ফুলের যত রূপ

ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

এনেছি বসন্তের অঞ্জলি গন্ধের,

পলাশের কুঙ্কুম চাঁদিনির চন্দনÑ

পারুলের হিল্লোল, শিরীষের হিন্দোল,

মঞ্জুল বল্লীর বঙ্কিম কঙ্কণÑ

উল্লাস-উতরোল বেণুবনকল্লোল,

কম্পিত কিশলয়ে মলয়ের চুম্বন।

-রবীন্দ্রনাথ

যত রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ সেসবই গাছের বংশ বিস্তারের প্রবল আকা*ক্ষারই ফল। নানা কায়দায় প্রায় অদৃশ্যমান অতি ক্ষুদ্র পরাগরেণু এক ফুল থেকে অন্য ফুলে নিয়ে যাবার জন্যই যতসব আয়োজন। আর এ কারণে কীট পতঙ্গ, পাখ-পাখালি বা অন্য কোন প্রাণিদের আকর্ষণ করার জন্য ফুলের অন্যতম অস্ত্র হলো এর রূপের বাহার। মূলত ফুলের পাপড়ির আকার আকৃতি আর এদের ফুলের মধ্যে বিন্যস্ত থাকবার কৌশলের মধ্য দিয়ে এ রূপের প্রকাশ ঘটায় ফুল। কখনও পাপড়ির সাথে বৃতিও যুক্ত হয় রূপ বর্ধনে। পাপড়ির নানা রঙ এর উপর আরোপ করে অন্য এক মাত্রা।

ফুলের পাপড়ির সৌন্দর্য আর এর ব্যতিক্রমী বিন্যাস ফুলের রূপের প্রধান কারণ। কখনও ফুলের পাপড়ি প্রতিটি অন্যটি থেকে একেবারে মুক্ত থাকে। কোন কোন ফুলে আবার পাপড়ি থাকে পরষ্পর যুক্ত। কখনো আবার যুক্ত পাপড়ির সরু নীচের অংশ মিলে তৈরি করে নলাকার ফুল। কখনো সবগুলো পাপড়ির আকার আকৃতি এক রকমের কখনো আবার একই ফুলের পাপড়ির আকার আকৃতি ভিন্ন রকম। কখনো পাপড়ির মতই উজ্জ্বল ফুলের বৃতি, কখনো আবার পাপড়ি আর বৃতি আকার আকৃতিতে একরকম কেবল নয় দেখতেও হুবহু প্রায় একই রকম।

সরিষার মুক্ত সমাঙ্গ পাপড়িগুলো ক্রুশের ন্যায় আড়াআড়ি সজ্জিত। গোলাপের পাপড়িও কিন্তু পরষ্পর থেকে মুক্ত ও সমাঙ্গ। পাপড়ির জমিন অনেকটাই বাইরে প্রসারিত। অপরাজিতার ফুলগুলো আবার মুক্ত বটে তবে এদের পাপড়ির আকার আকৃতি ভিন্ন রকম। এদের পাঁচটি পাপড়ির একটি বেশ বড়। এটি ধরে রাখে বাকী চারটি পাপড়িকে আশ্চর্য কৌশলে। কুমড়ার হলুদ নলাকার চমৎকার এক একটি ফুলের পাপড়ি অন্যটির সাথে যুক্ত। পাপড়ির উপরাংশ বাইরের দিকে প্রসারিত হয়ে দেখতে অনেকটা ঘন্টার মত আকৃতি ধারণ করেছে। নয়নতারা আর রঙ্গনে আবার পাপড়ির নলটি বেশ সরু আর লম্বা। শিউলিতে পাপড়ির বিন্যাস এমন যে পরষ্পর যুক্ত হয়ে এরা দেখতে হয় অনেকটা বক্সের মত হয়। ফুলের পাপড়ির বিন্যাস তৈরি করতে পারে বহু রকম আকৃতি। কোন ফুলের আকৃতি হতে পারে একেবারে তারার মতো আবার কোনটা হতে পারে চায়ের কাপ বা পিরিচের আকৃতি। আবার কোন কোন ফুল হতে পারে ফানেলাকৃতি, তূর্যাকৃতি কিংবা ট্রে আকৃতির মতো। কিছু ফুল দুই ওষ্ঠাকৃতি কিছু আবার কলসের আকৃতি বিশিষ্ট ফুলও কিন্তু রয়েছে।

নাগলিঙ্গম

ফুলের একটি পাপড়ি অন্য পাপড়ির সাথে কিভাবে বিন্যস্ত থাকে সেটিও এর সৌন্দর্যেরই একটি অংশ। জবা কিংবা আকন্দ ফুলে পাপড়ির প্রান্তগুলো পরষ্পরকে সুন্দর করে স্পর্শ করে থাকে। করবী ফুলে পাপড়ি একটি আর একটি সাথে পরষ্পর পাকিয়ে থাকে। আষাঢ়ে লতার ফুলের একটি পাপড়ির দু’টি প্রান্তই বাইরে থাকে তো অন্য পাপড়ির আবার দুইটি প্রান্তই ভেতরে থাকে। অপরাজিতায় বড় পাপড়িটি থাকে বাইরের দিকে। এরপর ক্রমান্বয়ে সজ্জিত থাকে মাঝারি আর ক্ষুদ্র আকারের দুই জোড়া করে পাপড়ি।

কখনো কখনো এমন হয় যে ফুলের বৃতি আর পাপড়ি দেখতে এক রকমেরই হয়। টিউলিপের বৃতি আর পাপড়ির বর্ণতো প্রায় একই রকম। সুখদর্শন আর রজনীগন্ধার বৃতি আর পাপড়িকেও পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় না বলে এদের তখন পুষ্পপুট বলা হয়। কখনো আবার পাপড়িগুলো এত ছোট যে পুংদন্ডগুলোই বেশ বড়সড় আর উজ্জ্বল বর্ণিল। প্যাশন ফুলের পুংন্ড কি চমৎকার ভাবে সজ্জিত থাকে খ্রীষ্টের ক্রুশের মত। বাগান বিলাসের মত কোন কোন গাছের মঞ্জরীপত্র এতটাই উজ্জ্বল যে দেখলে মনে হয় যেন এরাই পাপড়ি।

কেবল পাপড়ির নানা বিন্যাসই যে ফুলে ফুলে সাজিয়ে তোলে রূপের পসরা তা কিন্তু নয়। পুষ্পমঞ্জুরীতে ফুলের যে বহুমাত্রিক অপরূপ বিন্যাস সে যেন গাছে জাগিয়ে তোলে প্রাণ। কখনো বৃন্তহীন ফুল মঞ্জুরীতে সংলগ্ন তো কখনো আবার প্রতিটি ফুলের থাকে আলাদা পুষ্প বৃন্ত। কোন কোন প্রজাতির ফুলের বৃন্ত আবার নানা দৈঘ্যের তো কোন কোনটার সব ফুলের বৃন্ত আবার সমদৈর্ঘ্যরে। কোন কোন মঞ্জুরীতে ফুলের বৃন্ত এমন ভাবে প্রলম্বিত যেন সব ফুলেরাই চলে আসে একই সমতলে। অন্য কোন কোন মঞ্জুরীতে বৃন্তের প্রলম্বন সাজিয়ে তোলে চমৎকার ছাতার মত বিন্যাস। কখনোবা রয়েছে আবার এদের শাখা এবং প্রশাখাও। পুষ্পমঞ্জুরীতে বিন্যাসের অভিনবত্ব আনতে বুঝি ফুলের এ আয়োজন।

আকর্ষণের কি অভিনব সজ্জা মঞ্জুরীতে মঞ্জুরীতে। কখনো কোন কোন ফুল গাছে মঞ্জুরীটি অশাখন্বিত তো কখনো আবার অন্য ফুলের গাছে তা বেশ শাখান্বিত। কোন কোন প্রজাতিতে মঞ্জুরীতে ঠাসা থাকে অনেকগুলো ফুলতো অন্য প্রজাতিতে আবার মঞ্জুরীর মাথায় থাকে অল্প ক’টি ফুল। কখনো ফুলের বড় বড় থোকায় থাকে ছোট ছোট ফুল তো কখনো আবার ছোট থোকায় থাকে বড় বড় ফুল। কখনো কখনো মঞ্জুরী ন্ডটি বড় শক্ত থাকে বলে দাঁড়িয়ে থাকে আকাশ পানে। অন্য কোন প্রজাতিতে আবার মালার মত ঝুলন্ত ডাঁটায় ঝোলে থাকে ফুল।

শাখায়িত মঞ্জুরীতে বেশ ঘনভাবে সন্নিবেশিত অর্জুনের ফুল। শাখায়িত মঞ্জুরীতে আবার হালকা ভাবে সজ্জিত থাকে আকাশনিম, কনকচূড়া আর শাল বৃক্ষের ফুল। পারুলের ফুল সংযুক্ত থাকে ত্রিধা বিভক্ত ঝুলন্ত মঞ্জুরীতে। হিজল, নীল বনলতার ছোট ছোট ফুল দোলতে থাকে মালার মত ঝুলন্ত মঞ্জুরী দ-ে। লম্বা ঝুলন্ত মঞ্জুরীতে ঠাসা থাকে কুমারিয়া লতা আর সোনাঝুরি লতার ফুল। অজ¯্র ফুলের মেলা বসে মণিমালা আর মাধবীলতার ঝুলন্ত ছড়ায়। গাছ জুড়ে থোকায় থোকায় ছোট ছোট ফুল ফোটে নাগকেশ, পলক জুঁই, সেগুন, কুন্দ, ছাতিম আর পাদাউক গাছে। কাঞ্চন, স্বর্ণ শিমুল, ঘন্টা ফুল, বেলী, শ্বেত কাঞ্চন, স্বর্ণ চামেলী, চামেলী, জুঁই, মাধবীলতা আর রেললতার ফুলগুলোর বিন্যাস আসলে এ রকমেরই।

মঞ্জুরীতে আবদ্ধ নয় তেমন ফুল প্রজাতিও রয়েছে বেশ কিছু। গাছের শাখা প্রশাখার দেহ ছুঁয়ে ছোট বড় এসব ফুল বিন্যস্ত থাকে একক ভাবেই। কখনো ফুলের আকার আকৃতি কখনো আবার ফুলের সুবাস আকৃষ্ট করে নেয় কীটপতঙ্গ আর পাখ-পাখালিকে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফোটে থাকে গাছ জুড়ে এদের একেকটি ফুল। আমাদের বহু প্রিয় ফুল আসলে এ দলেই পড়ে। কামিনী, বকুল, শেফালী, চাঁপা, হিমচাঁপা, গন্ধরাজ তেমনি সব একক ফুলের উদাহরণ। জবা, নয়নতারা, অপরাজিতা কিংবা শিমুলেরও একই দশা। চৈত্র্যের দাবদাহে পত্রহীন শিমুলের সারা দেহ জুড়ে ফোটে থাকা এক একটি বড় বড় লাল শিমুলের ফুল যেন আকাশ জুড়ে নিয়ে আসে আগুনের ঢল।

রেললতা

আমাদের কাটা ফুলের অন্যতম আকর্ষণ হলো কন্দজ তিন রকম ফুল- গ্লাডিওল্যাস, দোলনচাঁপা আর রজনীগন্ধা। রজনীগন্ধাতো এর শুভ্র সৌরভময় নলাকার, বাঁকা অথচ অতি ঘনবদ্ধ প্রচুর সংখ্যক ফুলের এক অপরূপ কারুকার্য। কিংবা লম্বা ডাঁটার শীর্ষদেশে ফুটে থাকা বড় বড় গ্লাডিওল্যাস ফুলের বিন্যাসও সহজেই মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। দোলনচাঁপা সন্ধার ফোটা পুষ্প দ-ের মাথায় ফুলের থোকা এর শুভ্রতা আর গন্ধে মোহিত করে তুলে সকলকে।

সূর্যমুখীর গোলাকার চাকতির উপর বিন্যস্ত নানা রকম ফুলের অপূর্ব বিন্যস্ত মনোহরা ফুলের কথা ভাবুন। বাইরে থেকে দেখলেতো একে একটি ফুলই মনে হয়। গোলাকার চাকতিটি আসলে এর মঞ্জরীপত্র। এরই মধ্যে ধারণ করা থাকে হাজার বিজারে বৃন্তহীন ক্ষুদে পুষ্প, এ কারণেই এদের বলা হয় পুষ্পিকা। এই পুষ্পিকাগুলো প্রান্ত হতে ক্রমান্বয়ে প্রস্ফুটিত হয় কেন্দ্রের দিকে। বাইরের পুষ্পিকাগুলো বড়, এদের বলা হয় প্রান্ত পুষ্পিকা। এক পাপড়ির বিশিষ্ট ক্ষুদে ক্ষুদে কেন্দ্রের দিকে ধাবীত পুষ্পিকাগুলো বলা হয় মধ্য পুষ্পিকা। হাজারো ফুল বিন্যস্ত হয়ে তৈরি করে সূর্যমুখীর অনিন্দ্য রূপ।

ডালিয়াও রূপ লাবেণ্যে কম যায় কিসে। শীতকালের তো বাগানের এক বড় আকর্ষণই এই ফুল।

ফুলের মঞ্জরীর আকার আকৃতির বিবেচনায় এদের শ্রেণী ১০টির কম নয়। মঞ্জরীতে এক সারি পার্শ্বীয় পুষ্পিকা থাকে একক ফুলবিশিষ্ট ডালিয়াতে। একক ফুল বিশিষ্ট আর এক শ্রেণীর ডালিয়ার মঞ্জরীর কেন্দ্র কুশনের মত উথিত। পিওনী প্রকৃতির ডালিয়াতে আবার মঞ্জরীর মাঝামাঝি খোলা। এদের কিনারায় থাকে পার্শ্বীয় পুষ্পিকা। থাকে চারদিকে পাপড়িধারী কিছু অতিরিক্ত পুষ্পিকাও, কলারেট জাতীয় ডালিয়াতে আবার কেন্দ্রীয় ও পার্শ্বীয় পুষ্পিকার মাঝখানে ভিন্ন রকমের অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকার পাপড়িধারী পার্শ্বীয় পুষ্পিকা থাকে। ডেকোরেটিভ ডালিয়াতে চ্যাপ্টা পাপড়ি ঢেকে দেয় মাঝখানের চাকতিটিই। ক্যাকটাস ডালিয়ার পুষ্পধারটি ঢাকা থাকে পার্শ্ব পুষ্পিকা দিয়ে। এদের পাপড়িগুলো সূচালো ও খানিকটা মোড়ানো প্রকৃতির। পম্পন ডালিয়াতে আবার পুষ্পধারের সবটাই পার্শ্বীয় পুষ্পিকা দিয়ে আবৃত। পাপড়ি নলাকৃতির আর বাঁকানো। এমনি সব বিচিত্র সজ্জারীতি রয়েছে ফুলে পুষ্পিকার।

কিংবা বর্ষার কদমতো তার অনন্য বিন্যস্ত ফুল দলের এক মোহনীয় রূপ। লনটেনিসের বলের আকৃতি বিশিষ্ট মঞ্জরীতে ক্ষুদ্রাকার লম্বাটে সবুজাভ হলুদ এক একটি ফুল তৈরি করেছে এর দৃষ্টি নন্দন অবয়ব। ফুলের এরকম বিন্যাস বড় বেশি চোখে পড়ে না অন্য গাছের ফুলে।

শাপলার রূপ সৌন্দর্য্যরে কথা ভাবুন। পানির উপরে ভাসমান ফুলের পাপড়িগুলো কি আশ্চর্য বিন্যাস ছড়িয়ে আছে চারদিকে। তারি মাঝখানে চমৎকার দন্ডায়মান হলুদ পরাগ স্তবক। এর সহজলভ্যতা আর এর অপরূপইতো একে আমাদের জাতীয় ফুলের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। শাপলার গড়নে লাল লাল পাপড়ির বিন্যাসে জলে ভেসে থাকা রক্তকমলও কম যায় না। অথবা মনে করা যাক ভারতের জাতীয় ফুল পদ্মফুলের কথা। লম্বা বোটায় সজ্জিত গোলাপী লাল বা সাদা পাপড়ির বিন্যাসে তৈরি স্বর্ণকমল বা শ্বেতপদ্মতো বেশ দৃষ্টি নন্দন।

ফুলের গঠন আর বর্ণ মিলে অর্কিড মানুষের মনকে জয় করে নেয়। তার উপর রয়েছে ফুলের প্রাকৃতিক চমৎকার সজ্জারীতি। ডেনড্রোব্রিয়ামের ঝুলন্ত মঞ্জরীতে অনেকগুলো মালার মত শীচের দিকে কি সুন্দর ঝুলে থাকে। কিংবা রিঙ্কোস্টাইলিসের লম্বা ঝুলন্ত মঞ্জরীতে ঘনবদ্ধ হয়ে থাকা ফুলমালার রূপই আলাদা। লম্বা মঞ্জরীতে বিন্যস্ত ঝুলন্ত হলুদ ফুলের সিম্ব্রিডিয়ানও এর চমৎকার বিন্যাসের জন্য মানুষের মনযোগ আকর্ষণ করে।

 

লেখক  :

প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *