দক্ষিণাঞ্চলের পতিত জমিতে কৃষি সম্ভাবনা

নদীমাতৃক কৃষি প্রধান বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার যার মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ উপকূলীয় এলাকা এবং শতকরা ৩০ ভাগ নিট আবাদি এলাকা। ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় উপকূলীয় জনসংখ্যার ঘনত্ব (৭৫০ জন/কিলোমিটার) কম। দেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.৩১ হেক্টর হলেও উপকূলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.২৯ হেক্টর (বিবিএস, ২০১০)। উপকূলের জীবনযাত্রা প্রধানত কৃষি নির্ভর। বর্তমানে বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা ১৯১ শতাংশ সে তুলনায় উপকূলে ফসলের নিবিড়তা ১৩৩ শতাংশ যা তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের কৃষি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষিজীবী মানুষের জীবন জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। মাটি ও পানির লবণাক্ততা, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, ঘন ঘন প্রলয়ংকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগ  সিডর, আইলা ও উচ্চ জোয়ারের প্রভাবে বেড়িবাঁধ ভেঙে কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ, কৃষি পণ্যের বাজারজাত করার অসুবিধা, সেচ ও নিষ্কাশনের অপ্রতুলতা মানসম্মত কৃষি উপকরণের অভাব, কৃষি শ্রমিকের অভাব, অপরিকল্পিতভাবে খাল দখল, খাল পুনঃখনন-সংস্কার, নদী ভরাট সমস্যা রয়েছে।

এ সব কারণে শুকনো মৌসুমে মাটি ও পানির লবণাক্ততার কারণে বেশিরভাগ জমি পতিত থাকে। দেরিতে আমন ধান কাটা ও মাটি এঁটেল প্রকৃতির হওয়ায় জো আসতে দেরি হওয়া, আমন রোপণের সময় পানির গভীরতা বেশি থাকার কারণে কৃষক স্থানীয় জাতের রোপা আমন চাষ করেন। শীতকালের স্থায়িত্ব কম হওয়ার জন্য গম, মসুর, সরিষার মতো রবি ফসল বপনের উপযুক্ত সময় থাকে না, সেচের পানির অভাবে কৃষক জমি পতিত রাখে। এ অঞ্চলের জন্য টেকসই কৃষি প্রযুক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাময় গবেষণার ফলাফল, আবহাওয়া, মাটি পানির লবণাক্ততা, লবণ সহনশীল ফসল-জাত ব্যবহার সমন্বয় করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর অভিযোজন কৌশলগুলো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে লবণাক্ত সহনশীল ফসলের জাতগুলোর বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণের কার্যক্রম গ্রহণ, ঘেরের আইলে ও বসতবাড়ির আঙিনায় ফল ও সবজি চাষ সম্প্রসারণ, স্বল্প পানির চাহিদা সম্পন্ন ফসলের আবাদ বাড়ানো, এলাকা উপযোগী খাটো জাতের নারিকেল, পেয়ারা, সফেদা, আমড়া, কুল, ডেউয়া, শরিফা পরিকল্পিত বাগান প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ মূল্যের ফসলের চাষাবাদ সম্প্রসারণ, স্থানীয় ফসলের জাতগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রায়োগিক কার্যক্রম গ্রহণ করা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, আউশ ধানের আবাদ বৃদ্ধি, ডাল ও তেল, মসলা ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ উপকূলীয় এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় উন্নয়নের সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে।

যার ফলে পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহারসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজিত কৃষি প্রযুক্তিগুলো সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে আরো গতিশীলতা আনতে হলে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে  এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজিত কৃষি প্রযুক্তিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাদের এগিয়ে আসতে হবে।

২. আসছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ সাল। নতুন বর্ষ প্রতিটি কৃষকের ঘরে ঘরে নিয়ে আসুক প্রাপ্তির বারতা। মুছে যাক যত সব জরা ও গ্লানি। আমাদের সকল পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়িদের প্রতি কৃষিবার্তা পরিবারের পক্ষ থেকে রইল ‘শুভ বাংলা নববর্ষ-১৪২৪’।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare