বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ:গর্ভস্থ পানির নিম্নমুখীতা ও করণীয়

ড. আহাম্মদ আলী হাছান
বাংলাদেশের বিভিন্ন এগ্রোইকোলজিক্যাল জোনের মধ্যে বরেন্দ্র জোনটি বিভিন্ন কারণে বিশিষ্ট জোন হিসাবে পরিচিত এবং অন্যান্য জোনের থেকে এটির ভিন্নতা রয়েছে ৷ ভৌগলিকভাবে জোনটি ২৪ ডিগ্রি-২০’ -২৫ ডিগ্রি ৩৫’ উ: অক্ষাংশ এবং ৮৮ ডিগ্রি ২০’-৮৯ ডিগ্রি ৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত৷ জোনের আয়তন প্রায় ৭,৭৭০ বর্গকিলোমিটার৷ এ জোনটির পূর্বে করতোয়া, পন্ডিমে মহানন্দা নদী এবং গংগার উত্তর তীর দ্বারা দক্ষিণে পরিবেস্টিত৷ বরেন্দ্রভুমি দেশের বিভিন্ন জেলার যখাক্রমে দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া জয়পুরহা্ট, নওগাঁ, রাজশাহী এর মধ্যে বিস্তৃত৷ বরেন্দ্র অঞ্চলে বর্ষামৌসুম ( মধ্য জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত) ব্যতীত সারা বছর শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজমান থাকে৷ এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের মাত্রা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে কম এবং গড়ে বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ১,৯৭২ মি: মি: যা বর্ষা মৌসুমে হয়ে থাকে৷ এই বৃষ্টিপাতও আবার বিভিন্ন বছরে এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্নতর হয়ে থাকে৷ বরেন্দ্র অঞ্চলকে খরা কবলিত এলাকা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ গ্রীষ্মকালে এবং শীতকালে এ অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা যথাক্রমে ২৫-৩৫০ এবং ৯-১৫০ সেন্টিগ্রেট এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে৷ বিশেষ ক্ষেত্রে এবং বিশেষ বছরে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৫০ সেন্টিগ্রেট এর উপর চলে যায় আবার শীতকালে অনেক সময় তাপমাত্রা ৫০ সেন্টিগ্রেট এ নীচে নেমে যায়৷ বরেন্দ্র অঞ্চলে আবাদী জমির পরিমাণ ১.৪৪ মিলিয়ন একর যার পুরোটাই এটেল মাটি এবং এতে ৩৪% লোম, ১০% বালু, ৪৯% কাদা এবং ৭% অন্যান্য উপাদান পর্যবেক্ষণ করা যায়৷ আবাদি জমির ৮৪% এক ফসলী, ১৩% দ্বি-ফসলী এবং বাকীটুকু একফসলী৷ এ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা গড়ে ১১৭% যা জাতীয় নিবিড়তার (১৯১%) চেয়ে ৭৪% কম৷
বাংলাদেশে (পূবর্তন পূর্ব পাকিস্তানে) ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফসল উত্‍পাদনের ক্ষেত্রে সেচের পানির জন্য ভূ-উপরিস্থ পানি এবং বৃষ্টিপাত নির্ভরশীল ছিল৷ ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষির জমি গুলির সেচের জন্য সনাতন পদ্ধতি প্রচলন (ডোন, ইত্যাদি) ছিল যার কোন প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল না৷ বাংলাদেশে সেচের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তদান্তিন পূর্ব পাকিস্তানের পানি ও বিদু্যত্‍ উন্নয়ন অথরিটির (১৯৫৯) অধীনে যা বর্তমান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নামে প্রতিষ্ঠিত৷ পরবতর্ীতে ১৯৬১ সালে (তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন নামে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় যা বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন নামে প্রতিষ্ঠিত) বিএডিসিকে প্রতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে ভূ গর্ভস্থ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ কার্যক্রম বৃদ্ধি (small scale বা ক্ষুদ্র পরিসরে) এবং বাস্তবায়নের সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব অর্পন করা হয়৷ বিএডিসি কর্তৃক প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০০ গভীর নলকূপ স্থাপন প্রক্রিয়ার সময় বরেন্দ্র এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির উন্নয়ন কম হবে বিবেচনায় (Low potential for groundwater development) বাদ রাখা হয় ৷ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন কার্যক্রম বিএডিসি এর অধীনে বিআইএডিপি (Barind Integrated Area Development Project) প্রকল্পের অধীনে ১৯৮৫ সালে শুরু হয়৷ পরবর্তীতে বিআইএডিপি কে ১৯৯২ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন অথরিটি হিসাবে রুপান্তরিত করা নয় যার অধীনে বৃহত্‍ আকারে উক্ত অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানি উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়৷ ভূ-গর্ভস্থ পানি ফসল উত্‍পাদনে ব্যবহারের দ্বারা বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো মৌসুমে প্রচুর ধান উত্‍পাদনসহ সারা বত্‍সর অন্যান্য ফসল উত্‍পাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে৷
দেশের বিশাল জনগোষ্টির খাদ্য চাহিদা পূরনসহ খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশেই প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ভূ-গভস্থ পানি ব্যবহারের দ্বারা সেচ কার্যক্রম বিশেষ করে বোরোধান উত্‍পাদনের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে ফলশ্রুতিতে ধানের চাহিদা মিটাতে দেশ স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে৷ কিন্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচের জন্য ব্যবহারের পাশাপাশি পানি উত্তোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি যেমন বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমান, ভূ-গর্ভস্থ পানি পুন:র্ভরট ও উত্তোলন বিষয়ে তথ্য এবং ভূ-উপরিস্থ্থ পানির উত্‍স (নদী, বিল, পুকুর, ইত্যাদি) দ্বারা ভূ-গর্ভস্থ পানি পুন:র্ভরটের মাত্রা সমর্্পকে তথ্য থাকা প্রয়োজন যা করা হচ্ছে না৷ তথ্য সংগৃহিত হলেও পানির প্রাপ্তির সাথে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের বিষয়ে সামঞ্জস্য রাখা হচ্ছে না৷ ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা ও ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রতি বছর পূন:র্ভরটের ভিত্তিতে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন না করার ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে আজকাল ভূ-গর্ভস্থ পানির দুষপ্রাপ্যতা ও সংকটাপন্ন অবস্থার স্বীকার হচ্ছে৷ এ বিষয়ে দেশের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন খবরাদিতে তার চিত্র ফুটে উঠছে৷ যেমন:” The Financial Express” এর ১২ জুন ২০১২ ইং সংখ্যায় খবর প্রকাশ করা হয়েছে”Protecting ground water resources in high Barind tract stressed”৷ উক্ত শিরোনামের অধীনে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয় তাতে বল হয় দেশের পানি সম্পদ বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে বরেন্দ্র অঞ্চলে শস্য বহুমুখীকরণ কর্মকান্ড গ্রহন করা প্রয়োজন যাতে করে বোরো ধানের জন্য অধিক পরিমানে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ধারা কমানো যেতে পারে৷ এমনিভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানি অনেক গভীরে চলে যাওয়ার কারণে খাবার পানির অভাব প্রায়শ:ই পরিলক্ষিত হয় ৷ যেমন: ” The Daily Star” এর ২৭শে মে, ২০১২ ইং সংখ্যায় খবর প্রকাশ করা হয়েছে ” Barind ground water fall triggers drinking water crisis” উক্ত শিরোনামের আওতায় যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে তাতে বলা হয় যে নওগাঁ জেলার হাজার হাজার টিউবওয়েল ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর গভীরে চলে যাওয়ার কারণে অকেজো হয়ে পড়ে এবং ফলশ্রুতিতে অনেক উপজিলাতে যেমন: সাপাহার, পতি্নতলা, মহাদেবপুর, মান্দাতে খাওয়ায় পানির সংকট দেখা দেয় ৷
ভূ-গর্ভস্থ পানি প্রতি বত্‍সর বৃষ্টির পানি দ্বারা পুন:ভরাট না হওয়ার কারণে অথবা গ্রীষ্মকালে পানির স্তর টিউবওয়েলের সাকশন লিমিটেড নীচে হওয়ার কারণে টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়ে ৷
বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ পানি সাধারণত: পুন:ভরাট প্রতি বত্‍সরের মৌসুমী বৃষিটপাতের পানি এবং বন্যার পানি থেকে হয়ে থাকে ৷ এটি সাধারণত: মৌসুমী মাস (জুন হতে সেপ্টেম্বর) গুলিতে হয়ে থাকে ৷ কারণ মৌসুমী মাস গুলিতে আমাদের দেশে সাধারণত: মোট বৃষ্টিপতের শতকরা ৮০ ভাগ হয়ে থাকে ৷ অন্যদিকে দেশে উত্‍পদিত ধান বোরো, আউস, আমন এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির দ্বারা সেচের মাধ্যমে বোরোধান সবচেয়ে বেশী উত্‍পাদিত হয় ৷ বরেন্দ্র অঞ্চলেও এর ব্যতিক্রম নয় এবং সে অঞ্চল প্রধান শস্য বোরো ধান যা ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচের মাধ্যমে করা হয় ৷ অথচ এই বরেন্দ্র অঞ্চল সবচেয়ে কম বাত্‍সরিক বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ৷ যার জন্য বরেন্দ্র অঞ্চল প্রধান খরা কবলিত এলাকা বলে চিহিত করা হয়েছে ৷ যেহেতু মৌসুমী বৃষ্টিপাতের পানি হলো ৷ ভূ-গর্ভস্থ পানি পুন:ভরাটের একমাত্র উত্‍স সেহেতু উত্তোলিত পানির পরিমাণ পুন:ভরাটের চেয়ে বেশী হওয়ার কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বত্‍সরই ক্রমান্বয়ে অধ:মুখী হচ্ছে ৷ বিজ্ঞানীরা বরেন্দ্র অঞ্চল বৃষ্টির পানি দ্বারা ভূ-গর্ভস্থ পানি পৃন:র্ভরটের হার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে কম বলে উল্লেখ করছেন ৷ কারণ হিসাবে উক্ত অঞ্চল মাটির উপরিভাগ (Thick sticky clay) বলে পুন:ভরাট হার অনেক কম এবং Surface rainoff) অনেক বেশি ৷ বোরোধান সেচের জন্য অধিক হারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে প্রতি বত্‍সরই পানির স্তর নীচে চলে যাচ্ছে ৷
বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে যদি তথ্য-উপাত্তের দ্বারা বিশ্লেষন করা যায় ৷ সময়ের তারতম্যে ভূ-গর্ভস্থ পানির গভীরতা ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের সংখ্যার পরিবর্তন বা বৃদ্ধি এবং বর্ষা ও গ্রীষ্মকালে পানির স্তরের পরিবর্তনের হার পর্যবেক্ষণ করলে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে৷ ১৯৬৬-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের গভীরতা (Ground water Hydrograph) কোন পরিবর্তন দেখা যায় না৷ উক্ত অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নির্ণয়ের জন্য পর্যবেক্ষণ নলকুপ থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তরের গভীরতা নিম্নতম ৬-৭ মিটার এর মধ্যে দেখা যায়৷ গভীর নলকুপ স্থাপনের সংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকে৷ ২০১০ সালে শুষ্ক মৌসুমে নিম্নতম পানির স্তরের গভীরতা পূর্বের ৬-৭ মিটার থেকে ১৩.৫ – ১৪.৫ মিটার গভীরতা পেঁৗছে৷ অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে ১৯৬৬-১৯৭৫ সাল ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের গভীরতা ১.৩০ – ১.৮০ মিটার এর মধ্যে দেখা যায়৷ ২০১০ সালেও বর্ষা মৌসুমে নিম্নতম পানির স্তরের গভীরতা ১২.৯ -১৩.৭ মিটার এর মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা যায়৷ প্রদত্ত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে প্রতিয়মান হয় যে বর্ষা মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানি পুন:ভরাটের হারের পরিমাণ ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ অনেক বেশী৷ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বত্‍সর ভিত্তিক গভীর নলকুপ স্থাপনের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিমান থেকে৷ বরেন্দ্র অঞ্চলে বিভিন্ন উপজিলাতে গভীর নলকুপের সংখ্যা ১৯৬৬-১৯৭৫ সালে উদাহরণ হিসাবে তানোর উপজিলায় ভূ-গভীরস্থ গভীর নলকুপের সংখ্যা ১৯৭৫ সালে ছিল মাত্র ৫ টি ৷ ১৯৮৪ সালে গভীর নলকুপের সংখ্যা দাড়াঁয় ৭৭টি এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে যার সংখ্যা দাড়ায় ১২২টি ৷ সর্বশেষ ২০১০ সালে মোট গভীর নলকূপের সংখ্যা উক্ত উপ জেলায় দাড়ায় ৫০০টি এবং আরও অসংখ্য অগভীর নলকুপ (যা মিনি ডিপ হিসাবে পরিচিত) বেসরকারী ভাবে স্থাপন করা হয় ৷ বর্ষা ও গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি স্তরের পরিবর্তনের হার ভিন্নতর পরিলক্ষিত হয় ৷ বর্ষা মৌসুমের শেষে পানি পরিবর্তনের হার (Depletion Date) শুষ্ক মৌসুমের চেয়ে বেশী উপাত্ত থেকে দেখা যায় ৷ ১৯৭৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর পরিবর্তনের হার বত্‍সরে ২১.৪৩ সে: মি: এবং বর্ষা মৌসুমে ৩৩.৫৭ সে: মি: হিসাবে পরিলক্ষিত হয় ৷ বত্‍সর ভিত্তিক পানির স্তর পরিবর্তনের হার থেকে প্রতীয়মান হয় যে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্নয়ে অধ:মুখী হচ্ছে ৷ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অধ:মুখী হলেও এখন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর Mean Sea Level (MSL) এর উপরে অবস্থান করছে৷ বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন পর্যন্ত লবনাক্ততা প্রবেশ করার অবকাশ কম যেহেতু অঞ্চলেটি সমুদ্র হতে অনেক দূরে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এখন পর্যন্ত সমুদ্র পানির স্তরের উপরে (MSL) অবস্থান করছ্ ভে;ূগর্ভস্থ পানির স্তর গঝখএর নীচে চলে গেলে দূরর্বতী হলেও পানির চাপের পার্থক্যের কারণে (হাইড্রলিক গ্র্যডিয়েন্ট) দীর্ঘ সময় পরে লবনাক্ততার সমস্যা হবে না তা বলা যায় না৷ অধিকহারে
ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নীচে চলে যাওয়ার কারনে ভূ-উপরিস্থ পানির জলাধার গুলি (Super Water Bodies) মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও প্রভাবিত হতে পারে৷ এমনকি গাছপালাসহ জীব বৈচিত্রতার প্রভাব থেকে বাকি থাকবে না৷ ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অধিকহারে অধ:গমন থেকে রক্ষা করা সহ ররেন্দ্র অঞ্চল সমস্ত দেশের শস্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণে কর্মকান্ড গ্রহণ করা প্রয়োজন৷ শস্য বহুমুখীকরণ, কৃত্রিম পদ্ধতিতে ভূ-গর্ভস্থ পানি পুন:ভরাট করণ (Artificial Recharge), অধিকহারে সংরক্ষণের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি সেচের ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ, বর্ষা মৌসুমের পানি জলাধারের মাধ্যমে ধারণ করা (Rain Water Harvesting), সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি করা সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে৷ বরেন্দ্র অঞ্চল ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তেলনের দ্বারা বোরো মৌসুমে সেচ দেয়া হয় যার ফলে উক্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ৷ বোরোধান একর প্রতি ফলন অনেক বেশী হওয়ার কারণে উক্ত অঞ্চল বৃষ্টিপাত নির্ভর আমন ধান করতে কৃষকের মাঝে তেমন উত্‍সাহ দেখা যায় না ৷ তাছাড়া আমন মৌসুমে ধানের জন্য সম্পূরক সেচের (Supplemental Irrigation) জন্য তেমন সহায়তাও করা হয়না ৷ শস্য বহুমুখীকরণ কর্মকান্ডে বৃষ্টিপাত নির্ভর আমনধান আবাদসহ পরবর্তী সময়ে রবি (নভেম্বর – ফেব্রুয়ারী) ও খরিফ -১ (মার্চ – জুন) মৌসুমে ধান ব্যতিত অন্যান্য ফসল যেমন: গম, সরিষা, কলাই, তিল, ইত্যাদি আবাদ করা যেতে পারে ৷ বৃষ্টিপাত নির্ভর আমন ধান আবাদের জন্য প্রয়োজনে সম্পূরক সেচ প্রদান করা যেতে পারে ৷ স্বল্প মেয়াদি আমন ধান যা অক্টোরব মাসের কর্তন করা যায় তা আবাদ হলে আমন ধানের মাঠে মাটিতে প্রচুর পানি থাকে যাদ্বারা রবি শস্য বিনা সেচে উত্‍পাদন সম্ভব৷ পরীক্ষা নিরীক্ষা যা প্রমাণিত হয়েছে৷ রবি মৌসুমের শস্য আবাদ করার পর মাটিতে মোটেই পানি থাকে না যা ফসল আবাদ করার অযোগ্য হয়ে পড়ে ৷ বরেন্দ্র অঞ্চল মাটি কাদা এটেল মাটি হওয়ার কারনে মাটির উপরিভাগ একেবারেই শুষ্ক হয়ে যায় ৷ কিন্ত মাটির উপর থেকে ৮-১০ সে: মি: গভীর মাটি ভিজা থাকে যা মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে ৷ রবি শস্য কাটার পর খরিফ-১ মৌসুমে শুধুমাত্র ফসল বপনের জন্য যদি একটি সেচ দেয়া যায় যা ফসল বপনের জন্য উপযুক্ত হয়৷ পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গেছে গ্রীষ্মকালীন মুগ ডাল যদি স্বাভাবিকভাবে সমপূরক সেচের মাধ্যমে বপনের সময় চাবা গজানোর ব্যবস্থা করা যায় তাহলে পরবর্তীতে আর সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হয় না৷ মুগ ডালের শিকড় মাটির ভিতরে চলে গেলে ৮-১০ সে: মি: গভীরতায় প্রাপ্র্য মাটির রসই ফসলের চাহিদা পূরনে যথেষ্ঠ হয় বলে পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত ৷ পরীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় রবিশস্য উত্‍পাদনের জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলে (যদি আগাম আমন ধান আবাদ করা যায় যা অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ বা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কর্তন যোগ্য) সেচের প্রয়োজন হয় না ৷ সে সময়ে মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে যা শস্যের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়৷এসমস্ত বিশ্লেষণ ও পরীক্ষনের তথ্য থেকে দেখা যায় যদি বরেন্দ্র অঞ্চলে গম/শীতকালীন ডাল/ তৈল জাতীয় শস্য (সরিষা)-গ্রীষ্মকালীন মুগ ডাল/তিল-বৃষ্টিপাত নির্ভর আগাম ধান শস্য পরিকক্রমা অবলম্বন করা হয় তাহলে ভূ-গর্ভস্থ পানি অত্যাধিক উত্তোলন অনেকাংশে কমানো সম্ভব৷ সাধারণভাবে ধান উত্‍পাদনের জন্য ১২০-১৬০ সে: মি: পানি প্রয়োজন৷ বৃষ্টিপাত নির্ভর আমন ধানের ক্ষেত্রে ধানের পানির চাহিদা ৫০% বৃষ্টিপাত থেকে মেটানো সম্ভব৷ তার অর্থ হলো প্রায় ৬০-৮০ সে: মি: পানি ভূ:গর্ভস্থ থেকে উত্তোলন কমানো সম্ভব৷ যে টুকু চাহিদা বৃষ্টিপাতের দ্বারা পূরণ হবে বাকীটুকু সম্পূরক সেচের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানির উত্‍স থেকে সেচ প্রদান করা সম্ভব৷ এমনিভাবে পরীক্ষীত শস্য পরিক্রমার রবি শস্য ও গ্রীষ্মকালীন শস্যের চাহিদার জন্য মাটি থেকে প্রাপ্ত পানির অতিরিক্ত চাহিদা সম্পূরক সেচের দ্বারা মেটানো সম্ভব৷ এক্ষেত্রে সম্পূরক সেচের মাত্রা রবিশস্য ও গ্রীষ্মকালীন শস্যের জন্য ৬-৯ এবং ৮-১০ সে: মি: প্রয়োজন৷ উক্ত হিসাবে বত্‍সর ব্যাপী শস্য পরিক্রমার জন্য (ধান-রবি-গ্রীষ্ম) ৭৪-৯৯ সে: মি: পানি সম্পূরক সেচের জন্য প্রয়োজন৷ পক্ষান্তরে বোরোধান উত্‍পাদন যার পুরোটাই সেচের মাধ্যমে করতে হয় যার পরিমাণ ১২০-১৬০ সে: মি:৷ ক্ষেত্রবিশেষে বোরোধানের জন্য উলি্লখিত পরিমাণের চেয়ে বেশী পানি প্রয়োজন৷ আমন ধান শস্য পরিক্রমা ও শুধুমাত্র বোরোধান উত্‍পাদনের জন্য সেচের পানি পরিমাণ তুলনা করলে দেখা যায় আমন ধান পরিক্রমায় ৪৫-৬০ সে: মি: ভূ-গর্ভস্থ থেকে উত্তোলিত সেচ পানি সাশ্রয় করা সম্ভব৷ শুধুমাত্র বোরোধান উত্‍পাদনের সাথে আমন ধান পরিক্রমার শস্য সমূহ উত্‍পাদন করার জন্য সেচসহ উত্‍পাদন খরচ বাদে নেট আয়ের উপরও পরীক্ষণ কার্যক্রম করা হয়েছে৷ বোরোধান যা সম্পূর্নভাবে সেচ নির্ভর এবং উক্ত জমিতে বোরের পরবতী আর কোন ফসল করা হয়না৷ বোরো ধানের ক্ষেত্রে বাস্তব খরচ বাদ দিয়ে নেট আয় টাকা ৫২ – ৫৬ হাজার মাত্র হেক্টর প্রতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে৷ পক্ষান্তরে আমন শস্য পরিক্রমায় বাস্তব খরচ বাদ দিয়ে নেট আয় টাকা ৫০-৫৫ হাজার মাত্র হেক্টর প্রতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে৷ উলি্লখিত দুটি শস্য পরিক্রমার (শুধুমাত্র বোরে এবং আমন ধান পরিক্রমা) আর্থিক তুলনামূলক চি্েত্রর দ্বারা দুটি ক্ষেত্রেই সমান আর্থিক দায় প্রকালিত হয় ৷ ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচের জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৪৫-৬০ সে: মি: অতিরিক্ত পানি আমন ধান পরিক্রমার তুলনায় বোরো ধানের জন্য উত্তোলন প্রয়োজন যা বরেন্দ্র অঞ্চল ভূ-গর্ভস্থ পানির মজুদকে ভবিষ্যতের জন্য ভীতিকর করে তুলবে৷ বিষয়টি অত্র কারিগরী প্রবন্ধের প্রথমদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানির ক্রমান্বয়ে অধ:গমনের প্রদত্ত তথ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে৷ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমন ধান শস্য পরিক্রমার ব্যাপক প্রচলনের দ্বারা বর্তমান ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের অধ:মুখীর ব্যাপকতা থেকে রক্ষায় সহায়ক হবে৷ আমন ধান পরিক্রমায় অন্যান্য শস্য (ডাল জাতীয় শস্য) মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন (স্তর পদার্থ বৃদ্ধি)ও মাটিতে নাইট্রেজেনের পরিমাণ (বায়োলজিক্যাল নাইট্রেজেন ফিঙ্শেন) বৃদ্ধিতে ও সহায়ক হবে ৷ তাতে ফসলের জন্য মাটিতে রাসায়নিক সারের উপরি-প্রয়োগ কিছু অংশে হলেও কমে যাবে৷ বরেন্দ্র অঞ্চল ভু-গর্ভস্থ পানি অধ:গমনের হার ভূ-পৃষ্ঠে বুষ্টিপাতের পানি বৃষ্টিকালীন সময়ে সংরক্ষণের দ্বারাও কমানো প্রয়োজন৷ বরেন্দ্র অঞ্চল বিদ্যমান জলাধারগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোর ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব ৷ জলাশয় গুলোর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি হলে উক্ত জলাধারে সংরক্ষিত পানির দ্বারা আমন ধানসহ পরবর্তী শস্য পরিক্রমার জন্য সম্পূরক সেচ প্রদানে সহায়তা করবে ৷ তাতে করে বহুলাংশে ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচের জন্য কম উত্তোলিত হবে ৷ অন্যদিকে বিভিন্ন জলাধারগুলিতে সংরক্ষিত পানি ভূ-গর্ভস্থে পুন:ভরাটে সহায়তা করবে যা ভূ-গর্ভস্থ পানি কিছু হলেও উধর্ক্ষমুখী হবে অথবা অধ:মুখীর হার কমিয়ে আসবে ৷ প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে কৃষির সংগে সংশ্লিষ্ট উধর্্বতন কতর্ৃপক্ষসহ বিএমডিএ ও কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের আশু হস্তক্ষেপ বরেন্দ্র অঞ্চল ভূ-গর্ভস্থ পানির ভীতিকর অবস্থা থেকে রক্ষা কল্পে সহায়ক হবে ৷

সদস্য-পরিচালক ( প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউসিন্সল, ফার্ম গেট, ঢাকা-১২১৫ ৷

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *