পার্সলি চাষাবাদের কৌশল ও গুণাগুণ

কৃষিবিদ মোঃ সিরাজুল ইসলাম

মসলা জাতীয় ফসল পার্সলি একটি দ্বিবর্ষজীবী বিরুৎ উদ্ভিদ। কখনো কখনো ৩-৪ বছর বাঁচে। মাটি সংলগ্ন কান্ড থেকে গোছা ধরে এর পাতা বের হয়ে ঝোপের সৃষ্টি করে। পার্সলি দেখতে মৌরি গাছের মতো দেখায়। পাতার কিনারা ধনে পাতার মতো খন্ডিত, ঘ্রাণযুক্ত, গাঢ় সবুজ। প্রতিটি পাতায় ২-৩টি পত্র ফলক থাকে। পার্সলির পাতা ধনিয়ার পাতা হতে বেশ বড়। প্রথম বছর গাছে শুধু পাতা হয়। পাতা ১০-১৫ সে. মি. লম্বা হয়। দ্বিতীয় বছর ফুল আসে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হলুদ ফুল হয়। ফুল থেকে ফল হয়। ফল ২-৩ সে. মি. লম্বা, ফলের গায়ে মৌরির মতো শিরা বা রেখা থাকে। বীজ ও ফুল দেয়ার পর গাছ মরে যায়। পাতা ও বীজ মসলা হিসেবে খাওয়া যায়। বাংলাদেশের খুলনা, নাটোর ও চাপাই নবাবগঞ্জে পার্সলি ফসল সফল ভাবে চাষ করা হয়। ফুল আসার আগ পর্যন্ত ৫-৬ বার পার্সলির পাতা তোলা যায়।

পার্সলির গুরুত্ব, ব্যবহার ও ভেষজ গুণঃ পার্সলি একটি বিদেশী মসলা ফসল কিন্তু সম্প্রতি আমাদের দেশে এটির চাষ শুরু হয়েছে। টবে ও কিচেন গার্ডেনে বর্তমানে এর চাষ সীমাবদ্ধ। এটি রবি বা শীত মৌসুমের মসলা ফসল। কাঁচা অবস্থায় এর পাতা খাওয়া হয় বলে এটিকে মসলার ‘কিউলিনারী হার্ব’ শ্রেণীভুক্ত করা হয়। খুলনা, নাটোর, চাপাইনবাবগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে শীতকালে পার্সলি চাষ করে কৃষকরা সাফল্য পেয়েছেন।

পার্সলি একটি সুগন্ধি গাছ। এর পাতা প্রধানত সালাদ হিসেবে ব্যবহার হয়। পার্সলি শুষ্ক আবহাওয়ার ফসল বলে উত্তরবঙ্গ ও পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে জন্মাতে পারে। ইউরোপে এর চাহিদা ব্যাপক। তবে, আমাদের দেশে এর পরিচিতি ও সরবরাহ বাড়াতে পারলে আমাদের দেশেও এর চাহিদা বেড়ে যাবে।

পার্সলির ব্যবহারঃ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রধানত এর সবুজ পাতা সালাদ হিসেবে ব্যবহার হয়। রান্নায় ও অন্যান্য সালাদ তৈরিতে বিশেষ সুগন্ধ আনার জন্য ধনে পাতার মতো পার্সলির পাতা ব্যবহার হয়। কাঁচা পাতা সালাদে বেশ পুষ্টিকর ও মুখবোচক। স্যূপ, স্ট্যু ও সস ইত্যাদি সুগন্ধময় করতে পার্সলি ব্যবহার হয়। পার্সলির মূলও সবজি হিসেবে ব্যবহার হয়। পার্সলির বীজও মসলা হিসেবে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। বীজে যে সুগন্ধি তেল থাকে তা পাতন প্রক্রিয়ায় আহরণ করে খাদ্য দ্রব্য সুগন্ধি করতে ব্যবহার হয়। তবে ডগা ও পুস্পমঞ্জরী থেকে প্রাপ্ত তেল সবচেয়ে ভাল।

পার্সলির ভেষজ গুণঃ পার্সলির জীবাণুনাশক ক্ষমতা আছে এবং মুত্রাশয়ের রোগ নিরাময় করে। পার্সলির বীজের নির্যাস রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। পার্সলি খুব অল্প খেলেও উপকার পাওয়া যায়। এর পাতার রস কীটনাশক হিসেবেও ব্যবহার হয়।

পার্সলির চারা তৈরি ও চারা রোপণ পদ্ধতিঃ বীজতলায় আগস্ট হতে অক্টোবর মাসের মধ্যে বীজ বুনতে হয়। বীজ তলায় সেচ ও পানি নিষ্কাশনের জন্য চতুর্দিকে নালা তৈরি করা উচিত। বীজতলা তৈরির পর বীজ হালকা গরম পানিতে ১ রাত ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে বীজ ভালভাবে এবং দ্রুত অংকুরোদগম হবে। তা না হলে বীজ গজাতে এক মাসও সময় লাগতে পারে। বীজ তলায় চারার যতœ নিতে হবে। চারার যখন ৪/৫টি পাতা গজাবে এবং প্রধান মূল তৈরি হবে তখন খুব দক্ষতার সাথে চারা উঠিয়ে মূল জমিতে পার্সলির চারা রোপণ করতে হবে।

পার্সলির সার প্রয়োগঃ জমির উর্বরতার উপর নির্ভর করে সারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয়। পার্সলি পাতা জাতীয় মসলা, তাই জৈব সার এর বৃদ্ধির জন্য বেশি প্রয়োজন। পার্সলির জন্য হেক্টর প্রতি নি¤œলিখিত হারে সার দেয়া প্রয়োজন।

পার্সলি ফসল সংগ্রহঃ পার্সলির সুঘ্রাণযুক্ত পাতাই সালাদ বা সুপে মসলা হিসেবে ব্যবহার হয়। এই পাতা ফুল আসার আগ পর্যন্ত ভাল উৎপাদন হয়। তাই ফুল আসার আগে ৫-৬ বার পার্সলির পাতা সংগ্রহ করা যায়।

————————————–

লেখকঃ কৃষিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ডাক্তার, রীতা হোমিও হল, পালপাড়া (জামে মসজিদের সামনে), বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। মোবাইল : ০১৭১২১৫৫০১৪,

০১৮৫০০৬৪১৩০।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *