয়। পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগের আগে এবং ১৫ দিন পর পরীক্ষামূলক মুরগী থেকে রক্ত নিয়ে সিরাম সংগ্রহ করে ঐও এবং ঊখওঝঅ টেষ্ট করা হয়। উভয় টেষ্টে সামঞ্জস্যপূর্ন ফলাফল পাওয়া যায়।

 

উৎপাদিত টিকার কর্মক্ষমতা নির্ণয়

উৎপাদিত টিকা প্রদানের ১৫ দিন পর পরীক্ষামূলক সকল লেয়ার মুরগীগুলোতে ভাইরাস চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রবেশ করানো হয়। চ্যালেঞ্জ ডোজ ছিল ০.৫মিলি / মুরগী (ঊওউ৫০ = ১০৯.৫/সষ)।  উৎপাদিত টিকার কর্মক্ষমতার পরীক্ষায় দেখা যায় বি এইচ কে -২১ কোষে উৎপাদিত টিকা অন্যান্য টিকার ন্যায় শতভাগ মুরগীকে ভাইরাস চ্যালেঞ্জ প্রতিহত করতে সক্ষম (চিত্র -৩)।

 

মুরগীর ভ্রƒণ ও টিস্যু কালচার অভিযোজিত ৫০০ ডোজের টিকা উৎপাদনে প্রায় একই পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলেও ভ্রƒণ হতে টিকা উৎপাদনে কমপক্ষে ১৬ দিন সময় লাগে। পক্ষান্তরে টিস্যু কালচার অভিযোজিত টিকা উৎপাদন করতে ৫-৬ দিন সময় লাগে। তাই দেখা যাচ্ছে যে, মুরগীর ভ্রƒণ থেকে টিকা উৎপাদনে যে সময় লাগে একই সময়ে তিনগুণ বেশি টিস্যু কালচার অভিযোজিত টিকা উৎপাদন করা যায় যা অত্যন্ত লাভজনক।

 

লেখক

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

মোবাইল- ০১৭২১ ৫১২৫৪০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *