তড়কা (অ্যানথ্রাঙ্) রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে করণীয়

মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ
তড়কা বা অ্যানথ্রাঙ্ কি?
তড়কা বা অ্যানথ্রাঙ্ গবাদি পশুর একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ৷ এ রোগের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত খাদ্য খেয়ে সাধারণত বিভিন্ন প্রাণী আক্রান্ত হয়৷ গবাদি পশু থেকে মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে৷
প্রচলিত নাম:
তড়কা, উবামড়কী, তীলাজ্বর, ধড়কা বা পলি৷
রোগের কারণ:
ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস (Bacillus anthracis) নামের এক প্রকার গ্রাম পজেটিভ ব্যাকটেরিয়া৷
অ্যানথ্রাঙ্ রোগের লক্ষণ:
১. তড়কা রোগে মৃতু্যহার অত্যাধিক, অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশের অল্প ক্ষণের মধ্যেই হঠাত্‍ করে মৃতু্য হতে পারে৷
২. প্রচন্ড জ্বর হয়৷ জ্বরের ফলে কাঁপুনি দেখা যায় ও লোম খাড়া হয়ে যায়৷ তাপমাত্রা ১০৭০ ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে৷
৩. ক্ষুধামন্দা, পেটফাঁপা, পেটে ব্যাথার কারণে লাথি মারে, রক্ত মিশ্রিত প্রস্র্রাব ও তরল পায়খানা হতে পারে৷ রোগের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে মল আলকাতরার মতো কালো ও শক্ত হয়ে যায়৷
৪. ঘাড়ের পিছনে চামড়ার নীচে তরল পদার্থ জমে ফুলে উঠে৷
৫. গর্ভবতী গাভীতে গর্ভপাত ও দুগ্ধবতী গাভীর দুধ উত্‍পাদন কমে যায়৷
৬. রোগের চুড়ান্ত পযর্ায়ে পশু নিস্তেজ হয়ে পড়ে৷ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, মাংসপেশীতে কাঁপুনি ও খিঁচুনী দেখা দেয়৷ লক্ষণ প্রকাশের ১-৩ দিনের মধ্যে আক্রান্ত পশু হঠাত্‍ পড়ে মারা যায় ৷
৭. মৃতু্যর পূর্ব মুহূর্তে বা মৃতু্য পরবতর্ীতে নাক, মুখ ও মলমূত্রের ছিদ্রপথ দিয়ে রক্ত নির্গত হয়৷
৮. অনেক সময় লক্ষণ প্রকাশের পূর্বেই পশুর মৃতু্য ঘটে৷
অ্যানথ্রাঙ্ রোগ প্রতিরোধে করণীয়:
১. তড়কা রোগের জীবাণু পরিবেশে অনেকদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে৷ স্যাঁতসেতে পরিবেশে এই জীবাণু বেশী বিস্তার লাভ করে৷ তাই এই রোগে মৃত পশু আগুনে পুড়িতে ফেলতে হবে বা ২ মিটার গর্তে পযর্াপ্ত কলিচুন সহযোগে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে৷
২. আক্রান্ত পশুর প্রাকৃতিক ছিদ্রপথ দিয়ে মৃতু্যর আগে বা পরে যাতে রক্ত বের হতে না পারে সেজন্য তুলা দিয়ে ছিদ্রপথগুলো বন্ধ করে দিতে হবে৷ মাটিতে আক্রান্ত পশুর রক্ত পড়ে থাকলে রক্তশুদ্ধ মাটি পুড়িয়ে ফেলতে হবে অথবা গভীর গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে৷
৩. এই রোগে আক্রান্ত মৃত পশু কাঁটা-ছেড়া করা উচিত নয়৷ ময়না তদন্ত করার প্রয়োজন হলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে৷ মনে রাখতে হবে এনথ্রাঙ্ রোগের জীবাণু দ্বারা মানুষও আক্রান্ত হয়৷
৪. পশুজাত দ্রব্য অথ্যর্াত্‍ মিট বা বোনমিল থেকেও জীবাণু ছড়াতে পারে বলে আক্রান্ত পশুর উপজাত মিট বা বোনমিল তৈরী করা উচিত নয়৷
৫. এই রোগে আক্রান্ত হলে আশে-পাশের সমস্ত পশুকে সঙ্গে সঙ্গে পৃথক করা উচিত৷
৬. স্পোর সৃষ্টির পূর্বেই মৃত পশুর গোয়াল ঘরকে গরম ১০% NaOH (60 Degree C)) দিয়ে ধুলে জীবাণুর মৃতু্য ঘটে৷
৭. সুস্থ গবাদি পশুকে (গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া) নিয়মিত বছরে একবার তড়কা রোগের টিকা দিতে হবে৷ সকল সরকারি পশু হাসপাতালে এ টিকা পাওয়া যায়৷
৮. মৃত গবাদি পশুর চামড়া ছাড়ানো উচিত নয় ৷ মৃত প্রাণীর দেহ, গোবর ও মল, লালা, প্রস্রাব, রক্ত ইত্যাদি গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে৷
৯. গবাদি পশুকে নদীনালার পানি ও জলাবদ্ধ জায়গায় ঘাস খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে৷
১০. রোগাক্রান্ত পশুর পরিত্যক্ত খাদ্য ও পানি সুস্থ পশুকে খাওয়ানো যাবে না।
অ্যানথ্রাঙ্ রোগ নিরাময়ে করণীয়:
১. অ্যানথ্রাঙ্ রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত পশুকে অন্যান্য গবাদি পশু ও মানুষের কাছ থেকে পৃথক করে রাখতে হবে৷
২. দ্রুত প্রাণী হাসপাতালে খবর দিতে হবে এবং চিকিত্‍সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্‍সা দিতে হবে৷
৩. পশু সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিতে মুখে কাপড় এবং হাতে পলিথিনের কাভার ব্যবহার করতে হবে৷
অ্যানথ্রাঙ্ বা তড়কা রোগে মানুষ আক্রান্ত হবার লক্ষণসমূহ:
১. আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে জ্বর উঠবে৷
২. চামড়ায় প্রথমে লালচে দাগ দেখা যাবে এবং সে স্থানটি চুলকাবে৷
৩. পরবতর্ীতে আক্রান্ত স্থানে প্রায় দেড়-দুই ইঞ্চি পরিমাণ ফোসকা দেখা দেবে এবং ফোসকার স্থানে পচনের মতো কালচে দাগ হবে৷ আক্রান্ত ব্যক্তি সঠিকভাবে চিকিত্‍সা না নিলে মারা যেতে পারেন৷
জেনে রাখুন:
১. তড়কা বা অ্যানথ্রাঙ্ রোগ গবাদী পশু থেকে মানুষে ছড়ায়, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না৷
২. এ রোগে আক্রান্ত পশুর মাংস কোন অবস্থাতেই খাওয়া যাবে না৷
৩. এ রোগে আক্রান্ত গবাদি পশু জবাই করা, চামড়া ছড়ানো বা মাংস কাটা, ধোয়ামোছা করা যাবে না৷

ছাত্র হল (রুম-২১৬)
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, খুলশী, চট্টগ্রাম৷
মোবাইল-০১৮১১৯৮৬৬০৫,

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *