দেশের মাংস শিল্পে নতুন ঝলক ব্রাহমা ক্রস

 

মোহা. ইউসুফ আলী

 

স্বাধীনতার পর দেশে মেধাবী জাতি গঠনে দুধ উৎপাদনের লক্ষ্যে আমাদের দেশে বিদেশ থেকে অধিক দুধ উৎপাদনকারী গাভীর জাত এনে দেশীয় জাতের সাথে সংকরায়ণের মাধ্যমে উন্নত করার চেষ্টা করা হয়। ফলে বর্তমানে দুগ্ধ খাতে কাংঙ্খিত সাফল্য অর্জিত করতে না পারলেও মোট চাহিদার ২০ শতাংশ পূরণে করতে পারছে। উন্নত জাতের সাথে সংকরায়ণের ফলে দেশীয় গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা দিনে ১-১.৫ কেজি হতে ৫-৭ কেজিতে উন্নত হয়েছে। অপরদিকে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মাংস উৎপাদনকারী কোন জাত উন্নয়নে নেওয়া হয়নি তেমন কোন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। ফলে মাংস উৎপাদনকারী গরুর যে পৃথক জাতের আছে সে সম্পর্কে ধারণা না থাকায় দুধ উৎপাদনকারী গরুর ষাঁড় বাছুরকেই মাংস উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে আসছেন গরু মোটাতাজাকরণ খামারীরা। দুধ উৎপাদনকারী গরুর মধ্যে মাংস উৎপাদনের বৈশিষ্ট্য (জিন) না থাকায় সঠিক লালন-পালন ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করেও কাঙ্খিত সাফল্য পায় না খামারীরা। ফলে গরুর অধিক বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরণের বৃদ্ধিবর্ধক রাসায়নিক হরমোন ব্যবহার করা হয়। এসকল রাসায়নিক হরমোন গরু শরীরের কোষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি গঠিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে মোটাতাজা করে। এসব হরমোন ব্যবহারের ফলে গরুকে দেখতে মোটাতাজা মনে হলেও তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। কারণ ব্যবহারকৃত ওইসকল রাসায়নিক হরমোনের ক্ষতিকর প্রভাব গরুর মাংসের মধ্যে থেকে যায়। যা পরবর্তীতে মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে চলে আসে। যা মানুষের ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, শিশুদের শরীরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করা সহ বিভিন্ন মারাতœক রোগে আক্রান্ত করে।

 

তবে কোন প্রকার রাসায়নিক হরমোন ব্যবহার না করেই অধিক মাংস উৎপাদনকারী গরুর ক্রস উদ্ভাবনে সাফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশু প্রজনন বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে পশুপালন অনুষদের পশুবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজাফফর হোসেনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিন বছর মেয়াদী ‘‘দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রির উদ্ভাবনমুখী গবেষণা’’ প্রকল্পের ব্রাহমাঃ গরু মোটাতাজাকরণের সম্ভাবনাময় জাত শীর্ষক উপ-প্রকল্পের অধীনে অধ্যাপক ড. আজহারুল হক ওই সাফল্য পান।

 

অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল হক সম্ভবনাময় ব্রাহমা জাতটি সম্পর্কে বলেন, দেশে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে সরকারি-বেসরকারি ভাবে বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিমালা নির্ধারণ করা হলেও মাংস উৎপাদনকারী গরুর জাত উন্নতকরণে কার্যত কোন গবেষণা বা নীতিমালা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। ফলে দেশে মাংস উৎপাদনকারী কোন গরুর জাত তো নেই অপরদিকে কোন অধিক মাংস উৎপাদনকারী কোন উন্নত গরুর ক্রসও আমাদের দেশে ছিল না। ফলে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে আবাদে আমাদের দেশে ভারতীয় গরু প্রবেশ করার নতুন নতুন রোগে সংক্রামিত হচ্ছে দেশীয় প্রাণিসম্পদ। অপরদিকে মাংস উৎপাদনের জন্য কাঙ্খিত কোন গরুর জাত বা ক্রস না থাকায় গরু মোটাতাজাকরণ খামারীরা দুধ উৎপাদনকারী গরুর ষাঁড় বাচ্চাকে মাংস উৎপাদনের জন্য লালন-পালন করেন। অল্প সময়ে অধিক মাংস উৎপাদনের বৈশিষ্ট্য ঐ সকল ষাঁড় বাছুরে না থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অধিক খাবার ও ব্যবস্থাপনা সরবরাহ করেও কাঙ্খিত ফল পান না খামারীরা। ফলে খামারী গরুকে বাজারজাত করার ২-৩ মাস আগে অধিক বৃদ্ধিবর্ধক রাসায়নিক হরমোন স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। স্টেরয়েড ইনজেকশন ব্যবহারের ফলে গরুর আকার ও ওজন দ্রু ত বৃদ্ধি পায়। রাসায়নিক হরমোন মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি গরুর জন্যও ক্ষতিকর। স্টেরয়ড ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় পর গরুকে জবাই না করলে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে গরু মারা যেতে পারে।

 

কিন্তু দেশীয় গাভীকে অধিক মাংস উৎপাদনকারী ব্রাহমা জাতের সাথে সংকরণ করিয়ে যে ষাঁড় বাছুর পাওয়া যাবে তা দেশীয় ও দুধ উৎপাদনকারী গরুর জাতের থেকে দ্রুত বর্ধনশীল ও অধিক মাংস উৎপাদনক্ষম। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বাংলাদেশে প্রথম আমেরিকা থেকে মাংস উৎপাদনে বিশ্বে এক নম্বর জাত ব্রাহমার সিমেন সংগ্রহ করে দেশের ১২টি স্থানে দেশীয় গাভীর সাথে সংকরায়ণ করে ব্রাহমা ক্রসের প্রথম প্রজন্ম সৃষ্টি করে। প্রথম ক্রস প্রজন্মের দৈনিক বৃদ্ধি ছিল ৭০০-৯৫০ গ্রাম।

 

এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্থানের ব্রাহমা ক্রসের ৪টি ভাল মানের ষাঁড়কে সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে আনা হয়। সংগৃহিত ক্রস থেকে পরবর্তীতে কৃত্রিম সিমেন সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রহ সিমেন কৃত্রিম প্রজনন কর্মীর মাধ্যমে ময়মনসিংহের সদর উপজেলার বয়রা, ভবখালি ও গৌরীপুর উপজেলার ডোয়াখোলা ইউনিয়নের ১৩৯২ টি গাভীকে কৃত্রিম প্রজনন করানো হয়। প্রজননকৃত গাভী থেকে প্রাপ্ত দ্বিতীয় প্রজন্মের ষাঁড় বাছুরের দৈনিক দৈহিক বৃদ্ধি ৭০০ গ্রামের বেশি পাওয়া গেছে।

 

ড. মো. আজহারুল হক ক্রসটি নিয়ে আরো বলেন, ব্রাহমা জাতটি ভারতীয় উপমহাদেশের বংশোভূত হওয়ায় বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য অনুকূল ফলে রোগ বালাই হয় না বললেই চলে। তাই এ জাতের গরু লালন পালন ব্যবস্থাপনা দেশীয় প্রজাতির গরুর মতই। তবে এ জাতের গরুর বাচ্চা জন্মের পর আকারে বড় হওয়ায় বাছুরের পরিচর্যা একটু বেশি নেওয়া প্রয়োজন হয়। তাই জন্মের ৩ মাস পর্যন্ত বাছুরকে প্রতিদিন ১.৫-২ কেজি দুধ বেশি খাওয়ানো প্রয়োজন। সুস্থ অবস্থায় অন্যান্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে ৬ মাস বয়স ছাড়াও প্রতি বছর কৃমি নাশক ঔষধ ১ ডোজ করে খাওয়াতে হবে।

 

জাতটির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে ব্যবস্থাপক অধ্যাপক ড. মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, অধিক মাংস উৎপাদনে সক্ষম ষাঁড় বাছুরের অভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুরগীর মাংস উৎপাদনের মত দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গরুর মাংস উৎপাদনকারী তেমন কোন শিল্প গড়ে উঠেনি। কিন্তু ব্রাহমা ক্রস সারা দেশে জড়িয়ে দিতে পারলে স্বাস্থ্যসম্মত গরুর মাংসের বাণিজ্যিক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যদিকে স্বল্প সময়ে এবং কমখরচে ব্রাহমা ক্রস অধিক মাংস উৎপাদন করায় দেশের গরুর মাংসের চাহিদা পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

ব্রাহমা ক্রসের দ্বিতীয় প্রজন্মকে নির্বাচনের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত বিশুদ্ধ ব্রাহমার সাথে সংকরায়ণ করার মাধ্যমে দেশীয় আবহাওয়ার উপযুক্ত অধিক মাংস উৎপাদনকারী নতুন একটি গরুর জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন গবেষক ড. মো. আজহারুর হক। সেক্ষেত্রে সরকার ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাংস উৎপাদনে আগ্রহী উদ্যোক্তরা প্রকল্পটি চালিয়ে যেতে আর্থিক সহযোগীতা করলে যেমন গরু লালন পালনকারী খামারীরা তাদের পশুর জন্য খাদ্য, পথ্যের পাশাপাশি তাদের গরুর নায্য মূল্যে পাবে তেমনি উদ্যোগক্তা সরকারি বেসরকারি কোম্পানীগুলো তাদের কোম্পানীর জন্য রাসায়নিক ক্ষতিকর হরমোনবিহীন প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা গরুর মাংস গরু পালনকারী খামারীদের কাছ থেকে সহজেই পেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম প্রজনন সেন্টার  এসব খামারীদের সিমেন সরবরাহ করার মাধ্যমে ওইসব গরুর প্রজনন করিয়ে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণ করে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন পশু বিজ্ঞানীরা।

 

লেখকঃ

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, ২১৩/খ, আশরাফুল হক হল

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,

ময়মনসিংহ- ২২০২,

মোবাইল- ০১৭২১ ৫১২৫৪০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare