পিঁয়াজের রোগ ও তার প্রতিকার

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান

পিঁয়াজ বাংলাদেশের একটি অর্থকরী মসলা ফসল ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্য। প্রতিদিনের রান্নায় ইহা আমরা ব্যবহার করে থাকি। এ ছাড়াও পিঁয়াজে অনেক ঔষধি গুণ রয়েছে। দেশের চাহিদার তুলনায় এ ফসলের উৎপাদন নিতান্তই কম। উৎপাদন কম হওয়ার জন্য রোগবালাই একটি প্রধান কারণ। পিঁয়াজে স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট, পার্পল ব্লচ, কান্ড পচা, স্মাট, গুদামজাত ইত্যাদি রোগ দেখা যায়। এই রোগসমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ফলন অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। তাই পিঁয়াজের কয়েকটি মারাত্মক রোগের লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

১। রোগের নাম: স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট (Stemphylium blight)

রোগের কারন: স্টেমফাইলিয়াম বট্রাওসাম (Stemphylium botryosum) ও স্টেমফাইলিয়াম ভেসিকারি (Stemphylium Vesicari) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার: আক্রান্ত বীজ, বায়ু ও গাছের পরিত্যক্ত অংশের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। অধিক তাপমাত্রা (২৮-৩০০ সেঃ), অতিরিক্ত শিশির, আর্দ্র আবহাওয়া (আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯০%) ও বৃষ্টিপাত হলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ছত্রাকের স্পোর বায়ুর মাধ্যমে এক গাছ হতে অন্য গাছে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ

  •             প্রথমে পাতা ও পাতার কিনারায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানি ভেজা হালকা বাদামী বা হলুদ রং এর দাগের সৃষ্টি হয়।
  •             দাগগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে বড় দাগে পরিনত হয় ও পাতাকে পুড়ে ফেলে।
  •             দাগের মধ্যবর্তী অংশ প্রথমে লালচে বাদামী ও পরবর্তীতে কালো বর্ণ ধারণ করে।
  •             আক্রান্ত পাতা উপরের দিক হতে ক্রমান্বয়ে কালো হয়ে মরে যেতে থাকে এবং পাতার উপরের অংশে ছত্রাকের কালো কালো ফ্রুটিং বডি দেখা যায়।
  •             পিঁয়াজের আম্বেলও এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়।
  •             এ রোগের আক্রমণের ফলে বীজ অপুষ্ট হয় এবং ফলন হ্রাস পায়।
  •             রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে সুস্থ বীজ উৎপাদন সম্ভবপর হয় না।

রোগের প্রতিকার

  •             সুস্থ, নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে।
  •             রোগ সহনশীল প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে।
  •             আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
  •             সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।
  •             বীজ পিঁয়াজের ক্ষেত্রে নভেম্বরের ১-১৫ তারিখের মধ্যে কন্দ রোপণ করতে হবে।
  •             কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
  •             জমিতে রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-রোভরাল ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা ডাইফেনোকোনাজল + এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। বীজ পিঁয়াজের ক্ষেত্রে একই ছত্রাকনাশক একই পরিমাণে ১০ দিন পর পর ৫-৬ বার স্প্রে করতে হবে।

২। রোগের নাম: পার্পল ব্লচ/বেগুণী দাগ (Purple Blotch)

রোগের কারন: অলটারনারিয়া পোরি (Aternaria porri ) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার: আক্রান্ত বীজ, বায়ু ও গাছের পরিত্যক্ত অংশের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। অধিক তাপমাত্রা (২৮-৩০০ সেঃ), অতিরিক্ত শিশির, আর্দ্র আবহাওয়া (আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৮০-৯০%) ও বৃষ্টিপাত হলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত শীতের শেষে বা শীত চলে গেলে এই রোগ দেখা যায়। ছত্রাকের স্পোর বায়ুর মাধ্যমে এক গাছ হতে অন্য গাছে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ

  •             প্রথমে পাতা ও বীজবাহী কান্ডে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানি ভেজা বাদামী বা হলুদ রং এর দাগের সৃষ্টি হয়।
  •             দাগগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে বড় দাগে পরিনত হয়।
  •             দাগের মধ্যবর্তী অংশ প্রথমে লালচে বাদামী ও পরবর্তীতে কালো বর্ণ ধারণ করে এবং দাগের কিনারা বেগুনী বর্ণ ধারণ করে।
  •             আক্রান্ত পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে ও শুকিয়ে যায়।
  •             বীজবাহী কান্ডের গোড়ায় আক্রান্ত স্থানের দাগ বৃদ্ধি পেয়ে হঠাৎ ভেংগে পড়ে।
  •             এ রোগের আক্রমণের ফলে বীজ অপুষ্ট হয় এবং ফলন হ্রাস পায়।
  •             রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে সুস্থ বীজ উৎপাদন সম্ভবপর হয় না।

রোগের প্রতিকার

  •             শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
  •             সুস্থ, নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে।
  •             রোগ সহনশীল প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে।
  •             আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
  •             অতিরিক্ত ঘন করে পিঁয়াজের চারা রোপণ করা যাবে না।
  •             মাঠ সুনিষ্কাশিত রাখতে হবে।
  •             বীজ পিঁয়াজের ক্ষেত্রে নভেম্বরের ১-১৫ তারিখের মধ্যে কন্দ রোপণ করতে হবে।
  •             কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
  •             জমিতে রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-রোভরাল ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা ডাইফেনোকোনাজল + এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। বীজ পিঁয়াজের ক্ষেত্রে একই ছত্রাকনাশক একই পরিমাণে ১০ দিন পর পর ৫-৬ বার স্প্রে করতে হবে।

৩. রোগের নাম: আইরিশ ইয়েলো স্পট  (Iris Yellow Spot)

রোগের কারন: আইরিশ ইয়েলো স্পট ভাইরাস (iris Yellow spot Virus) এর আক্রমণে এই রোগ হয়।

রোগের বিস্তার: থ্রিপস (Thrips) দ্বারা এই রোগ ছড়ায়।

রাগের লক্ষণ

  •             থ্রিপস-এর আক্রমণের কারণে পাতা সাদা ফ্যাকাশে হতে পারে ।
  •             আক্রান্ত পাতার বৃদ্ধি হ্রাস পায় ও আক্রান্ত স্থান হীরার মতো বা চোখের মতো দেখতে মনে হয়।
  •             আক্রান্ত স্থানের মাঝের অংশ সাদা ও চতুর্দিকে ক্লোরোটিক/হালকা সবুজ হতে পারে।
  •             অত্যধিক আক্রান্ত পাতা গুলো দেখতে ধুসর রং এর মতো লাগে ও অবশেষে পাতা উপর হতে নিচের দিকে মারা যায়।

রোগের প্রতিকার

  •             মাটিতে পরিমাণমত আদ্রতা রাখতে হবে।
  •             তাপমাত্রা বৃদ্ধির  সঙ্গে সঙ্গে থ্রিপস এর সংখ্যা বৃদ্ধির  পেতে থাকে ফলে রোগের আক্রমণ বেশি হয়। এজন্য থ্রিপ্স দমণ করার জন্য ইমিডক্লোরোপিড গ্রুপের কীটনাশক (যেমন-এডমায়ার, গেইন, ইমিটাফ, কনফিডর) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।

পিঁয়াজের পার্পল ব্লচ/বেগুণী দাগ রোগ (Purple Blotch) ও আইরিশ ইয়েলো স্পট (Iris Yellow Spot) রোগের মধ্যে পার্থক্য

অনেক সময় পিঁয়াজের পার্পল ব্ল-চ/বেগুণী দাগ রোগ (Purple Blotch) ও আইরিশ ইয়েলো স্পট (Iris Yellow Spot) রোগ সনাক্তকরণে সমস্যা হয়। দুটি রোগের সনাক্তকরণ লক্ষণ প্রায় কাছাকাছি। রোগ দুটির সনাক্তকরণের পার্থক্য নিম্নরূপ

৪। রোগের নাম: বট্রাইটিস লিফ ব্লাইট (Botrytis leaf blight)

রোগের কারণ: বট্রাইটিস স্কুয়ামোছা (Botrytis Squamosa) এবং বট্রাইটিস সিনেরিয়া (Botrytis cinerea) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার: গাছ খুব ঘন হলে। মেঘলা আকাশ, ঘন কুয়াশা ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে। আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯৫% বা বেশী হলে। তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেঃ হলে।

রোগের লক্ষণ

  •             ছত্রাক প্রাথমিকভাবে পাতায় আক্রমণ করে ।
  •             পাতায় প্রথমে ছোট ছোট সাদা ডিম্বাকৃতি দাগ দেখা যায়, যেগুলোর চারদিক সবুজ রং দ্বারা ঘেরা থাকে।
  •             পরে অনেকগুলো দাগ একত্রিত হয়ে বড় আকার ধারণ করে, যার ফলে পাতায় ডাই ব্যাক এর লক্ষণ দেখা যায়।
  •             শেষ পর্যায়ে পাতা মারা যায় ও চূড়ান্তভাবে আক্রান্ত পিঁয়াজের মাঠ পুড়ে যাওয়ার মত মনে হয়।

রোগের প্রতিকার

  •             রোগাক্রান্ত পিঁয়াজের গাছ ধ্বংস করতে হবে।
  •             গভীর চাষ দিয়ে মাটি উলট-পালট করতে হবে।
  •             শস্য পর্যায় অনুসরণ করতে হবে।
  •             সুস্থ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
  •             কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
  •             রোগের লক্ষণ দেখার সাথে সাথে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।

৪। রোগের নাম: কান্ড/কন্দ পঁচা (Stem/Basal/Bulb rot)

রোগের কারণ: স্কে¬রোসিয়াম রফসি (Sclerotium rolfsii) ও ফিউজারিয়াম (Fusarium sp) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার: এ রোগের জীবাণু মাটিতে বসবাস করে। অধিক তাপ ও আর্দ্রতাপূর্ণ মাটিতে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আক্রান্ত ফসলে সেচের পানি দিলেও এ রোগ বৃদ্ধি পায়।

রোগের লক্ষণ

  •             এ রোগের কারণে চারা বাঁকা হয়ে যায়, ঢলে পড়ে এবং হলুদ হয়ে যায়।
  •             কন্দের আক্রান্ত অংশ কাটলে পানি ভেজা বাদামী রঙের দাগ দেখা যায়।
  •             স্কে¬রোসিয়াম রফসি দ্বারা আক্রান্ত গাছ হাত দিয়ে টান দিলে খুব সহজেই মাটি থেকে পিঁয়াজসহ উঠে আসে।
  •             আক্রান্ত স্থানে পচন ধরে ও সরিষার দানার মত বাদামী বর্ণের গোলাকার স্কে¬রোসিয়া দেখা যায়।
  •             ফিউজারিয়াম দ্বারা আক্রান্ত গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় ও ঢলে পড়ে। হাত দিয়ে টান দিলে সহজেই মাটি থেকে উঠে আসে না।
  •             উভয় জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত কান্ডে পচন ধরে এবং আক্রান্ত পিয়াজ গুদামজাত করা হলে সংরক্ষিত পিঁয়াজের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে থাকে।

রোগের প্রতিকার

  •             সুস্থ, নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে।
  •             বীজ উপকারী ছত্রাক যেমন-ট্রাইকোডারমা দ্বারা শোধন করে বপন করতে হবে।
  •             কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
  •             মাটির উপর্যুক্ত আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে ও পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  •             আক্রান্ত পিঁয়াজ গাছ তুলে ধবংস করে ফেলতে হবে।
  •             আক্রান্ত জমিতে শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
  •             জমিতে রোগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩-৪ বার গাছের গোড়ায় মাটিতে স্প্রে করতে হবে।

৫। রোগের নাম: স্মাট (Smut)

রোগের কারণ: ইউরোসিসটিস সেপুলি (Urocystis cepulae) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার: রোগটি বীজ বাহিত নয়, মাটি বাহিত। তাপমাত্রা ৩০০ সেঃ-এর নীচে ছত্রাকটি মাটিতে বাঁচতে পারে। তাপমাত্রা ২৬.৭০ সেঃ বা তার উপরে হলে ছত্রাকটি রোগ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মাটি, পানি, বায়ু ও কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ

  •             সরাসরি বপনকৃত বীজের ক্ষেত্রে এ রোগ মারাত্মক সমস্যা।
  •             চারা মাটি থেকে গজানোর সময় কচি চারার কটিলিডনের উপর প্রথমে দাগ পড়ে।
  •             দাগ লম্বা ও হালকা কালো রং এর হয় এবং দাগযুক্ত কটিলিডন বা পাতার অংশ পুুরু হয়।
  •             অনেক সময় পাতার একটা বড় অংশ একটা লম্বা দাগে পরিণত হয়।
  •             আক্রান্ত পাতা নীচের দিকে অস্বাভাবিকভাবে বাকা হয়ে যায়।
  •             সকল অবস্থাতেই গাছের উপর ছত্রাকের কালো স্পোর দেখা যায়।
  •             ব্যাপকভাবে আক্রান্ত গাছ আকারে ছোট হয় ও ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে মরে যেতে পারে।

রোগের প্রতিকার

  •             মাটি পরিস্কার পরিছন্ন রাখতে হবে।
  •             কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
  •             ফরমালডিহাইড দ্রবন প্রতি লিটার পানিতে ৮ মিলি হারে মিশিয়ে ১০ বর্গমিটার বীজতলার মাটি শোধন করতে হবে।

৬। রোগের নাম: কান্ড ও কন্দ কৃমি (Stem and bulb Nematode)

রোগের কারন: ডিটাইলেনকাস ডিপসেছি (Ditylenchus dipsaci) নামক নেমাটোডের (মাটি বাহিত) আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ মাটি, পানি ও কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ

  •             কচি চারার বৃদ্ধি ব্যহত হয়, রং ফ্যাকাশে হয় এবং বীজপত্র ফুলে উঠে ।
  •             পাতায় হালকা হলুদ-বাদামী বর্ণের স্পট দেখতে পাওয়া যায়, পাতা খাটো ও বাকা হয়ে যায়।
  •             পাতার পুরত্ব বেশী হয় এবং পাতার মাঝে মাঝে বসে যায় যা অনেকটা মই-এর মত মনে হয়।
  •             কান্ড মোটা হয় ।
  •             আক্রান্ত পেঁয়াজের চামড়া নরম, হালকা ধূসর রং-এর হয় ও পিঁয়াজের বাল্বের ওজন কম হয়।
  •             ফলে দ্বিতীয় পর্যায়ে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হয় ফলে নোংড়া ও পঁচা গন্ধ পাওয়া যায়।

রোগের প্রতিকারঃ

  •            জমিতে সরিষা, বাদাম, গম, ভূট্টা প্রভৃতি দ্বারা শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
  •             জমি প্লাবিত করে রাখলে এ রোগের কৃমি মারা যায়, তাই সুযোগ থাকলে বছরে একবার প্লাবিত করে রাখতে হবে।
  •             শুষ্ক মৌসুমে জমি পতিত রেখে ২/৩ বার চাষ দিয়ে মাটি ভালভাবে শুকাতে হবে।
  •             পিঁয়াজ রোপণ/বপনের কমপক্ষে ২০-২৫ দিন পূর্বে হেক্টর প্রতি ৫ টন অর্ধপঁচা মুরগীর বিষ্টা প্রয়োগ করতে হবে।
  •             পিয়াজ রোপণ/বপনের পূর্বে শেষ চাষের সময় বিঘা প্রতি ৪-৪.৫ কেজি ফুরাডান ৫ জি  মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

৭। রোগের নামঃ এস্টার ইয়েলো (Aster Yellows)

রোগের কারন: এস্টার ইয়েলো ফাইটোপ্লাজমা (Aster Yellows Phytoplasma – Similar to a bacterium ) এস্টার ইয়েলো রোগের প্রধান কারণ। এস্টার ইয়েলো লিফ হপার (Macrosteles Quadrilineatus) এই জীবাণু বহন করে।

রোগের বিস্তার: লিফ হপার দ্বারা এই রোগ ছড়ায়। জমিতে অত্যাধিক পরিমাণে আগাছা থাকা ও সাথী বা আন্ত: ফসল হিসেবে লিফ হপার আকর্ষণীয় (Leaf Hopper attractive crops) ফসল চাষ করা।

রোগের লক্ষণ

  •             কন্দ ফসলে নতুন পাতার গোড়ায় হলুদ ও সবুজ স্ট্রিক দেখতে পাওয়া যাবে।
  •             আক্রান্ত পাতা ফ্লাট হয় এবং মাঝে মাঝে পাতা বাকা হয়, এ সময় ভিতরের পাতা  হলুদ বর্ণের হয়।
  •             পাতাগুলো সমান্তরাল হয়ে পেঁচিয়ে থাকে।
  •             বীজ উৎপাদনের জন্য পিয়াজের আম্বেলগুলো তারার মত হয়ে ফেটে যায় এবং ফুলগুলো নষ্ট হয়।
  •             আম্বেলের ভিতরের দন্ডগুলি অনেক লম্বা হয়ে যায়।
  •             এ রোগের ফলে বীজ উৎপাদনের পরিবর্তে ছোট ছোট পিয়াজ হয।

প্রতিকার

  •             জীবাণু মুক্ত পেঁয়াজের বাল্ব ও চারা বপণ করতে হবে।
  •             ফসলকে আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
  •             সাথী বা আন্ত: ফসল হিসেবে কোন লিফ হপার আকর্ষণীয় (Leaf Hopper attractive crop) ফসল চাষ করা যাবে না।
  •             তাপমাত্রা বৃদ্ধির  সঙ্গে সঙ্গে লিফ হপার এর সংখ্যা বৃদ্ধির পেতে থাকে ফলে রোগের আক্রমণ বেশি হয়। এজন্য হপার দমণ করার জন্য ইমিডক্লোরোপিড গ্রুপের কীটনাশক (যেমন-এডমায়ার, গেইন, ইমিটাফ, কনফিডর) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।

৮। রোগের নাম: গুদামজাত রোগ (Storage diseases)

রোগের কারনঃ অ্যাসপারজিলাস (Aspergillus Sp.), আরউইনিয়া (Erwinia Sp.) ও ফিউজারিয়াম (Fusarium Sp.) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের লক্ষণ

  •             গুদামজাত অবস্থায় পিঁয়াজে পঁচন দেখা যায়।
  •             নরম পচা রোগ হলে পিঁয়াজ পঁচে খুব নরম হয় এবং পিঁয়াজ হতে দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।
  •             কালো পঁচা রোগ হলে পিঁয়াজের খোসা বা চামড়ার উপরে কালো পাউডারের মতো স্পোর দেখতে পাওয়া যাবে।
  •             কালো রং এর স্পোর গুলো মাঝে মাঝে ভিতরেও দেখতে পাওয়া যায়।
  •             অ্যাসপারজিলাস-এর আক্রমণে কালো পচা, আরউইনিয়া-এর আক্রমণে নরম পচা এবং ফিউজারিয়াম-এর আক্রমণে শুকনা পচা রোগ হয়ে থাকে।

রোগের প্রতিকারঃ

  •             সুস্থ পিঁয়াজ গুদামজাত করতে হবে।
  •             সংরক্ষনাগারে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
  •             মাঝে মাঝে রোগাক্রান্ত পিঁয়াজ বেছে ফেলে দিতে হবে।
  •             কিছু দিন পর পর পিঁয়াজ উলট-পালট করে দিতে হবে।

—————————————–

লেখকঃ উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব) মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, শিবগঞ্জ, বগুড়া।

ইমেইলঃzaman.path@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare