দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনায় বিবেচ্য বিষয়

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ

দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা

গাভী পালন করে যেখানে দুধ উৎপাদন করা হয় তাকে দুগ্ধ খামার বলে। খামারের সম্পদ, সময় ও শ্রমিকের সুষ্ঠু ব্যবহার করে চাহিদা মোতাবেক দুধ উৎপাদন করাই হচ্ছে দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ দুগ্ধ খামারে লাভজনকভাবে দুধ উৎপাদন করার জন্য সুষ্ঠুভাবে কাজকর্ম করাই হচ্ছে দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা। দুগ্ধ খামারে প্রতিদিনের কাজ একটি পূর্ণাঙ্গ সক্রিয় জীবন চক্রের মত যা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে সম্পাদন করতে হয়। যেমনÑ প্রতিদিন সকালে গোশালা ও গাভীর শরীর পরিষ্কার করা, দুধ দোহনের আগে গাভীকে দানাদার খাদ্য দিতে হয়, দুধ দোহন করা, দুধ বিক্রি করা, গাভীকে নিয়মিত ঘাস ও খড় জাতীয় খাদ্য সরবরাহ করা, অসুস্থ গাভীকে পৃথক করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা, গরম হওয়া গাভীকে যথাসময়ে কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থা করা, গাভী ও বাছুরের যতœ নেয়া, গাভীকে পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো, আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, নথিপত্র সংরক্ষণ রাখা, দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা, শ্রমিক কর্মচারিদের কাজে সন্তুষ্ট রাখা, যে কোন সমস্যা দ্রুত সমাধান করা ইত্যাদি কাজের তদারকি বা ব্যবস্থাপনা করাই দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা। এ কাজগুলো ব্যবস্থাপনা করেন ব্যবস্থাপক।

বাজারের চাহিদা মোতাবেক উচ্চমান সম্পন্ন দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করা দুগ্ধ খামারকে লাভজনক করে। বেশি দুধ উৎপাদনকারী উন্নত জাতের গাভী, খাদ্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদনে সহায়ক। দুগ্ধ খামারের জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিকল্পনা। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়।

দুগ্ধ খামারে ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু হলে-

১. পর্যাপ্ত গুণগতমান সম্পন্ন দুধ উৎপাদন হবে।

২ বাজারের চাহিদামত দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদন হবে।

৩. সময়মত দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদন হবে।

৪. উৎপাদন খরচ কম হবে।

৫. খামারে পুঁজি কম লাগবে।

৬. খামারে লাভ হবে।

৭. শ্রমিক কম লাগবে।

৮. গাভী ও বাছুর সুস্থ থাকবে।

৯. আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব থাকবে।

১০. নথিপত্র সংরক্ষণ থাকবে।

১১. খামারের সমস্যা কম হবে।

১২. খামারের আয় বাড়বে। পুঁজি বা বিনিয়োগ দ্রুত ফেরত পাওয়া যাবে।

১৩. খামারের শ্রমিক ও কর্মচারি সন্তুষ্ট থাকবে।

১৪. ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকবে।

১৫. খামার ক্রমেই বড় হবে।

দুগ্ধ খামারে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয় হচ্ছে-

১. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন: প্রতিদিন পশুর মলমূত্র পরিষ্কার করা। পশুর খাদ্য ও পানির পাত্র পরিষ্কার করা। বাচ্চা প্রসবের পর প্রসূতির ঘর জীবাণুমুক্ত করা।

২. স্বাস্থ্য সেবা: অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশু থেকে পৃথক করা। সুস্থ পশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

৩. জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা: কোনভাবেই যাতে খামারে ক্ষতিকর জীবাণু প্রবেশ না করে। এজন্য দর্শনার্থী খামারের কর্মকর্তা, কর্মচারি ও শ্রমিক জীবাণুমুক্ত হয়ে খামারে প্রবেশ করা। বিড়াল পাখি, ইঁদুর, কুকুর ইত্যাদি খামারে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।

৪. খাদ্য ও পানি দেয়া: সুষম খাদ্য তৈরি করে পরিমাণমত সঠিক সময়ে খাদ্য ও পানি দিতে হবে।

৫. নিয়মিত পশুকে গোসল করানো: পশুকে প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দেহ চিরুনি দিয়ে আঁচড়িয়ে দেয়া। এতে বহি: পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হবে না। দুধে ময়লা যাবে না।

৬. খাদ্য মজুদ রাখা: খামারে অন্তত: ৭ দিনের খাদ্য মজুদ রাখতে হয়।

৭. পরিবেশ বজায় রাখা: খামারের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, বাতাস চলাচল ইত্যাদি পশুর জন্য উপযোগী রাখা।

৮. প্রজনন করানো বা পশু ক্রয়: সময়মত গাভীকে প্রজনন করানো এবং প্রয়োজনে উন্নত জাতের বকনা ক্রয় করা।

৯. খামারের রেকর্ড রাখা: বাছুরের জন্ম রেকর্ড, প্রজনন রেকর্ড, স্বাস্থ্য রেকর্ড, উৎপাদন রেকর্ড, খাদ্য রেকর্ড, পশু মৃত্যু রেকর্ড, পশু বিক্রি রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য রেকর্ড রাখা হয়।

১০. খামারের আয়-ব্যয়: খামারের প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে হবে।

১১. বিবিধ ব্যবস্থাপনা: পশুকে ব্যায়াম, ক্ষুরের পরিপাটি করণ, শিং কর্তন, মাছি দমন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দুধ দোহন, দুধ বিক্রি, খাদ্য ক্রয়, যন্ত্রপাতি ক্রয় ইত্যাদি কাজ করা।

দুগ্ধবতী গাভী ও মহিষ নির্বাচন

গুণগতমান সম্পন্ন পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদনের জন্য নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দুগ্ধবতী গাভী ও মহিষ নির্বাচন করতে হবেÑ

১. ওলান বড়, সুগঠিত, চওড়া এবং শক্তভাবে দেহের সাথে আটকানো থাকে।

২.  ওলানের বাঁট চারটি সমান আকৃতির ও সমান দূরত্বে অবস্থিত হবে।

৩. দুধ দোহনের আগে ওলান শক্ত থাকে এবং দোহনের পর চুপসে যায়।

৪. ওলানের সামনে নাভীর দিকে সুস্পষ্ট ও উন্নত দুগ্ধ শিরা স্পষ্ট দেখা যায়।

৫. বাঁট টানলে দুধ বের হবে।

৬. অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিঁখুত, সুন্দর ও আকর্ষণীয় চেহারার হবে।

৭. পিছনের অংশ বেশি চওড়া এবং দাঁড়ানো অবস্থায় পিছনের পা দুটি বেশ ফাঁক থাকে।

৮. দেহের আকার অনুপাতে বুকের ও পেটের বেড় বেশি হয়।

৯.  বুকের পাঁজরগুলো আলাদা ও স্ফীত হয়।

১০. দেহ বেশ বড় এবং দেহ সামনের দিকে গরু এবং পিছনের দিকে ভারী হয়।

১১. চামড়া পাতলা ও মসৃণ হয়।

১২. মাথা মাঝারি, কপাল প্রশস্ত এবং চোয়াল শক্ত ও চওড়া।

১৩. নাকের ছিদ্র বড় ও খোলা হয়।

১৪. স্বভাব শান্ত প্রকৃতি।

১৫. খাদ্য গ্রহণে আগ্রহী।

১৬. উন্নত বা সংকরজাতের গাভী নির্বাচন করতে হয়।

উন্নত জাতের দুগ্ধবতী গাভী (গরু)- হলস্টিন ফ্রিজিয়ান (দৈনিক ৩৫-৪০ লিটার), লাল সিন্ধি (দৈনিক ১০-১২ লিটার), শাহীওয়াল (দৈনিক ১২-১৫ লিটার), জার্সি (দৈনিক ১৫-২০ লিটার), সংকরজাত (দৈনিক ২০-২৫ লিটার) ও আয়ার সায়ার (দৈনিক ১৫-১৮ লিটার)।

উন্নত জাতের দুগ্ধবতী গাভী (মহিষ) নিলি (দৈনিক ৩৫-৪০ লিটার), জাফরাবাদি (দৈনিক ১৫-২০ লিটার) ও মুররা (দৈনিক ৬-৭ লিটার)।

ফার্মে প্রসবকালীন গাভীর যত্ন

গাভীর বাচ্চা প্রসবের সময় নিম্নলিখিত যত্ন নিতে হয় :

১. গাভীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে।

২.  গাভীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

৩. প্রসবের সময় কোন সমস্যা হলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে প্রসবের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. বাচ্চা প্রসবের সাথে সাথে গর্ভফুল বের হয়। গর্ভফুল সাথে সাথে দূরে মাটির গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। গাভী গর্ভফুল খেয়ে ফেললে অজীর্ণতা দেখা দিবে এবং দুধ উৎপাদন কমে যাবে।

৫.  প্রসবের ১২ ঘণ্টা পরেও ফুল বের না হয়ে জরায়ুর ভিতর আটকে থাকলে পচে গিয়ে পুজেঁর সৃষ্টি করতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. বাচ্চা প্রসবের পরপরই অল্প গরম পানিতে ০.০১% পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা নিমপাতা সহযোগে পানি গরম করে গাভীর জননতন্ত্রের বাইরের অংশ এবং লেজ পরিষ্কার করতে হবে।

৭.  গাভীর যাতে ঠাণ্ডা না লাগে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

৮. নবজাতক বাছুরকে জিহবা দিয়ে চাটার জন্য গাভীর কাছে বাচ্চা আনতে হবে। এতে বাছুরের নিউমোনিয়া হয় না।

৯. প্রসবের পরপরই গাভীকে আংশিকভাবে দুধ দোহন করতে হবে।

১০. বাছুরকে শাল দুধ খাওয়ানোর জন্য ওলানের বাঁট চুষতে দিতে হবে। এতে গাভীর ওলান প্রদাহ হবে না।

১১.  প্রসবের সময় প্রসবনালীতে ক্ষতের সৃষ্টি হলে মাছি বসতে দেয়া যাবে না।

১২.  প্রসবের পর সবসময় গাভীর কাছে বাচ্চা রাখতে হবে। এতে গাভীর মন ভালো থাকে।

১৩.  গাভীকে প্রচুর কাঁচা ঘাস, সুষম খাদ্য ও পানি খাওয়াতে হবে। অন্যথায় ক্যালসিয়ামের অভাবে দুধজ্বর হতে পারে।

১৪. গাভী ও বাছুরের বাসস্থান শুকনা রাখতে হবে।

১৫.  পশু ডাক্তার দিয়ে গাভী ও বাচ্চার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

১৬.  প্রসবের পর অল্প গরম পানি বা গুড়ের সরবত গাভীকে খাওয়ানো ভালো।

দুগ্ধবতী গাভীর যত্ন

সর্বোচ্চ দুধ উৎপাদন নির্ভর করে দুগ্ধবতী গাভীর যতেœর উপর। নিচে দুগ্ধবতী গাভীর যতœ ও পরিচর্যা বর্ণনা করা হলো :

১. গাভীর বাসস্থান প্রতিদিন মেঝে, দেয়াল, নালা, নর্দমা ইত্যাদি জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

২.  প্রতিদিন গাভীকে ভালোভাবে ব্রাস করে গোসল করাতে হবে। গোসলের পর দেহ মুছে দিতে হবে।

৩. গোসলের পর চিরুনি দিয়ে দেহ আঁচড়িয়ে দিতে হবে। এতে পরজীবী দ্বারা গাভী আক্রান্ত হবে না।

৪. প্রচুর পরিমাণে কাঁচাঘাস, পানি ও সুষম খাদ্য খাওয়াতে হবে।

৫. গাভীর দেহে সকালের রোদ লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. গাভীকে প্রতিদিন ব্যায়ামের জন্য হাঁটাতে হবে।

৭. প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি ও শৈত্য প্রবাহের সময় গাভীকে ঘরে রাখতে হবে।

৮.  গাভীকে দিয়ে ভারবাহী কাজ করানো যাবে না।

৯. প্রতিদিন দুইবার সম্পূর্ণ দুধ দোহন করতে হবে। দোহনের সময় যাতে বাঁট বা ওলান ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

১০. বাছুরকে নিয়মিত দুধ খাওয়াতে হবে।

১১. দুধ দোহনকারী বা দুধ দোহনের যন্ত্র জীবাণুমুক্ত করে দুধ দোহন করতে হবে।

১২. বাছুর ও গাভী এক বাসস্থানে এবং একসাথে রাখতে হবে।

১৩. গাভীকে ষাঁড়ের সাথে বা অন্য পশুর সাথে রাখা যাবে না।

১৪. গাভী ও বাছুরকে টিকা দিতে হবে। কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে।

১৫.  অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে।

১৬. গাভীকে ভয় দেখানো বা মারপিট করা যাবে না।

১৭.  দুধ দোহনের সময় গাভীকে উত্তেজিত করা যাবে না। এতে দুধ উৎপাদন কম হয়।

১৮. গাভী ও বাছুরের থাকা, খাওয়া সবকিছু আরামদায়ক হতে হবে।

১৯.  দুগ্ধবতী গাভীর সুষম খাদ্য হচ্ছে- দৈনিক সবুজ কাঁচা ঘাস ১৫-২০ কেজি, শুকনা খড় ৩-৫ কেজি, দানাদার খাদ্য মিশ্রণ ২-৩ কেজি, লবণ ৫৫-৬০ গ্রাম ও পানি পর্যাপ্ত পরিমাণ খাওয়াতে হবে। গাভীকে প্রতিদিন নিম্নলিখিত পরিমাণ খাদ্য খাওয়াতে হয়-

ক. প্রতি ১.৫ লিটার দুধ উৎপাদনের জন্য খড় ও কাঁচা ঘাসের সাথে ০.৫ কেজি দানাদার খাদ্য দিতে হয়।

খ. শুধু খড় খাওয়ালে প্রতি ১.২৫ লিটার দুধ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ০.৫ কেজি অতিরিক্ত দানাদার খাদ্য দিতে হয়।

গ. গাভী প্রতি ১০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ২-৩ কেজি শুকনা খাদ্য দিতে হয়।

দুগ্ধবতী গাভীর দানাদার খাদ্য মিশ্রণ তৈরি

১. চালের কুঁড়া  ২ কেজি

২. গমের ভুসি    ৫ কেজি

৩. খেসারি ভাঙা ১.৮ কেজি

৪. তিল বা বাদামের খৈল  ১ কেজি

৫. লবণ ০.১ কেজি

৬. খনিজ মিশ্রণ  ০.১ কেজি

মোট  ১০ কেজি

খৈল গুঁড়ো করে সব খাদ্য উপাদান মিশিয়ে গরুকে খাওয়াতে হয়। খড় ও কাঁচাঘাস ছোট ছোট করে কেটে খাওয়াতে হবে। খড়ের সাথে চিটাগুড় ও ইউরিয়া মিশ্রিত করে খাওয়ালে দুধ উৎপাদন বাড়ে। ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক তৈরি করে খাওয়ানো যেতে পারে।

নবজাতক বাছুরের যত্ন

নিম্নে- নবজাতক বাছুরের যত্ন ও পরিচর্যা বর্ণনা করা হলো :

১. প্রসবের সাথে সাথে বাছুরের নাক ও মুখ থেকে পিচ্ছিল পদার্থ ও রক্ত পরিষ্কার করতে হবে।

২. গাভী যাতে বাছুরের দেহ চাটে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বাছুরের নিউমোনিয়া হবে না।

৩. গাভীর ওলানের বাঁট হালকা গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দুধ টেনে দেখে বাছুরের মুখ বাটে স্পর্শ করালে বাছুর দুধ খাবে।

৪.  শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হলে পিছনের দুই পা ধরে উঁচু করে আস্তে আস্তে ঝাঁকাতে হবে। প্রয়োজনে কৃত্রিমভাবে নাকমুখ দিয়ে ফুঁক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু করতে হবে। নতুবা বাছুর মারা যাবে।

৫.  প্রসবের সাথে সাথে বাছুরের নাভি দুই ইঞ্চি রেখে ধারালো ব্লেড বা কাঁচি দিয়ে কেটে যে কোন এন্টিবায়োটিক ওষুধ লাগাতে হবে।

৬. বাছুরকে কমপক্ষে এক মাস পর্যন্ত গাভীর শাল দুধ খাওয়াতে হবে। ১৩ সপ্তাহ পর থেকে অল্প কাঁচা ঘাস ও দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হবে। ওলান ও বাঁট ধুয়ে বাছুরকে দুধ খাওয়াতে হবে। বাছুর বাঁট টেনে দুধ খেতে না পারলে দুধ দোহন করে বোতলে ভরে খাওয়াতে হবে।

৭. সবসময় গাভীর কাছেই বাছুরকে রাখতে হবে। গোয়ালঘরে শুকনা খড় বা ছালা বিছিয়ে বাছুরের বিছানা করে দিতে হবে।

৮. মাঝে মাঝে খড়/ছালা পরিবর্তন করতে হবে  এবং রোদে শুকাতে হবে।

৯. বাছুরকে উষ্ণ নরম ও শুকনা স্থানে রাখতে হবে।

১০. শীতের সময় কাপড় বা চট দিয়ে বাছুরের দেহ ঢেকে দিতে হবে।

১১. বাছুরকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। নবজাতক বাছুরের দেহ পানি দিয়ে ধোয়ানো যাবে না।

১২.  তিন মাস বয়স থেকে বাছুরকে টিকা দিতে হবে এবং কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে।

১৩. বাছুরের বয়স ১৩ সপ্তাহের পর দুধের পরিমাণ কমিয়ে খড়, কাঁচাঘাস ও দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হবে। প্রয়োজনে মিল্ক রিপ্লেসার ও কিড স্টার্টার খাওয়ানো যেতে পারে।

১৪. ২৪ সপ্তাহ বয়স হলে দুধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে।

১৫.  বাছুরের রোগব্যাধি হলে এবং জন্মের পরপরই ডাক্তারকে দেখাতে হবে।

১৬.  বাছুরকে প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি ও শৈত্য প্রবাহ থেকে রক্ষা করতে হবে।

১৭.  বাছুরের স্বাস্থ্য মাঝে মাঝে ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।

১৮.  বাছুর অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখাতে হবে।

১৯.  বাছুরকে দৌঁড়াদৌঁড়ি করার সুযোগ দিলে বাছুর সুস্থ ও সবল থাকে। বাছুরকে দুধ খাওয়ানোর পরিমাণ হচ্ছেÑ জন্মের পর দৈনিক ১ম সপ্তাহে ২ লিটার, ২য় সপ্তাহে ৩ লিটার, ৩য়-১২ সপ্তাহ ৪ লিটার, ১৩-১৬ সপ্তাহ ৩ লিটার, ১৭-২০ সপ্তাহ ২ লিটার ও ২১-৪০ সপ্তাহ ১ লিটার।

বাছুরের ২য় সপ্তাহ থেকে কাফ স্টার্টার ও কচি ঘাস খাওয়াতে হবে। ২য় সপ্তাহে কাফ স্টার্টার ও কচি ঘাস যথাক্রমে ৫০ ও ২৫০ গ্রাম, ৩য় সপ্তাহে ১০০ ও ৩৫০ গ্রাম, ৪র্থ সপ্তাহে ৩০০ ও ৫০০ গ্রাম, ৫ম সপ্তাহে ৪০০ ও ৫০০ গ্রাম, ৬ষ্ঠ থেকে ১৩ সপ্তাহ পর্যন্ত স্টার্টার ও কচি ঘাস সমপরিমাণ খাওয়াতে হবে। অর্থাৎ ৬ষ্ঠ সপ্তাহে ৬০০ গ্রাম, ৭ম সপ্তাহে ৭০০ গ্রাম, ৮ম সপ্তাহে ৮০০ গ্রাম, ৯ম সপ্তাহে ১০০০ গ্রাম ও ১০-১৩ সপ্তাহে ১২০০ গ্রাম।

১৩ থেকে ৫০ সপ্তাহ পর্যন্ত নিম্নলিখিত দানাদার খাদ্য মিশ্রণ খাওয়াতে হয়

গমের ভুসি          ৪.৩        কেজি

চালের কুঁড়া        ১.৫        কেজি

খেসারি ভাঙা      ১.৫        কেজি

তিলের খৈল        ৫০০      গ্রাম

ছোলা ভাঙা         ২             কেজি

ভিটামিন বা খনিজ পদার্থ              ৫০         গ্রাম

লবণ      ১০০       গ্রাম

মোট      ১০          কেজি

তিলের খৈল, খেসারি ভাঙা ও ছোলা ভাঙা গুঁড়ো করে সকল উপাদান একত্র মিশিয়ে বাছুরকে খাওয়াতে হবে।

————————————–

লেখকঃ কৃষি প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ,

ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত লেখক। মোবাইলঃ ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare