তরমুজে বৈদেশিক মুদ্রার হাতছানি

 

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল*

 

নদী ভাঙনে বুক ফুঁড়ে জাগছে চর। চরের উদর মাটিতে লাঙল দিয়ে বুকচিড়ে কৃষক ফলায় ধান। এখন শুধু ধান চাষে সীমাবদ্ধ নেই তাঁরা। চরের মাটিতে প্রধান কৃষি তাঁদের তরমুজ। বছর জুড়ে অপেক্ষা তাঁদের কখন মৌসুম আসবে। অনুকূল পরিবেশের কারণে তরমুজের আবাদ বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলের সর্বত্র। মৌসুমে নদী কিংবা খালের দুই পাড়ের ক্ষেতে শুধুই তরমুজের আবাদ। আবাদি ফলন নিয়ে কৃষক পরিবারের বেলা কেটে যায় খোলা আকাশের নীচে। কৃষকের প্রত্যাশা ওই এলাকার তরমুজ বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা হলে বৈদেশিক মূদ্রা আয় করা সম্ভব।
পথ, ঘাট, ক্ষেত কিংবা পরিবহন যত্রতত্র তরমুজ নিয়ে ব্যস্ত সবাই। কেউ সেচ, কেউ কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে রেহাই পেতে ওষুধ ছিটাচ্ছে। কেউ কাচি হাতে কাটছে তরমুজ। পরিবহনের অপেক্ষায় ক্ষেতে মজুদ করে রেখেছে অনেকে। কারো ব্যস্ততা যানবাহনে ওঠানো নিয়ে, কেউ আবার ব্যস্ত মহাজনের সঙ্গে বেচাবিক্রি নিয়ে মুঠো ফোনে আলপচারিতায়। সময় থাকতেই বাজার ধরতে হবে তাই এ ব্যস্ততায় যোগ দিয়েছে পরিবারের প্রতিটি সদস্য। তরমুজ নিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেল পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে।
সরেজমিনে ওই উপজেলায় গিয়ে এসবই দিনজুড়ে চোখে পড়ল। উপজেলার কোরালিয়া লঞ্চঘাট পৌঁছেই নজরে আসে গ্রামের পর গ্রাম তরমুজের সবুজ ক্ষেত। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর মৌসুমি এ ফলের আবাদ বেড়েই চলেছে। গত মৌসুমে এ উপজেলায় ৩ হাজার একশত হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে। এটিই এখন তাদের প্রধান কৃষি। এক সময় ধান লাভজনক ফসল থাকলেও এখন ওই এলাকার কৃষকের কাছে তরমুজ অর্থকরী ফসল। চলতি মৌসুমে ফলন ভাল হওয়ায় কৃষক দারুন খুশি। তবে মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা অধিক লাভ লুফে নেওয়ায় ন্যায্য দাম পাচ্ছে না কৃষক।

সর্বত্রই তরমুজ: চলছে তরমুজের ভরা মৌসুম। কৃষকের ক্ষেতজুড়ে স্বপ্নের তরমুজ হাসছে। তাই খাওয়ার উপযোগী কিংবা পেকে পাওয়ার কারণে বাজারজাতকরণে ব্যস্ত কৃষক পরিবার। এর ফলে রাঙ্গাবালীর কোরালিয়া লঞ্চঘাট, রাঙ্গাবালী লঞ্চঘাট, কাজির হাওলা ট্রলার ঘাট কিংবা কোরালিয়া খালের সর্বত্রই মৌসুমী ফল তরমুজের ছড়াছড়ি। কেউ ট্রলার, লঞ্চ কিংবা নৌকায় উঠাচ্ছে। কেউবা নৌযানে উঠানোর অপেক্ষায় ঘাটে ঘাটে কিংবা খালের পাড়ে ফেলে রেখেছে তরমুজ। অনেকে আবার তরমুজ ক্ষেতে থেকে কাটার পর নৌযান পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য ট্রলিতে উঠানোর অপেক্ষা রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছে। রাঙ্গাবালীর আগুনমুখা নদী দিয়ে তরমুজ বোঝাই বিভিন্ন নৌযান যাচ্ছে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী অভিমুখে। আবার এসব এলাকা থেকে ট্রাকযোগে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

অস্থায়ী ঘর বানিয়ে ক্ষেতে বাস: ভাল ফলন আর ধানের চেয়ে লাভ ভাল পাওয়ায় তরমুজই প্রধান ফসল হয়ে ওঠেছে ওই এলাকার কৃষকদের। তাই তরমুজ মৌসুমে এ চাষেই স্বপ্ন বোনে ওখানকার কৃষক। এ কারণে পরিবারের সবাই এ চাষে মাঠেই সময় পার করে। কেউ আবার স্বপরিবারে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে ক্ষেতের মধ্যে বাস করেন টানা তিন থেকে চার মাস। কোরালিয়া লঞ্চঘাট তরমুজ ক্ষেতে চাষি মনির গাজি তার স্ত্রী কোমেলা বিবি ও দুই সন্তান রবিউল এবং পলিকে দেখা গেছে গরম আর রোদ উপেক্ষা করে ক্ষেতে কাজ করতে। অধিকাংশ চাষিরা ক্ষেতের মধ্যে ঘর বানিয়ে থাকেন। পরিচর্যা করেন মৌসুমের স্বপ্ন বাগানের। মাঝ নেতা গ্রামের কৃষাণী সাহিদা বেগম বলেন, ‘ডাইল ভাত খাওয়ার মত ব্যবস্থা অয় তরমুজ দিয়া। এইয়ার পিছে সোময় দেই বচ্ছর ডা ভাল কাডানের লই¹া।’ মৌসুমি এ ফলের আবাদকে ঘিরে অস্থায়ী ওই ঘরে উৎসবে মেতে থাকেন কৃষক পরিবার।

উপযুক্ত পরিবেশ: ঘন্টাদুলা গ্রামের কৃষক বাবু আকন জানান, ১০ থেকে ১২ বছর আগে ওই অঞ্চলে তরমুজের চাষ শুরু হয়। তখন চট্রগ্রামের এক মহাজন রাঙ্গাবালীতে এসে ১০ একর জমি লিজ নিয়ে প্রথম আবাদ শুরু করেন। ফলন ভাল হওয়ায় পরের বছর স্থানীয় কৃষকরা নিজ উদ্যোগে তরমুজ চাষ শুরু করে। মাটি, পানি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে স্থানীয় চাষিরা প্রতিবছরই তরমুজ চাষে ঝুঁকছে। বাড়ছে চাষীর সংখ্যা। বাড়ছে তরমুজ আবাদে জমির পরিমাণও।
গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া, দশমিনা ও বাউফলের প্রায় ৮২ চরের মাটি সমান্তরাল হওয়ায় এ চাষের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। এমনকি ওই উপজেলার মূল ভূখন্ডেও তরমুজের ব্যাপক আবাদ হচ্ছে। ওই এলাকার তরমুজের স্বাদ এবং পুষ্টিমান ইতিমধ্যে দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহাবুব রব্বানী বলেন, ‘তরমুজকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে পর্রিতনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বেলে ও পলি মাটি তরমুজের জন্য উপযোগী। এটি পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে পটুয়াখালী অঞ্চলের মাটিতে। মাটি পরীক্ষা করে কৃষকদের মধ্যে ভাল জাতের বীজ সরবরাহ করতে পারলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে। কৃষক এখন না বুঝে চাষ করছে এতেই সুনাম কুড়িয়েছে পটুয়াখালীর তরমুজ। যেহেতু বিপুল পরিমাণ আবাদ হচ্ছে তাই এ নিয়ে গবেষনাসহ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। সুস্বাদু এ অঞ্চলের তরমুজ বিদেশে রপ্তানি করার প্রক্রিয়া করা হলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। যা কৃষিকে সমৃদ্ধ করবে।’

দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে চরের তরমুজ: পটুয়াখালী উপকূলের তরমুজ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রাঙ্গাবালী এলাকার সেকেন্দার আলী ব্যাপারী জানান, মৌসুম শুরু হলে চট্রগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, যশোর এলাকার ব্যবসায়ীরা ছুটে আসে রাঙ্গাবালী এলাকায়। ক্ষেত থেকে তরমুজ কিনে তারা। ব্যবসায়ীদের পদচারণায় সরগরম থাকে ওই এলাকা। ট্রলার, লঞ্চ কিংবা ট্রাক বোঝাই করে ব্যবসায়ীরা ওইসব এলাকায় নিয়ে যায় তরমুজ। গলাচিপার পানপট্টি এলাকায় দেখা গেছে, খুলনার উদ্দেশ্যে ট্রাক বোঝাই করছে শ্রমিকরা। ট্রাক ড্রাইভার মো. মাহাতাব হোসেন বলেন, ‘মৌসুমের শুরু থেকে ৭টি ট্রিপ দিয়েছি। আরো দিতে হবে। এ অঞ্চলের তরমুজের খুব চাহিদা আমাদের অঞ্চলে। চাহিদা থাকার কারণে মহাজনরাও আসে এখানকার তরমুজ কিনতে।’

বিদেশে রপ্তানির দাবি: তরমুজের মাধ্যমে অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে এবং কৃষকদের আয় বাড়াতে ওই এলাকার তরমুজ বিদেশে রপ্তানি করার দাবি স্থানীয় কৃষকদের। রাঙ্গাবালী এলাকার ব্যবসায়ী আব্বাস উদ্দিন হাওলাদার জানান, যেহেতু দেশের সর্বত্র সমাদৃত হয়েছে রাঙ্গাবালীসহ উপকূলের তরমুজ। তাই মরুভূমি কিংবা যেসব দেশে এর আবাদ হয় না ওইসব দেশে তরমুজ রপ্তানি করা হলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক এবং কৃষিতে বড় ধরণের অর্থনৈতিক পরির্বতন আসবে। হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা শুধু তরমুজ থেকে আয় করা সম্ভব হবে। রাঙ্গাবালীর কৃষক শাকিল পন্ডিত জানান, বিদেশে রপ্তানি করা হলে সরকারের আলাদা নজর বাড়বে তরমুজ চাষে। তখন ভাল বীজসহ উৎপাদনের সব উপকরণ সহজলভ্য হবে। অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে কৃষক। চর নেতা, মাঝ নেতা, আমলিবাড়িয়া, কোরালিয়া, চালতাবুনিয়া এলাকার চাষিরা জানান, বিদেশে রপ্তানি করা গেলে বিদেশীরা এসে চাষিদের সাহায্য করবে চাষ প্রক্রিয়ায়।

কৃষকের নানা কথা: ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের ফুলখালী গ্রামের তরমুজ চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় আড়াই একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। ফলনেও খুশি। কিন্তু বিক্রি ব্যবস্থাপনায় হতাশ তিনি। প্রতিবছর তরমুজ বিক্রি করতে গিয়ে পরিবহনে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়। নৌপথে ট্রলার যোগে ঢাকায় নেওয়ার পথে হিজলা-মূলাদি, চাঁদপুর, ষাটনল এলাকায় চাঁদাবাজির খপ্পরে পড়তে হয়। চাঁদা না দিলে তরমুজ লুট করে জলদস্যুরা। চাষিদের দাবি মৌসুমে দোতালা ডাবল ডেকার ঢাকাগামী লঞ্চ কিংবা ওই পর্যায়ের কোন নৌযানের বিশেষ ব্যবস্থা করা হলে চাষিরা চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পেত। চাঁদাবাজির কারণে নৌপথে ঢাকায় পৌঁছাতে একটি তরমুজের জন্য খরচ হয় ২১ থেকে ২৩ টাকা পর্যন্ত। সড়কপথে খরচ আরো বেশী বলে জানান কৃষকরা।
চাঁদাবাজির প্রতাপে অতিষ্ঠ পটুয়াখালী অঞ্চলের সব এলাকার কৃষক। কলাপাড়া কৃষকদের অভিযোগ, ধানখালী ইউনিয়নের নোমরহাট এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের নামে ট্রাক প্রতি আদায় করা হয় ২০০, নোমরহাট ব্রিজ পেরিয়ে তিন রাস্তর মোড়ে চিলায় হলদিয়া ইউনিয়নে ৫০০, একই সড়কের ঘরামি বাড়ির স্ট্যান্ডে ৩০০, খুড়িয়ার খেয়াঘাটে মসজিদ বাবদ ২০০, ট্রাক ইউনিয়নের জন্য ৫০০, আমতলী পৌর এলাকায় পুলিশের নামে ১০০ এবং ওখানে আরো আছে চা খরচ ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজির ব্যাপারে কলাপাড়ার চম্পাপুর ইউপি চেয়ারম্যান রিন্টু তালুকদার বলেন, ‘আমতলীর হলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান, কলাপাড়ার ধানখালী ইউপি চেয়ারম্যান আমরা বসেছিলাম চাঁদাবাজি বন্ধে। কিন্তু অপরাধীরা আমাদের কথা মানছে না। চাঁদাবাজির কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।’
এছাড়াও সড়ক পথে চাঁদাবাজি হচ্ছে ফ্রি স্টাইলে। কৃষকরা জানান, পটুয়াখালী থেকে ট্রাকে ঢাকার মোকামে পৌঁছাতে বিভিন্ন স্পটে চাঁদা দিতে হয়।

জোয়ারে স্বপ্নবিলাস: প্রতিবছর তরমুজ মৌসুমে রাঙ্গাবালী কিংবা অন্যান্য চরে পর্যাপ্ত বেরিবাঁধ ও সøুইস গেট না থাকার কারণে মৌসুমী জোয়ারে নদী ও খাল ফুলে ফেপে ওঠে ডুবে যায় কৃষকের ক্ষেত। ফলে ভেসে যায় কৃষক কৃষানির স্বপ্ন। এ কারণে চরাঞ্চলের কৃষকদের দাবি আবাদ করা সব জমির তরমুজ নিরাপদ রাখতে প্রয়োজন  বেড়িবাঁধ ও সøুইসগেট নির্মাণের। রাঙ্গাবালীর কৃষক আনোয়ার মুন্সি বলেন, ‘তরমুজ চাষে অনেক পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু হিসাব করে সেচ দেওয়া হয় সেই পানি। কিন্তু জোয়ারের পানি ঢুকে পড়লে গাছ পচে যায়। তরমুজ চাষকে উৎসাহিত করতে রাঙ্গাবালীর সব জমিতে বেড়িবাঁধ দিতে হবে।’ স্থানীয় কৃষকরা আরো জানান, প্রতিবছর জোয়ারের পানিতে ক্ষেত প্লাবিত হয়ে শুধু রাঙ্গাবালী উপজেলায় তরমুজ চাষিদের ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা লোকসান হয় । একই ধরণের বক্তব্য কোরালিয়া গ্রামের চাষি মনির গাজি, ওই গ্রামের হান্নান খলিফা, বাহেরচর গ্রামের আবু দাউদ এবং হান্নান মুন্সির।

কীটনাশকের বিকল্প চায় কৃষক: মাঘ ফাল্গুন থেকে তরমুজ চাষ শুরু হয়। তিন মাস পর ফুল থেকে ফল আসে। ২০ থেকে ৩০ দিন পর ওই ফল বিক্রির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে কৃষক। চারা গজানো থেকেই পোকা দমনে কীটনাশক ছিটানো শুরু হয়। এ সময় সপ্তাহে দুবার কীটনাশকের ব্যবহার হয়। এরপর ফুল বের হলে আবার দুই দফা, পরর্বতীতে পোকার আক্রমণ থেকে ফল টিকিয়ে রাখতে যথেচ্ছো কীটনাশকের ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধানের ক্ষতিকারক পোকা দমনে আলোর ফাঁদ, ডাল পোতা, জাল হাত, পোকা প্রতিরোধী জাত, জৈব পদ্ধতির (উপকারী পোকা দিয়ে ক্ষতিকারক পোকা দমন) মাধ্যমে যেমন ধান চাষে কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। তেমনি তরমুজের ক্ষতিকারক পোকা দমনে বিকল্প পদ্ধতি চায় কৃষক।

অধিক লাভ মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের : তরমুজ নিয়ে কৃষক স্বপ্ন বুনলেও সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। চাঁদাবাজি আর চাষি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত তিন হাতের মধ্যস্বত্ত্বভোগীর অবস্থান থাকায় তরমুজের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যায়। কৃষকদের অভিযোগ, তরমুজ বিক্রিতে সরকার কর্তৃক বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরী করা হলে সব মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকতো বাজার দর। রাঙ্গাবালী ঘন্টাদুলা গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন পন্ডিত জানান, বড় সাইজের একটি তরমুজ চলতি মৌসুমে তারা বিক্রি করেছেন ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, মাজারি সইজ ৯০ থেকে ১২০ টাকা এবং ছোট সাইজ বিক্রি করেছেন ৩০ থেকে ৪০ টাকা দামে। চাষীর বিক্রির পর পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ওইসব তরমুজের দাম দ্বিগুনের চেয়েও বেশী হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে অধিক মুনফা নেয় মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা। একই ধরণের অভিযোগ করেন একই এলাকার কবির পন্ডিত, আলা পন্ডিত ও বাবু পন্ডিত।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: রাঙ্গাবালী উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘রাঙ্গাবালীর তরমুজ ৮/১০ বছরে সুনাম কুড়িয়েছে। প্রতিবছর চাষ বাড়ছে ফলনও ভাল হচ্ছে। এটি এ অঞ্চলের কৃষিতে নতুন বিপ্লব।’ পটুয়াখালী খামার বাড়ির শষ্য উৎপাদন বিষেশজ্ঞ মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘তরমুজ দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনার দ্বার উšে§াচন করেছে। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশে রপ্তানি করা হলে কৃষককের ভাগ্যের পরির্বতন হবে। তাদের কৃষিতে আসবে নতুনত্ব। তখন উৎপাদনও বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। চলতি মৌসুমে পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় ১৩ হাজার ৩৬৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন প্রায় সাড়ে ৫২ মেট্রিক টন। সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে হিমাগার স্থাপনের।

প্রথমবারের মতো পদ্মার চরে তরমুজের চাষ

প্রথমবারের মতো ঢাকার দোহার উপজেলার পদ্মার চরে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে তরমুজের চাষ। দেশের পটুয়াখালী জেলা তরমুজ চাষের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় ওই অঞ্চলের কয়েকজন চাষি অপেক্ষাকৃত কম পরিবহন খরচের কথা বিবেচনায় রাজধানীর পাশের এলাকার পদ্মার চরকে বেছে নিয়েছেন তরমুজ চাষের জন্য। এতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন স্থানীয় চাষিরা। এ বছর প্রথম চরাঞ্চলে তরমুজের চাষ হওয়ায় কৃষিখাতে ইতিবাচক দিক মনে করছে অনেকেই। চারদিকে নদী বেষ্টিত দোহার উপজেলার নন্দলালপুর চরে প্রথমবারের মতো পটুয়াখালী থেকে আসা তরমুজ চাষি শাহ আলম চরের মাটি দেখে স্থানীয় রজ্জব আলীসহ কয়েকজনকে তরমুজ চাষে উদ্যোগী করে তোলেন। পাশাপশি জমি বর্গা নিয়ে নিজেও শুরু করেন তরমুজ চাষ। চরাঞ্চলে এখন যেদিকে দু-চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ যেন শিল্পীর রং তুলিতে আঁকা  ক্যানভাস। আর এ সবুজের মাঝে প্রকৃতি যেন আর একটু সবুজ হয়ে উঠেছে তরমুজ চাষের মধ্য দিয়ে। পদ্মাচরের মাটিতে ধান, বাদাম অন্য রবি শস্যের চাষ হলেও এবারই  প্রথম এখানে তরমুজ চাষ হয়েছে।
এ ব্যাপারে চাষী শাহ্ আলম জানান, পটুয়াখালী তরমুজ চাষের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ঢাকায় আনতে পরিবহন খরচ অনেক বেশি। যে কারনে ঢাকার পাশের এলাকা হিসেবে দোহারের এই পদ্মার চরকে বেছে নিয়েছি। এলাকার রজ্জব ভাইয়ের মাধ্যমে দুজন মিলে তরমুজ চাষ শুরু করি। শাহ আলম জানান, প্রথমে ২৫ বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষাবাদ শুরু করি। প্রাথমিক খরচ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা হিসাব ধরে কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত ২৫ বিঘা জমিতে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। তিনি আরো বলেন, চরের এই দোআঁশ মাটি তরমুজের জন্য উপযুক্ত কিন্তু মাটিতে ঘাসের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ও স্থানীয় মানুষের উৎপাতের কারনে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন কম। এ সমস্যাগুলো দূর হলে আগামীতে পদ্মাচরের তরমুজ চাষে ভরে উঠবে। এছাড়া স্থানীয় কৃষি বিভাগ ভবিষ্যতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে উদ্বুদ্ধ হবে আরো অনেকে। বাংলালিংক, হান্ডার, জাগুরাসহ তরমজুরে তিনটি জাতের মধ্যে এ অঞ্চলে বাংলালিংক জাতের চাষ বেশি হয়েছে। আর এ তরমুজ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাশের জেলা ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, রাজধানী ঢাকা ও  গাজীপুরে সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, কার্তিক মাসের মাঝামাঝিতে তরমুজের বীজ বপন করা হয় আর  চৈত্র  মাসের শেষের দিকে তা বিক্রির জন্য উপযোগী হয়ে উঠে। বীজ রোপণের সময় রাসায়নিক সারের প্রয়োগ করা হয় বলে চাষিরা জানান। গাছের যখন ৫ দিন বয়স তখন পাতা বের হয় আর সে সময়ে গাছ থেকে ৪ আঙ্গুল দূরে গর্ত করে কীটনাশক দেওয়া হয়। তরমুজ ক্ষেতে লাল পোকা, জাপ পোকার দেখা দেয় তখন এ কীটনাশক  সংক্রমণ রোধে কাজ করে। এছাড়া তরমুজ গাছের ডগা ছাড়লে এবং ফল ধরার কিছুদিন আগে গাছে ওষুধ ¯েপ্র করা হয়। ফলে উপযুক্ত হারে ফলন বাড়ে বলে জানায় তরমুজ চাষিরা।
সরেজমিন পদ্মা চরের তরমুজ ক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন কৃষক মাথায় গামছা বেধে কাজ করছেন। কৃষক আলমগীর বলেন, পটুয়াখালী থেকে এই কাজের জন্য এখানে এসেছি। কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহে থেকে ১০ জন মিলে বীজ বপনের কাজ শুরু করেছি, পরবর্তীতে ৭ জন মিলে ধারাবাহিকভাবে সে কাজ চৈত্র মাস পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছি। বিকেল হলেই নারিশাসহ দোহারের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত উৎসুক জনতা পদ্মার শাখা নদী ট্রলারে পার হয়ে আসেন তরমুজ ক্ষেত দেখার জন্য।
দোহার উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, পদ্মার চরে এই প্রথমবারের মতো তরমুজের চাষের কথা শুনে একজন অফিসারের মাধ্যমে আমরা সার্বক্ষণিক কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। চরাঞ্চলে তরমুজের এ চাষ অব্যাহত রাখতে পারলে স্থানীয় দরিদ্র কৃষকরা অনেকটা স্বচ্ছলতা ফিরে পাবে। আগামী বছর এখানে তরমুজ চাষে স্থানীয় কৃষি অফিস কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করবে।

*লেখক: সিনিয়র সহ-সম্পাদক
মফস্বল বিভাগ
দৈনিক কালের কণ্ঠ
বসুন্ধরা, বারিধারা, ঢাকা।
মোবাইল: ০১৭১১৩৬৪৪৮৫

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *