বর্ষা শেষে গবাদীপশুর বাদলা রোগ! কারণ ও প্রতিকার

ডাঃ মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলাদেশের ষড়ঋতুর চক্রাকার আবর্তন প্রবাহে এখন শেষ হয়েছে বর্ষাকাল। প্রচন্ড গরমে অতিষ্ট মানুষকে শান্তি দিতে এসেছিলো বর্ষা। অবিরাম বর্ষণে বন্যাও দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন জায়গায়। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে লড়াই করতে হয়েছে মানুষকে। যেমন তৃপ্তি পেয়েছে মানুষ তেমনি তৃপ্তি পেয়েছে গাছপালা, পশু পাখি সবাই । এখন আর বর্ষা নেই। বর্ষা শেষ হবার পর কিছু কিছু রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। গবাদী পশুর যে রোগটা বেশি বেড়ে যায় তা হলো বাদলা বা ব্লাক কোয়াটার। গবাদী পশুর মারাত্বক রোগ গুলোর মধ্যে বাদলা বা ব্লাক কোয়াটার (Black quarter ) একটি অন্যতম। এই রোগে পশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই মৃত্যুর হার ১০০ ভাগই। বাংলাদেশের অনেক গরুই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এটি একটি ব্যকটেরিয়াজনিত মারাত্বক সংক্রামক রোগ। প্রতিবছর এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক পশুই মারা যায়, অনেক টাকা ক্ষতি হয় খামারীদের, তথাপি দেশের। তাই এই বাদলা রোগ সম্পর্কে জেনে তার নিয়ন্ত্রন করা একান্তই প্রয়োজন।

কারণতত্বঃ ঘাতক এই রোগটির জন্য দায়ী ক্লোস্টোডিয়াম চোউভি (Clostridium chauvoe )নামক ব্যকটেরিয়া। এটা গ্রাম পজিটিভ, অবায়ুরোধী, স্পোর সৃষ্টিকারী দন্ডাকৃতির ব্যাকটেরিয়া। এই জীবাণু সহজেই সংক্রামিত হতে পারে।

রোগতত্ব/ এপিডেমিওলজিঃ মারাত্মক সংক্রামক রোগ যা প্রায় সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে। তবে কিছু কিছু দেশে তাদের উন্নত ব্যবস্থাপনা ও খাদ্যাভাসের কারণে কম। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে এই রোগের প্রকোপ বেশি। বিশেষত বর্ষাকালে পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর পরই এর প্রভাব বেশী লক্ষ্য করা যায়।

এটি এমন রোগ যা সাধারণত হৃষ্টপুষ্ট পশুতেই বেশি হয়ে থাকে। যাদের বয়স ৬ মাস হতে ১/২ বছরের মধ্যে। এই সময় গরুর মাংস পেশি অনেক ভাল থাকে । যার ফলে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলেই খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে রোগের পরিণাম ঘটিয়ে থাকে। ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এই রোগ যে কোন বয়সে হতে পারে। তবে এর সংখ্যা তুলনামূলক খুবই কম থাকে। চিকন পশুর চেয়ে মোটা পশুতেই এর প্রকোপ বেশি লক্ষ্যনীয়। গবাদী পশুর ক্ষেত্রে ১০ বছর পর এই রোগের সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।

বাদলে রোগ যেসব ফ্যাক্টর এর উপর নির্ভর করে তা হলোঃ

বয়সঃ বাদলা রোগের ক্ষেত্রে বয়সের হিসাব নিকাশ খুবই বেশি। সাধারণত এই রোগে গরুর ক্ষেত্রে ৩ মাস হতে ২ বছরেই বেশি হয়।

খাদ্যঃ বেশি পুষ্টি সম্পন্ন পশুর ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি হয় ।

যে সমস্ত  প্রাণী আক্রান্ত হয়ঃ বাদলা বা ব্লাক কোয়াটার সাধারণত গরু, ছাগল, ভেড়া মহিষ সহ অন্যান্য প্রাণীতেও হয়ে থাকে।

যেভাবে রোগের বিস্তার ঘটেঃ

  দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে।

 ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এই রোগের জীবাণু বিভিন্ন ধরনের ক্ষতের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, যেমন শিংকাটার সময়, খাসীকরার সময়, বাচ্চা প্রসবের সময় এবং আনান্য অপারেশনের সময় বা অপারেশনের               পরে।

  স্পোরযুক্ত ঘাস বা অনান্য লতাপাতা গ্রহণের ফলে।

রোগ জননতত্ত্বঃ  স্পোর অবস্থায় এই রোগের জীবাণু দেহে প্রবেশ করে। অন্ত্রের অবায়বিয় স্থানে স্পোর ভেজিটেটিভ জীবাণুতে রুপান্তরিত হয়। পরে পচনশীল পদার্থের সাথে যুক্ত হয়ে এই জীবাণু রক্তে প্রবেশ করে। আর বৈশিষ্টগত কারণেই এই ব্যকটেরিয়া পুরু মাংশপেশীর প্রতি আসক্ত। তাই প্রধানত গ্লুটিয়াল, ঘাড়ের পেশীতে অবস্থান গ্রহণ করে। পরে সারকোল্যাকটিক এস্যিড বৃদ্ধির ফলে জীবাণুর বংশ বৃদ্ধির হার বেড়ে যায় অনেকাংশে।

এই জীবাণুর দ্বারা সৃষ্ট বিষ বা টকসিন (Hemolysis) আক্রান্ত পেশির মৃত্যু ঘটায়। এতে পেশীর কোয়াগুলেশনসহ সিরোহেমোরেজিক প্রদাহ সৃষ্টি হয়। ফলে গ্লুকোজ ফার্মান্টেড হয়ে এসিড ও গ্যাস উৎপন্ন হয়।

লক্ষণঃ বাদলা রোগের লক্ষণ কয়েকটি অংশে ভাগ করা যায়। যথা

১। অতি তীব্র প্রকৃতির ক্ষেত্রে-

    রোগের লক্ষণ প্রকাশের কয়েক ঘন্টার মধ্যে পশু মারা যায়। এমনকি ১-২ ঘন্টার মধ্যে পশু কোন লক্ষণ প্রকাশ না করেই মারা যায়।

২। তীব্র প্রকৃতির ক্ষেত্রে-

    প্রথমত পশুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।

     পশুর আক্রান্ত পায়ের ফলে সে খোঁড়াতে থাকে এবং মারাত্মক ভাবে বিষন্নত দেখায়।

    আক্রান্ত স্থান ফুলে উঠে, মাংশপেশীতে গরম অনুভুতি হয়।

   ফুলে উঠা জায়গায় হাত দিয়ে চাপ দিলে পুরপুর শব্দ করে। প্রথমে অল্প জায়গা ফুলে উঠে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে যেতে থাকে।কিছু সময় চামড়ার উপর ঠান্ডা অনুভুত হয় রক্ত চলাচল বন্ধ থাকার জন্য।

             আক্রান্ত স্থানে ফুটা করলে প্রচন্ড দুর্ঘন্ধযুক্ত কালো রক্ত দেখা যায়

             শরীরের যে কোন অংশের মাংশপেশিতে আক্রান্ত হতে পারে, তবে ঘাড় ও চোয়ালের পেশীতে বেশি দেখা যায়।

             অনেক সময় দেখা যায় আক্রান্ত জায়গার পেশীতে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং সেখান হতে কালো রঙের রক্ত ঝরতে থাকে।

             বাদলা রোগের জীবাণু চামড়ার নিচে গ্যাস উৎপন্ন করে থাকে।

             গলার নিকট ফুলো অধিক হলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

             পেটে গ্যাস জমা হয় এবং মাজেল শুকিয়ে যেতে থাকে।

             পশুর খাওয়া দাওয়া ও জাবর কাটতে বেশ সমস্যা হয়।

রোগ নির্ণয়ঃ বাদলা রোগ নির্ণয় করা সহজ হয় যদি এর ইতিহাস নেয়া যায়। যেমন

             পশুর বয়স যদি ৬ মাস হতে ২ বছর হয় তাহলে বাদলা হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি থাকে।

             বৈশিষ্টপুর্ণ উপসর্গ যেমন জ্বর, খোঁড়ানো, এবং আক্রান্ত মাংসপেশি টিপলে পুর পুর শব্দ হয়।

             পশুকে বাদলা টিকা দেয়া না থাকলে এবং পশু পুষ্টিমাণ ও স্বাস্থ্যবান হলে।

ইত্যাদি দেখে অনেকটাই বাদলার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।

মৃত পশুর ময়না তদন্তের প্রাপ্ত ফলাফল দেখে- আক্রান্ত পেশীর টিপলে পুরপুর শব্দ হয়, ক্ষতের পাশে কোন লিম্ফনোড থাকলে তা ফুলে যায়, দেহের স্বাভবিক ছিদ্র পথ দিয়ে রক্ত নির্গত হয়।

গবেষণাগারে প্রাপ্ত ফলাফলঃ ক্ষতস্থান হতে ফ্লুইড নিয়ে স্মিয়ার করে গ্রামস স্টেইনিং করলে পজিটিভ দন্ডাকৃতির ব্যকটেরিয়া দেখা যাবে।

চিকিৎসাঃ রোগের লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথে চিকিৎসা নিতে হয় না হলে পরে প্রাণীকে বাঁচানো যায় না। বিলম্ব না করে উপসর্গ দেখা দেয়া মাত্রই চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন। অ্যান্টিব্লাকলেগ সিরাম আক্রান্ত পশুর সিয়ার ১০০-২০০ মিলিলিটার ইনজেকশন দিতে হবে। অ্যান্টিসিয়াম পাওয়া না গেলে অ্যান্টিবায়েটিক দিয়ে  চিকিৎসা করা যায়।

এক্ষেত্রে

১। পেনিসিলিন গ্রুপের ওষুধ বেশ ভাল কাজ করে থাকে। প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১০,০০০ ইউনিট হিসেবে পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে। প্রথমে ক্রিস্টালাইন পেনিসিলিন শিরায় ইনজেকশন দিয়ে পরবর্তি মাত্রায় প্রোকেইন অর্ধেক মাত্রায় আক্রান্ত পেশীতে এবং বাকি অর্ধেক মাংশপেশীতে দিনে দুই বার করে ৫-৭ দিন দিলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

এই রোগের চিকিৎসায় ক্রিস্টাপেন, প্রণাপেন, এক্সিসেন্টিন, ট্রিব্রিশেন ও টেরামাইসিন যথাক্রমে ৮৭.৫, ৮৫.৫, ৪০.৩৩,৮০.০ এবং ৭১.৪৩ কার্যকর হয়েছে।

২. তাছাড়াও অক্সিটেট্টাসাইক্লিন দিয়েও চিকিৎসা করা যায় ৫-৮ মিলিগ্রাম প্রতি কেজিতে মাংসে ২৪ ঘন্টা পরপর ৪-৫ দিন দিতে হবে।

৩। পশু খুব দুর্বল হলে ৫%, অথবা ১০% বা ২৫% ডেক্সট্রোজ/গ্লুকোজ দিলে যকৃতে গ্লাইকোজেনের পরিমাণ ঠিক রাখতে সাহায্য করে যা বিষক্রিয়া খুব সহজেই দূর করা সম্ভব।

৪। হিস্টামিনের প্রভাব কমানোর জন্য এন্টিহিস্টামিন দেয়া যেতে পারে।

৫। আক্রান্ত পেশী কেটে মৃত টিস্যু কেটে ফেলে দিয়ে তাতে জীবাণু মুক্ত দ্রবণ দিয়ে পরিস্কার করতে হবে। যেমন ০.০১% পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট দ্রবণ অথবা হাইড্রোজেন পারক্সাইড দ্বারা দিনে দুইবার ধোয়া।

৬। ৮% নেগুবন সাথে সমপরিমাণ নারিকেল তেল এবং ৫০ গ্রাম সালফানিলামাইড পাউডার মিশিয়ে প্রত্যহ দুই বার করে ভাল না হওয়ায় আগ পর্যন্ত ব্যবহার করলে বেশ ভাল উপকার পাওয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাঃ

আক্রান্ত পশুকে আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাণীর খাবার পাত্র ও খাবার উপাদান ঠিকমত পরিস্কার ও দেখে শুনে খাওয়াত হবে। ময়লা স্থানের ঘাস না খাওয়ানো ভাল। প্রতিবছর নিয়মিত ভাবে প্রানীকে ঠিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

গরুর ক্ষেত্রে তিন মাসের বেশি বয়সের বাচ্চাকে ৫ মিলি বাদলা ভ্যকসিন চামড়ার নিচে দিতে হবে ছয় মাস পরপর। ছাগল ভেড়ার ক্ষেত্রে- ২ মিলি চামড়ার নিচে ৬ মাস পরপর প্রথম ডোজ দেয়ার ৪ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দিলে তার কার্যকারিতা এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সদা পরিস্কার পরিছন্ন রাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে খামারের ভিতরে এবং বাইরে। এই গুলো সঠিক ভাবে খেয়াল করলে বাদলার প্রভাব থেকে অনেকাংশেই মুক্ত থেকে দেশের প্রাণী সম্পদের উন্নতি সম্ভব হবে। নিজের আর্থ সামজিক মান উন্নয়নে গবাদীপশু পালনের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

————————————–

লেখকঃ

প্রাণী চিকিৎসক, ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সাইন্স অনুষদ,

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare