ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রক্তদ্রোন এর নানাবিধ ব্যবহার

 

ড. মো. আবু সাঈদ

ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ তথা হৃদ রোগ বাংলাদেশের জনগণের এক স্বাভাবিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুসারে, পৃথিবীতে যত লোক সংখ্যা মৃত্যুবরণ করে তার প্রথম এবং প্রধান কারণ হল হৃদ রোগ। রোগের প্রাদুর্ভাব অনুসারে মানুষের প্রথম মৃত্যুর কারণ হল হৃদ রোগ, দ্বিতীয় ক্যান্সার এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে ডায়াবেটিস। ২০১২ সালের এক জরিপ অনুসারে প্রায় ১৭.৫ মিলিয়ন লোকের মৃত্যু হয়েছে  হৃদ রোগ জনিত কারণে যাহা  সকল মৃত্যুর প্রায় ৩১ ভাগ। এর মধ্যে শতকরা ৮২ ভাগ মৃত্যু ঘটেছে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশে। বাংলাদেশ একটি নিম্ন আয়ের দেশ। এই জন্য হৃদরোগ একটি প্রকট সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এই রোগের প্রথম কারণ হল তামাক এবং তামাক জাত দ্রব্য সেবন করা। তাছাড়া অনিয়মিত এবং বেশি পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ। এর প্রতিকার হিসাবে ঝুকে পড়ছি ওষুধের উপর এবং হৃদ রোগের জন্য যে সকল ওষুধ সেবন করা হয়, তা স্থায়ী ভাবে মানুষের যৌন আকাঙ্খা কে চিরতরে কমিয়ে দেয়। এই রোগের সাথে সাথে ডায়াবেটিস ও একটি জটিল রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুসারে  সারা বিশ্বে ২০১৪ সালে প্রায় ৪২২ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সমস্ত লোক সংখ্যার প্রায় ৮.৫ ভাগ । আর এই রোগের ও প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেছে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশে। ২০১২ সালের জরিপ অনুসারে ১.৫ মিলিয়ন লোক মারা গেছে  সরাসরি ডায়াবেটিস এর কারণে এবং ২.২ মিলিয়ন মারা গেছে পরক্ষভাবে ডায়াবেটিস এর কারণে। বাংলাদেশে প্রায় ৩.৯ ভাগ লোক ডায়াবেটিসে ভুগছে (২০১০ এর প্রকাশিত)। ডায়াবেটিস এর দুইটি কারণে হয় এক হল বংশ গত কারণে এবং দুই হল অনিয়মিত এবং বেশি পরিমাণে খাদ্য গ্রহণে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকেই ইনসুলিন সহ ওষুধ সেবন করে, যাহা অনেকের কাছে ব্যয়বহুল।

প্রাচীনকালে যখন ওষুধ আবিষ্কার হয় নাই, তখন মানুষ গাছের শিকড়, লতা পাতা ইত্যাদি সেবনের মাধ্যমে এই সকল মরণ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করত। বাংলাদেশে এখন ও গ্রাম গঞ্জে এই সকল রোগ হলেই ছুটে চলে কবিরাজের কাছে গাছ গাছড়ার ওষুধ নিতে। তেমনি রক্তদ্রোন একটি ঔষধি গাছ যা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের কবিরাজগণ হৃদ রোগ, উচ্চ রক্ত চাপ, ডায়াবেটিস, অনিয়মিত ঋতু চক্র, এবং ঋতু চক্রকালীন তল পেটে ব্যাথা নিবারণের জন্য এই ঔষধি গাছ ব্যবহার করে আসছে। রক্তদ্রোন একটি আগাছা হিসাবে ফসলের জমিতে, রাস্তার ধারে, পতিত জমিতে হয়ে থাকে। এই গাছের ফুলের রং লাল এই জন্য হয়ত তাকে রক্তদ্রোন বলা হয়ে থাকে। তাছাড়া এই গাছের ফুলের রস অনেক টা মধুর মত মিষ্টি , তাই এই আগাছা কে ইংরেজিতে (ঐড়হবুবিবফ) হানিউইড যার অর্থ মধুর আগাছা বলা হয়ে থাকে। এই আগাছা বাংলাদেশ সহ, ভারত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো এবং যুক্ত রাষ্ট্রে পাওয়া যায়।

অনেক আগে থেকেই এই আগাছা কে ঔষধি গাছ হিসাবে ব্যবহার করলেও, জানা ছিল না কিভাবে এবং কি জন্য এই গাছের দ্বারা এই সব রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে ইঁদুর এবং খরগোশ এর উপর পরীক্ষা করে প্রমাণ করছে যে, এই আগাছা দিয়ে হৃদ রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, অনিয়মিত ঋতু চক্র, এবং ঋতু চক্রকালীন তল পেটে ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, এই গাছের পাতার রস খেলে রক্তের ক্লোস্টেরল, এল ডি এল, এবং গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যায়। ইহা ছাড়াও হৃদ রোগ বা ডায়াবেটিস এর জন্য যে সব জিন দায়ী, সেসকল জিন এর কাজ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে এই সকল রোগ কমানো যায়। ইঁদুরের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে, ঋতু চক্রকালীন সমস্যাকেও দূর করা  সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গর্ভাবস্থায় মহিলাদের ডায়াবেটিস হয় কেভিওলিন নামক এক প্রোটিন কমে যাওয়ার কারণে। এই গাছের পাতার রস ইঁদুরকে খাওয়ালে দেখা গেছে কেভিওলিন নামক প্রোটিন বেড়ে যায়। ইহা ছাড়া এই গাছের পাতার রস দিয়ে জমির আগাছাকেও দমন করা সম্ভব বলে গবেষকগণ এমন ধারণা পোষণ করছেন। তাই এই আগাছা যদি ফসলের মধ্যে হয়, তাহলে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত করে এক প্রকার রাসায়নিক যৌগ দ্বারা। এই গাছের এই সকল ঔষধি গুনাগুন জানতে গিয়ে দেখা গেছে এই গাছের মধ্যে থেকে প্রায় ৬০ ধরণের রাসায়নিক যৌগ সনাক্তকরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে কিছু কিছু যৌগ আছে যেগুলো সরাসরি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ রোগ এবং অনিয়মিত ঋতু চক্র, এবং ঋতু চক্রকালীন তল পেটে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই রক্তদ্রোন নামক আগাছা হতে পারে গবেষকদের নতুন ক্ষেত্র যেখান থেকে তৈরি হতে পারে মহামূল্যবান ওষুধ। যারা এই সকল রোগে ভুগছে, তারা এই গাছের পাতার রস করে খেতে পারে, এবং নিয়ন্ত্রণ হবে এই সকল জটিল রোগ।

তথ্য সুত্রঃ

World Health Organization:

————————————–

লেখকঃ

সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বায়োকেমিস্ট্রি এবং মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare