ধান কি কৃষকের গলার ফাঁস ?

এখন চলছে বোরো ধান কাটার মৌসুম। কিন্তু সারা দেশে ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক এটা এখন ‘টক অফ দ্যা কান্ট্রি’। উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে। ফলে ধান বিক্রি করে কৃষকের খরচ তো উঠছেই না বরং আরও লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকারি হিসাবে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ ৮০০ টাকা। বাজারে প্রতি মণ ধান গড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়। প্রতি মণে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৩০০ টাকা। প্রতি বিঘায় গড়ে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান উৎপাদিত হচ্ছে। এ হিসাবে ধান চাষ করে প্রতি বিঘায় কৃষকের লোকসান হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা।

এ অর্থ বছরে সার-কীটনাশক ও ডিজেলসহ অন্য সব কৃষি সামগ্রীর দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ধান রোপণ করা থেকে কাটা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কৃষাণ-মজুরের মজুরিও বেড়েছে। ধান কাটতে একজন মজুর দিনে ৫০০ টাকা মজুরি নেয়। অথচ ধান চাষ করে যে টাকা খরচ হয়েছে, কৃষকদের সে খরচই উঠছে না। তাছাড়া দাদন ব্যবসায়ী-এনজিওসহ বিভিন্ন স্থান থেকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে ধান চাষ করে এখন বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেক দামে। এছাড়া বছরের শুরু থেকে হরতাল-অবরোধের কারণে কৃষক উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেনি। ফলে ওই মৌসুমেও তাদের বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। পর পর টানা দুটি ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের আর্থিক দুরবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। এদিকে নতুন করে আমন চাষের সময় চলে এসেছে। এ সময়ে আগের ঋণ শোধ না করতে পারলে নতুন ঋণ পাওয়া যাবে না। ফলে আগামীতে অর্থ সংকটের কারণে জমি চাষ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। এসব মিলে কৃষক এখন হতাশাগ্রস্ত। ধান চাষ যেন এখন কৃষকের গলায় ফাঁস হয়ে দেখা দিচ্ছে।

অপরদিকে বাম্পার ফলনে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হলেও মোটা অংকের মুনাফা করছেন মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া ও মিলাররা। তারা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে এখন চড়া দামে সরকারের কাছে বিক্রি করছেন। ফলে ধানের মুনাফার পুরোটাই চলে যাচ্ছে ফড়িয়া ও মিলারদের পকেটে। অন্যদিকে ভারতীয় চালে দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। সরকারের শুল্কমুক্ত সুবিধার সুযোগ নিয়ে চাহিদা বিবেচনা না করেই লাখ লাখ টন ধান ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। গত ফেরুয়ারি থেকেই ভারত থেকে চাল আমদানির জন্য ব্যাপকভাবে এলসি খোলা শুরু হয়। গড়ে গত বছরের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি এলসি খোলা হয়েছে। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ১০৫ কোটি ডলারের চাল আমদানি করা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি করা হয়েছিল ৭৭ কোটি ডলারের। আমদানি করা চালের মূল্য কম হওয়ায় এবং চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানি হওয়ায় গত আমন মৌসুমেও চাষীরা পানির দরে ধান বিক্রি করেছে। অপরদিকে কৃষকদের মূল্য সহায়তা দেয়ার জন্য প্রতিবছরই সরকার চাল ও ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করে। কিন্তু এর জটিল নীতিমালার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সুফল পাচ্ছে না কৃষক।

এভাবে ধানের দাম না পেলে আগামী মৌসুমে ধান উৎপাদনে কৃষক নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বে বলে অনেকে আশংকা প্রকাশ করছেন। পরিশেষে, ধান আমাদের জীবন, ধান আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ধানের উৎপাদন ধরে রাখা এবং চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য অবহেলিত চাষিদের পাশে সরকারি পর্যায় থেকে দাঁড়াতে হবে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare