পরিবেশ সুরক্ষা ও  জাতীয় অর্থনৈতিতে বৃক্ষের অবদান

নিতাই চন্দ্র রায়

বৃক্ষই মানুষের  প্রকৃত বন্ধু। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে জীবন ধারণের উপকরণ  সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৃক্ষ আমাদের  অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। বৃক্ষ রোপণ, পরিচর্যার ও সংরক্ষণের বিষয়ে  দেশের জনগণকে সচেতন ও আগ্রহী করে তুলতে গত ৪ জুন  থেকে শুরু হয়েছে জাতীয় বৃক্ষ রোপণ অভিযানও বৃক্ষমেলা ২০১৭। এবারের বৃক্ষ রোপণ অভিযানের প্রতিপাদ্য হলো-‘বৃক্ষ রোপণ করে যে, সম্পদশালী হয় সে’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক  সম্মেলন কেন্দ্রে এবারের বৃক্ষ রোপণ অভিযান ও বৃক্ষ মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের খালি  জায়গা, সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইনের দু’পাশ, চারণভূমি, বাড়ির আশ-পাশের পতিত  জমিতে বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে এদেশকে আরো সম্পদশালী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য  সকলের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘জীবন ও জীবিকার জন্য বৃক্ষ অপরিহার্য। পরিবেশ প্রতিবেশ  সংরক্ষণ, ভূমির ক্ষয় রোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলায়ও বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষের সবুজ বেষ্টনী ঝড় ও জলোচ্ছাসের তীব্রতা কমিয়ে জীবনও সম্পদ রক্ষা করে। ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাছ-পালা, লতাগুলো ও সবুজ প্রকৃতিকে খুব ভালবাসতেন। তিনি বৃক্ষরোপণকে খুব গুরুত্ব দিতেন এবং বণ্যপ্রাণী অধ্যাদেশ তাঁর সময় জারি করা হয়।

একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে শতকরা ২৫ ভাগ  জমিতে বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ  জমিতে বনভূমি রয়েছে। অপরদিকে জাপানে শতকরা ৬৩ ভাগ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬৫, মালয়েশিয়ায় ৬৩, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫, ফিলিপাইনে ৩৬, থাইল্যান্ডে ৪৮, নেপালে ২৩, শ্রীলঙ্কাতে ৪৭ ও মিয়ানমারে ৬৭ ভাগ এলাকায় বনভূমি রয়েছে। বাংলাদেশে মোট ২৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি রয়েছে।

অপরিকল্পিত ও নগরায়ণ ফলে আমারা প্রতি বছর হারাচ্ছি  দশমিক ৭ ভাগ হারে কৃষি জমি, উজার করছি বনভূমি এবং ধ্বংস করছি বন্যপ্রাণীদের অভয় আশ্রয়স্থল। একারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে দেশ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে প্রায় দুই শতাধিক লোক মারা যায়, বহু লোক আহত হয় এবং শতশত বাড়ি-ঘর বিধ্বস্থ হয় তার প্রধান কারণ বৃক্ষ নিধন ও অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে স্থাপনা  নির্মাণ।

পৃথিবীতে যে হারে বন উজার হচ্ছে, সে হারে কিন্তু নতুনভাবে গাছ লাগানো হচ্ছেনা। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় কাটা হচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এবং  এর বিপরীতে লাগানো হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার গাছের চারা। এতেই বোঝা যায় আমরা  প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রের সাথে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছি।

বৃক্ষ আমাদের ফল দেয়, ফুল দেয়, জীবন রক্ষাকারী  ওষুধ দেয়, সুশীতল ছায়া দেয়, শিল্পের কাঁচমাল যোগায়, বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। বৃক্ষ যদি অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, বায়ুমন্ডলের কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ না করে, তবে পৃথিবীতে একটি প্রাণিও এক মুহুর্ত বেঁচে থাকতে পারবেনা। অর্থাৎ প্রাণিদের বাঁচা-মরা এই সবুজ বৃক্ষের ওপরই সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভরশীল।

বৃক্ষ রোপণকে ব্যাংকের স্থায়ী আমনতে সাথে তুলনা করলে ভুল হবেনা। কারণ আজ একটি সেগুন, মেহগনি, কাঁঠাল, কড়ই গাছ রোপণ করলে ২০ বছর পর এর কাঠের দাম হবে কম পক্ষে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। এভাবে একজন মানুষ পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ রোপণ করে অল্প সময়ে প্রচুর সম্পদের মালিক হতে পারেন।

ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, একটি গাছ তার ৫০ বছরের জীবনে পৃথিবীর প্রাণীকূলকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার  বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে। কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করে বায়ু দূষণ রোধ করে ১০ লাখ টাকার। বাতাসে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে বায়ুমন্ডলকে ঠান্ডা রাখে পাঁচ লাখ টাকার, বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে পাঁচ লাখ টাকার, মাটির ক্ষয় রোধ করে উর্বরতা বাড়ায় পাঁচ লাখ টাকার, পাখি-প্রাণির খাদ্য ও আশ্রয় দেয় পাঁচ লাখ টাকার এবং ফলও কাঠ দেয় পাঁচ লাখ টাকার। একটি ২৫০ মিটার চওড়া বন বাতাসে জমে থাকা সালফার ডাই অক্সাইডের প্রায় ৩৫ শতাংশ শুষে নিতে সক্ষম। একটি গাড়ি ২৫ হাজার কিলো মিটার পথ চলে যে বায়ু দূষণ সৃষ্টি করে তার পুরুটাই  অল্প সময়ে শুষে নিতে পারে একটি বড় গাছ। ক্যানসার নিরাময়ের যাদুকরী গুণ আছে পৃথিবীর প্রায় ১ হাজার ৪০০ বৃক্ষ প্রজাতির। বনের নির্মল বাতাসের সংস্পর্শে অনেক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে পৃথিবীতে  ৬২ বিলিয়ন ডলারের ভেষজ বৃক্ষের বাজার রয়েছে। এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারতও চীনের দখলে। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজ সামগ্রী আমদানি করে। অথচ এর প্রায় ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব।

ঝড়, জলোচ্ছাস, বৃষ্টি, বর্জ্রপাত থেকে বৃক্ষ মানুষের জীবন রক্ষাসহ যে কত উপকার করে তা বলে শেষ করা যাবেনা ২০১৬ সালে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মুত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাল গাছ রোপণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাতে ৬৯১ জন মৃত্যু বরণ করেন।  বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমানোর তাগিদে সরকার দেশব্যাপী ১০ লাখ তাল গাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং এটিকে সবচেয়ে  কার্যকর স্থানীয় প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আসাদুল হকের মতে, বজ্রপাত যেহেতু উঁচু জায়গায় আঘাত করে, সে হিসেবে তাল গাছে আগে বজ্রপাত পড়ে। ফলে লোকালয়ে মানুষের মুত্যু সংখ্যা হ্রাস পায়। এছাড়া তাল গাছ  অনেক দিন বেঁচে থাকে। অন্য ফসলের কোনো ক্ষতি করেনা। তাল গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, ঝড়-বাতাস থেকে বাড়িÑঘর রক্ষা করে। তাই গ্রামীণ রাস্তার দু’ধারে এবং বসতবাড়ির আশে-পাশে অন্যান্য ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের সাথে কিছু সংখ্যক তাল গাছের চারা রোপণ করা উচিত। তাল ঘর তৈরির উত্তম কাঠ। বন্যার সময় তালের নৌকা অনেক উপকারে লাগে। জ্বালানি হিসেবেও এর চাহিদা  আছে। স্ত্রী ও পুরুষ জাতীয় তাল গাছ থেকে ৯০ থেকে ১২০ দিন দৈনিক ১২ থেকে ১৫ কেজি রস প্রদান করে, যার প্রতি ৫ কেজি রস হতে এক কেজি উন্নতমানের গুড় তৈরি করা যায়। তাল গাছ লবণাক্ত জমিতে মারা যায় না, তাই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ও মাটি ক্ষয় রোধে ব্যাপক ভিত্তিতে  এটি লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

তাল, সুপারি, নারকেল ও খেজুর গাছ ছাড়াও  বাড়ির আশে-পাশে, বনে-জঙ্গলে  এবং রাস্তা-ঘাটের পাশে কত অযত অবহেলায়  মাথা তুলে  দাঁড়িয়ে আছে নানা গাছ-পালা। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে গাছ কেটে তৈরি করছে কাঠ। সেই কাঠ বিক্রি করে প্রচুর অর্থও উপার্জন করছে। কিন্তু  এই গাছ  শুধু মানুষের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নয়নেই নয়, জাতীয় অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করছে। চার লাগানো থেকে শুরু করে  পরিচর্যা, কাঠ কাটা ও আসবাব তৈরি- এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন হচ্ছে। শখ করে রোপণ করা এ গাছই বছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। জিডিপিতে গাছের অবদান সংক্রান্ত বিষয়ে সমীক্ষা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বোরোর জাতীয় হিসাব শাখা।  সেই সমীক্ষায় দেখা গেছে, পরিবার পর্যায়ে অর্থাৎ বাড়ির আশ-পাশে যে গাছপালা লাগানো হয়, তা থেকে অর্থনীতিতে গড়ে ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন  হয়।  বর্তমানে দেশের ২০ লাখ ৫৯ হাজার ৬০৮ টি পরিবার এভাবে গাছ লাগিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। প্রতিটি পরিবার কমপক্ষে ৫ শতক জায়গায় বিভিন্ন জাতের গাছ লাগান। মূলত গাছ থেকে কাঠ, লাকড়ি ও রাবার তৈরি হয়, পরে তা বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে এসব পরিবার। আর উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত যে মূল্য সংযোজন হয়, তাই জিডিপিতে অবদান রাখে।  পরিবার পর্যায়ে রোপণকৃত গাছপালার মধ্যে শুধু বসতবাড়ির আশ-পাশেই ৫৪ শতাংশ গাছ লাগানো হয়। বিবিএসের সমীক্ষায় আরো বলা হয়, বিভিন্ন জাতের গাছ থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট কাঠ উৎপাদন হয়। এ কাঠের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রতি বছর ১০ লাখ ৫৮ হাজার বিভিন্ন জাতের বাঁশ উৎপন্ন হয়।  এ বিপুল সংখ্যক বাঁশের আর্থিক মূল্য ২ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া বছরে লাকড়ি হয় ৫১ লাখ ১১ হাজার ৮৩৫ মেট্রিক টন, যার আনুমানিক মূল্য ৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। আর রাবার উৎপন্ন হয় ১ হাজার ৫৫২ মেট্রিক টন। এই রাবারের মূল্য সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। পরিবার পর্যায়ে গাছের অবদানের প্রকৃত চিত্র এতদিন গণনায় দেখানো হতো না। এই সমীক্ষাটি করার ফলে  এখন থেকে প্রতি বছর গাছের অবদান হিসাব করা সম্ভব হবে। এতে জিডিপির আকার কিছুটা হলেও বাড়বে, পারিবারিক পর্যায়ে গাছের অর্থনৈতিক অবদান  ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে এবং গাছের গুরুত্ব দেশবাসী ও  সংশ্লিষ্ট মহল ভিন্ন আঙ্গিকে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।

————————————–

লেখকঃ

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ, গোপালপুর,

নাটোর্র, মোবাইলঃ ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *