নরসিংদীর শিবপুরে মাল্টা চাষে সম্ভাবনার বার্তা

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল

নরসিংদীর শিবপুরের কৃষকরাও। লটকন আর লেবুর জন্য খ্যাত শিবপুরের কৃষকরা ঝুঁকছে মাল্টা চাষে। আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুন ভালো হওয়ায় ফলনও হয়েছে বেশ। এতে আশাবাদী হয়ে উঠেছে কৃষকরা। তারা জানায়, আমদানী যোগ্য এই ফল চাষ প্রসারে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়া হলে অল্পদিনের ব্যাবধানে দেশের চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০০৩ সালে বারি মাল্টা উদ্ভাবন করেন। এর বীজ বারি মাল্টা-১ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করেছে। বারি মাল্টা-১ ফলের গায়ে পয়সার মতো ছাপ থাকে। তাই স্থানীয়রা একে পয়সা মাল্টা বলে। উচ্চ ফলনশীল ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এ ফল দেখতে আকর্ষনীয় সবুজ এবং খেতে সুস্বাদু। জানুয়ারী থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে গাছে ফুল আসে এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে ফল আহরণের উপযোগী হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিবপুরের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ২০১১ সালে বারি মাল্টা-১ জাতের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করে। প্রায় আড়াই বছর নিবিড় পরিচর্যা ও গবেষণার পর গবেষকরা সফলতা পায়। গবেষকরা পাহাড়ী এলাকা হিসেবে পরিচিত শিবপুর অঞ্চলে উষ্ণ জলবায়ু, মাটি অম্ল ও ক্ষারীয় হওয়ায় মাল্টা চাষে অপার সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

এরই প্রেক্ষিতে মাল্টা চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগী হয় শিবপুর উপজেলা প্রশাসন। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে সিলেট জেলার জৈন্তাপুরের কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে সংগৃহিত বারি মাল্টা-১ জাতের প্রায় ১৫ হাজার মাল্টা গাছের চারা বিতরণ করা হয়। উপজেলার ৩০০ বাগানের পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে এক হাজার মানুষকে এসব চারা দেওয়া হয়। এতে সহযোগীতা করেন স্থানীয় কৃষি বিভাগ। প্রায় দুই বছর নিবিড় পরিচর্যার পর সাফল্য পেয়েছে কৃষক। গাছগুলোতে থোকা থোকা মাল্টা দেখে চাষিদের মুখে ফুটেছে হাসি। আকারে বড় ও খেতে সুস্বাদু হওয়ায় মাল্টা চাষে গর্বিত করে তুলেছে তাদের।

সম্প্রতি শিবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সবজি, লেবু ও লটকনের বাগানের পাশাপাশি নতুন করে কৃষকরা ঝুঁকছে মাল্টা চাষে। উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কৃষকরা মাল্টা চাষ করেছে। অধিকাংশ বাগানেই গিয়ে দেখা যায়, গাছে ফল নেই। এর কারণ জানতে চাইলে কৃষকরা জানায়, কৃষি বিভাগের পরামর্শে গাছ থেকে ফল ফেলে দেয়া হয়েছে। এতে গাছ বড় ও পরিপূর্ণ হবে। আগামী বছর থেকে গাছগুলো থেকে মাল্টা সংগ্রহ করা হবে।

তবে উপজেলার ইটাখোলা মুনসেফের চরের জাহাঙ্গীর আলমের মাল্টা বাগানে গিয়ে অভিভূত না হওয়ার উপায় নেই। বাগানটি এই উপজেলায় মাল্টা চাষের ভবিষ্যত সম্ভাবনার টেলার। ছোট ছোট গাছে ঝুলছে থোকা থোকা মাল্টা। মাল্টা ফলে ঢেকে গেছে সারি সারি গাছের পাতা। সঙ্গে লাগানো কমলাগাছেও ফল ধরেছে।

বাগানে দেখাতে দেখাতে কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উপজেলা পরিষদের দেয়া চারায় আমি এক বিঘা জমিতে মাল্টা বাগান করেছি। মাল্টার ফলন এমন হবে, এটা ভাবতেও পারিনি। প্রতিটি গাছে ১৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত ফল ধরেছে। সামনে আশা করি আরও ভাল ফলন হবে।

তিনি জানান, মাল্টা চাষে তেমন খরচ নেই। কীটনাশক, খুঁটি ও শ্রমিকের খরচ বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। বাগানের ফলনে আমার আশা ৪ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারবো। আগামীতে ফলনের সঙ্গে সঙ্গে লাভও বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস।

একই উপজেলার আইয়ুবপুর ইউনিয়নের গোড়ারগাঁও গ্রামের মাল্টা চাষী আফজালুল হক বলেন, শিবপুরের মাল্টার স্বাদ ও গন্ধ বাজারের সাধারণ মাল্টার চেয়ে ভাল। এতে আমরা আশাবাদী এই এলাকার সবজি, লেবু ও লটকনের পাশাপাশি মাল্টাও দেশের মানুষের মন জয় করবে।

শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা বলেন, আমাদের দেশের মাল্টার চাহিদার পুরোটাই বিদেশী আমদানী নির্ভর। একই সঙ্গে মাল্টাকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে ফরমালিনের মতো ক্ষতিকারণ পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। অপরদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাল্টা বাগানের ফলন ভাল খেতেও সুস্বাধু। তাই আমরা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাল্টা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেই। ইতিমধ্যে মাল্টার ফলনে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। এতে মাল্টা চাষের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন শিবপুরের কৃষকরা। চলতি বছরে আরও ২০ হাজার মাল্টা ও ৫ হাজার কমলা গাছের চারা বিতরণের পরিকল্পনার কথা জানান উপজেলা চেয়ারম্যান।

উপজেলা পরিষদের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের মাধ্যমে মাল্টা, কমলা ও লেবুর মিশ্র বাগানের প্রদশর্নী করেছে। প্রথম বছরের ফলনে উজ্জীবিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বলেন, মাল্টার চাষে যে রকম সাড়া পড়েছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যেই তা হয়তো লটকন আর কলম্বো লেবুকে ছাড়িয়ে যাবে। মাল্টা চাষ নরসিংদীতে একটি বিল্পব আনবে। এবং তা সারা দেশে সাড়া জাগাবে। বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষ হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি কৃষকরা লাভবান হবেন। মাল্টা চাষ সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

————————————–

লেখকঃ

মফস্বল সম্পাদক, কালের কণ্ঠ, বসুন্ধরা, বারিধারা, ঢাকা।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *