বরিশাল অঞ্চলে সূর্যমুখীর চাষঃ এক নতুন সম্ভাবনা

 

ড. মোঃ শহীদুল ইসলাম

 

সূর্যমুখী একটি তৈল জাতীয় ফসল। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে এটি আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে। সূর্যমুখী বীজ থেকে যে তৈল হয় তা বেশ পুষ্টিকর, কোলেষ্টরল কম থাকায় তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। সরিষার মত এতে কোন ক্ষতিকর এমাইনো এসিড নেই। এজন্য সূর্যমুখীর তৈল এর বাজার মূল্য সয়াবিন ও সরিষার চেয়ে বেশী। এর খৈল পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সূর্যমুখীর পরিপক্ক মাথা হার্ভেষ্ট করার পর এর গাছগুলো জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সূর্যমুখী লবনাক্ত জমিতেও ভাল হয় বলে উপকূলীয় অঞ্চলে এর চাষ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিসা প্রকল্পের মাধ্যমে গত রবি মৌসুমে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে বেশ কিছু সুবিধাভোগী কৃষকের মাঠে সূর্যমুখীর প্রদর্শনী করা হয়। প্রকল্পের পক্ষ থেকে আগ্রহী কৃষকদের বীজ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। অধিকাংশ কৃষক বারি সূর্যমূখী-২ এবং হাইসান (হাইব্রিড) জাতের সূর্যমুখী করে হেক্টরে ২-২.৫ টন ফলন পান এবং বেশ লাভবান হন।
বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা গ্রামের উৎসাহী কৃষক আবু সাঈদ। আমন ধানের পর টমেটো চাষ করতেন, কিন্তু টমেটোর ন্যায্য দাম পেতেন না। গত রবি মৌসুমে তিনি ও তার ভাই মিলে ১ একর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করেন। তিনি ইরির সিসা প্রকল্প থেকে বীজ ও কারিগরি সহায়তা পান। আমন মৌসুমে ব্রি ধান ৪৯ জাতের ধান চাষ করার কারনে তিনি সময় মত সূর্যমুখীর বীজ বপন করতে পারেন (ডিসে¤¦রের ১ম সপ্তাহ)। এতে তিনি ফলন ভাল পান (বারি সূর্যমুখী-২ থেকে ২.০ টন/হেঃ এবং হাইসান থেকে ২.৫ টন/হেঃ)। তার এ সাফল্য তুলে ধরার জন্য সিসা-ইরি’র উদ্যোগে মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ৫০ জন আগ্রহী কৃষক-কৃষাণী অংশ গ্রহণ করেন এবং পরের বছর সূর্যমুখী আবাদ করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তিনি আর বাজার থেকে সয়াবিন বা সরিষার তৈল কেনেন না, এমনকি প্রতি লিটার ২০০ টাকা দরে আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন।ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার বারোহার গ্রামের উৎসাহী কৃষক স¦তীশ চৌকিদার। তিনিও ব্রি ধান৪৯ কাটার পর ডিসেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহে বারি সূর্যমুখী-২ এবং হাইমান জাতের সূর্যমুখীর আবাদ করেন। তিনিও বেশ ভাল ফলন অর্থাঃ হেক্টরে ২-২.৫ টন ফলন পান। তিনি এখন নিজে সূর্যমুখীর তৈল খান এবং ২০০/- টাকা লিটার দরে আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করেন। এভাবে বাবুগঞ্জের পাংশা গ্রামের আলতাফ এবং আনোয়ার, পটুয়াখালী সদরের শিয়ালী গ্রামের সাইফুল, আমতলীর খরিয়ার খেয়াঘাট গ্রামের কৃষক আজিজ আকন্দ, আলতাফ গাজী, সিদ্দিক ফকির সহ অনেকে ইরির সিসা প্রকল্পের সহায়তায় সূর্যমুখীর চাষ করে লাভবান হন। এছাড়া লবনাক্ত অঞ্চল কলাপাড়ার পূর্ব আমিরাবাদ গ্রামের কৃষক সারোয়ার আমন ধান কাটার পর পরই ’স্ট্রীপটিল’ মেশিনের সাহায্যে একই সাথে সার ও সূর্যমুখীর বীজ জমিতে ফেলে চাষ করেন। এতে তার চাষের খরচ ২/৩ ভাগ কম হয় এবং ফসলও ভাল হয়। তিনি হাইব্রিড হাইসান জাতে হেক্টর প্রতি ২.৫ টন/হেঃ ফলন পান। বাড়ীর জন্য তৈল করা ছাড়াও তিনি ১৬০০/- টাকা/মন দরে পটুয়াখালীর গোরস্থান রোডস্থ মডার্ন মিলে নিয়ে বিক্রি করেন।
সূর্যমুখীর বীজ বিক্রি নিয়ে কৃষকদের কিছু শংকা থাকলেও বর্তমানে তা অনেকখানি দূর হয়েছে।
মডার্ন মিলের মালিক পটুয়াখালী অঞ্চলের অনেক কৃষক থেকে সূর্যমুখীর বীজ ক্রয় করছেন। তাছাড়া বরিশালে অমৃত ফুড প্রোডাক্টস লিঃ -এর উদ্যোগে অমৃতনগরে সূর্যমুখীর বীজ থেকে তৈল করার একটি প্লান্ট বসানো হয়েছে। কোম্পানীর এমডি জানান তাঁদের প্লান্টের জন্য সারাবছর যে পরিমাণ সূর্যমুখীর বীজ দরকার তার ২৫% ভাগও যোগান হয় না; ফলে বছরে মাত্র ৩ মাস প্লান্টটি চালু থাকে। তাই সারা বছর প্লান্টটি চালু রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণে বীজ দরকার। সেজন্য বরিশাল অঞ্চলের কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উৎসাহিত করার জন্য তাঁরা সর্বাত্নক সহায়তা ও ন্যায্য দামে বীজ ক্রয় করার আশ্বাস দেন।
এ বছর সিসা-ইরি এবং  ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বরিশাল অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সূর্যমুখী চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে সূর্যমুখীর চাষ ও উৎপাদন আরও বাড়বে এবং দেশের ভোজ্য তেলের অভাব অনেকখানি মিটবে। সূর্যমুখীর তৈল যেহেতু (কোলেষ্টেরল কম থাকায়) হার্টের জন্য নিরাপদ সেজন্য এটি আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে। বরিশাল অঞ্চলে রবি মৌসুমে যে ব্যাপক পরিমাণ জমি পতিত থাকে, তা সূর্যমুখী চাষের আওতায় আনতে পারলে এ অঞ্চলের কৃষকগণ বেশ লাভবান হবেন। এক সময় বরিশালের বির্স্তিন অঞ্চল শুধুমাত্র পতিত অবস্থায় পড়ে থাকত।  বর্তমানে সেখানে সূর্যমূখীর আবাদ হচ্ছে। এতে ঐ অঞ্চলে এক নতুন সম্ভাবনার সুযোগ খুলে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কৃষি বিভাগ আরো যত্মবান হওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।

 

 

 

 

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *