নামলা আখের চাষ

কৃষিবিদ নিতাই চন্দ্র রায়:

আখ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল এবং চিনি ও গুড় উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ একর জমিতে আখের চাষ করা হয়। চাষকৃত জমির শতকরা ২৫-৩০ ভাগ আগাম এবং বাকি ৭০-৭৫ ভাগ জমিতে নামলা আখের চাষ করা হয়। পৃথিবীর অন্যান্য আখ উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে একর প্রতি আখের ফলন খুব কম;মাত্র ১৯ মেট্রিক টন।  উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নামলা আখ চাষ করেও আখের ফলন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব। সরিষা, মসুর প্রভৃতি  রবি ফসল ও শীত কালীন শাকসবজি তোলার পর অথবা আখ কাটার পর মোথা তুলে  ওই জমিতে শীতের তীব্রতা কমে আসার সাথে সাথে মধ্য জানুয়ারি থেকে ফেব্র“য়ারি মাস সময় পর্যন্ত যে আখের চাষ করা  হয় তাকে নামলা আখ বলে। নামলা আখ চাষের বেলায় নিম্ন লিখিত বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

০১। জমি নির্বাচনঃ নামলা আখ চাষের জন্য উঁচু, মধ্যম উঁচু দোঁআশ মাটি বা এটেল দোআঁশ মাটি নির্বাচন করতে হবে।

০২। জাত নির্বাচনঃ উঁচু জমির জন্য ঈশ্বরদী-১৬, ঈশ্বরদী-২১, ঈশ্বরদী-২৬, ঈশ্বরদী-৩২, ঈশ্বরদী-৩৩, ঈশ্বরদী-৩৫, ঈশ্বরদী-৩৬, ঈশ্বরদী-৩৭ ও ঈশ্বরদী-৩৯ এবং মধ্যম উঁচু জমির জন্য ঈশ্বরদী-২/৫৪, এলজেসি, ঈশ্বরদী-২০ ও ঈশ্বরদী-৩৪  জাতগুলো নির্বাচন করতে হবে।

০৩।       জমি তৈরীঃ এসময় উচ্চ তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য জমির রস দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। তাই নামলা আখ চাষের জন্য ৪ থেকে ৫ টি গভীর চাষ ও মই দিয়ে উত্তমরূপে জমি তৈরী করতে হবে। জমি তৈরীর সময় একর প্রতি চার টন পচা গোবর বা আবর্জনা সার ব্যবহার করতে হবে।

০৪। নালা তৈরীঃ নামলা আখ রোপণের সময় বীজ খণ্ডগুলো গভীর নালায় রোপণ করা উচিত। কারণ এসময়ে জমির ওপর থেকে ৬ ইঞ্চি গভীরতায় কোন রস থাকে না। এটেল দোআঁশ মাটিতে আড়াই ফুট দূরে দূরে এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে ২ ফুট দূরে দূরে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি গভীরতায় নালা কাটতে হবে।

০৫। বীজের পরিমাণ- নামলা আখ রোপণের জন্য একর প্রতি ২.৫ টন বীজের প্রয়োজন হয়।

০৬। বীজখণ্ড তৈরীঃ নামলা আখের বেলায় প্রত্যায়িত বীজ ক্ষেত হতে আখের উপরের অর্ধেক অংশ বীজ হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। কারণ নিচের অংশে চিনির পরিমাণ বেশি থাকার ফলে অংকুরোদগম কম হয়। একটি শক্ত কাঠ খণ্ডের ওপর বীজ আখ রেখে ধারালো  হাসুয়া বা দা দিয়ে এক কোপে দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খণ্ড তৈরী করতে হবে। বীজ খণ্ড তৈরীর সময় মাঝেমধ্যে দা বা হাসুয়াটি আগুনে ঝলসিয়ে নিতে হবে।

০৭। বীজ শোধনঃ রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ হতে আখ ফসলকে রক্ষা করার জন্য রোপণের আগে আখ বীজখণ্ড অবশ্যই ছত্রাক নাশক ওষুধ দ্বারা শোধন  করে নিতে হবে। এজন্য ২০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ভিটাকন ৫০ ডাব্লিউপি মিশিয়ে প্রয়োজনীয় বীজ ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে।

০৮।       নালায় সার প্রয়োগঃ একর প্রতি ৭২ কেজি টিএসপি, ৫৫ কেজি ইউরিয়া, ৫২ কেজি এমওপি, ৫৬ কেজি জিপসাম, ৩ কেজি জিংক সালফেট ও ৭৫ কেজি খইল নালায় প্রয়োগ করে ছোট কোদাল দিয়ে কুপিয়ে নালার মাটির সাথে উত্তমরূপে মিশিয়ে দিতে হবে।  সারের পরিমাণ আবহাওয়া ও অঞ্চল ভেদে কম বেশি হতে পারে।

০৯। মাটি শোধনঃ নামলা রোপণ করা আখ উঁইপোকার আক্রমণে যে কোন সময় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। উঁইপোকা দমনের জন্য একর প্রতি ৬.৬ কেজি রিজেন্ট-৩ জিআর সারের সাথে মিশিয়ে নালায় প্রয়োগ করতে হবে এবং রসের অভাব হলে সাথে সাথে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

১০। সাথি ফসলের চাষঃ নামলা আখের জমিতে সাথি ফসল হিসেবে চারা পেঁয়াজ, গীমা কলমি, লালশাক, মরিচ, গ্রীষ্মকালীন মুগ ও টমেটোর চাষ করা যেতে পারে। সাথি ফসলের জন্য আলাদা করে সার ব্যবহার ও পরিচর্যা করতে হবে।

১১।         ফাঁকা স্থান পূরণঃ বাংলাদেশে নতুন রোপণ করা আখের জমিতে শতকরা ৩৩ ভাগ ফাঁকা জায়গা থাকে, যা আখের ফলন হ্রাসের অন্যতম কারণ। আখ রোপণের ৩০ দিনের মধ্যে যদি ৩ ফুট জায়গার মধ্যে কোন চারা না গজায় সেখানে মাথার বীজ খণ্ড/ বীজ তলায় চারা/ ঘন স্থান হতে চারা তুলে তা দিয়ে ফাঁকা স্থান পূরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। আখের চারা দিয়ে ফাঁকা স্থান পূরণের আগে চারার পাতার তিন ভাগের দুই অংশ কেটে দিতে হবে এবং চারা রোপণের সাথে সাথে কম পক্ষে একটি জীবনী সেচ দিতে হবে।

১১। পোকা-মাকড় দমনঃ নামলা আখের জমিতে এপ্রিল-মে মাসে ডগার মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। আক্রমণ তীব্র হলে একর প্রতি ১৬ কেজি এডফুরান-৫জি ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া এডফুরান প্রয়োগের কারণে গাছের শিকড়ের পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।  গাছ মাটি থেকে বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন, আয়রন ও জিঙ্ক গ্রহণ করতে পারে, ফলে গাছের পাতা ঘন সবুজ রং ধারণ করে ।

১২। উপরি সার প্রয়োগঃ আখ রোপণের ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে আখের সারি থেকে ১৫ সেমি; দূরে লাঙ্গল দিয়ে ভাউর টেনে একর প্রতি ৫৬ কেজি ইউরিয়া ও ৫৩ কেজি এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। উপরি সার প্রয়োগের সময় জমিতে জো অবস্থা থাকতে হবে।

১৩। সেচ প্রয়োগঃ মার্চ- এপ্রিল মাসে জমিতে রসের অভাব দেখা দিলে ৪ থেকে ৫ বার সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। ফলন বেশি পেতে হলে এটেল দোআঁশ মাটিতে এক মাস পরপর এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে ১৫ দিন পর পর সেচ দিতে হবে।

১৪। অন্যান্য পরিচর্যাঃ এছাড়া আগাছা দমন, মাটি আলগা করণ, গোড়ায় মাটি দেয়া, কুশি ব্যবস্থাপনা, ঝাড় বাঁধাসহ অন্যান্য পরিচর্যাগুলো সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে।

১৫। ফলনঃ সঠিক যতœ নিলে নামলা আখ চাষেও একর প্রতি ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়।

 

লেখক :

ডিজিএম (সম্প্র)

সেতাবগঞ্জ সুগারমিলস্ লিঃ

সেতাবগঞ্জ দিনাজপুর

মোবাইল: ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ই-মেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *