পাহাড়ে পাহাড়ে আগুনঃ ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ

মোঃ বশিরুল ইসলাম

আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু ঢেউ তোলা সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে কালো পিচের সর্পিল রাস্তা দিয়ে পথ চললে যে কোন পর্যটকের মন কাড়বেই। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে পাহাড়, সেই পাহাড়ে ঘন সবুজ অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে বসত-বাড়ি, যার পরিবেশ সমতল ভূমি থেকে সম্পূর্ন আলাদা। পার্বত্য জেলা শহর থেকে গ্রামের দিকে গেলে জনশূন্যতা, নির্জনতা চোখে পড়ে। শহরের জনজট সেখানে নেই। পাহাড়িদের সাথে আমাদের যথেষ্ঠ অমিল থাকার কারণে সহজেই তারা সমতলভূমি মানুষদেরকে চিনে ফেলে। পাহাড়ে সমতলভূমি অবাধ চলাফেরা তারা সন্দেহের চোখে দেখে। জন্মের পর থেকে তারা একটা নিজস্ব ধারা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বড় হয়, যা তারা ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রাখে। কেউ তাদের সংস্কৃতি এবং ভিটেমাটিতে ভাগ বসাক, এটা তারা চায় না।

কিছুদিন আগে পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার সাজেক ভ্যালিতে গিয়েছিলাম ঘুরতে। চোখে পড়ল আদি পদ্ধতিতে জুম চাষের সবুজ শ্যামল পাহাড়গুলোর ঝাড়-জঙ্গল, গাছপালা কেটে নির্বিচারে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে জুম চাষের উপযোগী করা হচ্ছে। পাহাড়িদের লাগানো আগুনে ন্যাড়া হয়ে পড়ে আছে পাহাড়ের পর পাহাড়। কোথাও কোথাও আগুনে পোড়ানো পাহাড়গুলো পরিষ্কার করে জুম চাষের প্রস্তুত করতেও দেখা গেছে জুমিয়া পরিবারদের। জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে আগুন দিয়ে জুম চাষ করে সারা বছরের খাদ্য শস্য ঘরে তুলতে পারলেও জুম চাষ প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিপন্ন করার পাশাপাশি প্রাণীকূলের বসবাসের আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুমের আগুনে পুড়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার বনজসম্পদ, ঘটছে পরিবেশ বিপর্যয়, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ক্ষয়ে যাচ্ছে মৃত্তিকাশক্তি। ঘটছে পাহাড় ধসের মতো ঘটনা। উজাড় হচ্ছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী, কীট-পতঙ্গ। তবে, কিছু কিছু পাহাড়ে সরকারে নানা প্রজেক্টে মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষবাস হচ্ছে। যা দেশে জন্য খুবই ইতিবাচক।

জুম চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাহাড়ে জুম চাষ তাদের পূর্বপুরুষের আদি পেশা। তারাও জুম চাষের মাধ্যমে সংসার চালায় এবং বছরের খাদ্য সামগ্রী মজুদ করে। তারা মূলত বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে পাহাড়ে আগুন দেয়। আর মে-জুন মাসের দিকে পোড়ানো পাহাড়ে জুমচাষ শুরু করে। বৃষ্টির পর জুমের জমিতে ছোট ছোট গর্ত করে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, কলা, মরিচ, আনারস, তরমুজ, মিষ্টি কুমড়া, আদাসহ বিভিন্ন রকম ফসল ও শাকসবজির চাষ করা হয়। সার ও কীটনাশকবিহীন এসব খাদ্য পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। জুম চাষ নিয়ে পাহাড়ি লোকগাঁথা, গান ও ছড়া, প্রবাদ প্রবচনও খুব সমৃদ্ধ।

জুম চাষ কী আসলেই একটি অবৈজ্ঞানিক ও ক্ষতিকারক চাষাবাদ? যদি তাই-ই হয়, তাহলে কেন পাহাড়ি জুমিয়ারা এই অতি প্রাচীন চাষ পদ্ধতিটিকেই ধরে রেখেছে ? আর তা না হলে জুম নিয়ে জনমনে কেন এই বিভ্রান্তি ?  এ প্রশ্নগুলো উত্তর খোজা খুব সহজ। আমরা যদি লক্ষ্য করি, দেখব অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষে কারণে পাহাড়গুলো নাজুক হয়ে পড়ছে। যার ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের অতিমাত্রায় অবনয়নের ফলে বিশেষ করে পাহাড়ের টপ সয়েল বা পলি মাটি ক্ষয়জনিত কারণে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে হৃদ কিংবা জলধার। পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জলবায়ুর ওপর। তাছাড়া, জুম চাষের বিকল্প কোনো চাষের ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এটি চাষ করছেন। সরকারি সহযোগিতা আর বিকল্প চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হলে কৃষকেরা জুম চাষ থেকে ফিরে আসবে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। এছাড়া, জুমিয়া পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, বিকল্প চাষাবাদে উদ্ভুদ্ধ করণ এবং জঙ্গল না পুড়িয়ে শুধুমাত্র পরিষ্কার করে চাষাবাদ করার বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারলে জুম চাষ বন্ধ এবং এর ক্ষতি থেকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

পাহাড়িদের সাথে কথা বলে এটাও জানলাম যে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা নানা কারণে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। যার ফলে এখনো হয়নি ব্যাপক ও বড় ধরণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আড়াই দশকের অশান্ত পাহাড়ে কৃষির বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। তাই ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে জুম চাষ করছে। বলা ভালো, জুম চাষীরা হচ্ছেন সকলেই প্রান্তিক চাষী ও সাধারণতভাবে হত দরিদ্র। তাই জুম চাষ করা ছাড়া অন্য কোনোভাবেই তাদের টিকে থাকার উপায় নেই। অন্যদিকে বহুবছর ধরে পাহাড়ে কল-কারখানা গড়ে না ওঠায় সৃষ্টি হয়নি বিকল্প আয়ের পথ।

জুম চাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হচ্ছে জুমে কোন সার বা কীটনাশক ব্যবহৃত হয় না। পুড়ে যাওয়া ঝোপঝাড়ের ছাই কীটনাশক ও সারের কাজ করে, সার ব্যবহৃত হলেও তা জৈবিক সার। তাই জুমে উৎপাদিত সব ফসল অর্গানিক ক্রপ হিসেবে সবখানে সমাদৃত হতে পারে। এক সময় জুম চাষ পাহাড়ি আদিবাসীদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল। কিন্তু আধুনিক সময়ে যেখানে পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ে আগুন দিয়ে বনজঙ্গল সাফ করা কতটা পরিবেশবান্ধব সে প্রশ্ন তো আসবেই।

পাহাড় আমাদের অমূল্য সম্পদ। পাহাড়ি অঞ্চল বাংলার সৌন্দর্যকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। পরিবেশ ও প্রকৃতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ঢেউ খেলানো সবুজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে অবশ্যই পাহাড়ের আগুন দিয়ে জুম চাষ বন্ধ করতে হবে। পরিবেশসম্মতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কীভাবে জুম চাষ করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। আইনি কঠোরতা, সচেতনতা, দেশপ্রেমই পারে পাহাড়ের সৌন্দর্য অটুট রাখতে।

————————————–

লেখকঃ

জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

মোবাইল-০১৭১৬-৫৮১০৮৬।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare