বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পঃ গুরুত্ব সমস্যা ও সম্ভাবনা

ভূমিকা

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকার ৮০ ভাগ এবং শ্রমশক্তি ৬০ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। গ্রামের উন্নয়নের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে কৃষি উন্নয়ন- কৃষি ভিত্তিক শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের উন্নয়ন। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১ কোটির অধিক এবং এটি বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ এবং সে সাথে একটি সম্ভবনাময় বড় বাজার।অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাময় বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোতেও বাংলাদেশের প্রবেশের বিশাল সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসেবে কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বাজারে প্রবেশের বড় স¤া¢বনাও তার আছে। কৃষি এখনো দেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠির প্রধান পেশা এবং অধিকাংশ জনগণই জীবন জীবিকা ও কর্মসংস্থান এর জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল কাজেই কৃষি ভিক্তিক শিল্পে স্বল্প মাত্রার সঞ্চালনা ও প্রেষণাই আমাদের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক বিস্ফোরণ সৃষ্টি করতে এবং গ্রামীণ জনগণের জীবন মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন তথা দারিদ্র বিমোচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষি শিল্পের উন্নয়ন এবং এ সেক্টরকে বাণিজ্যিক ভাবে লাভ জনক করার জন্য কৃষি সেক্টরের উন্নয়ন স্বাভাবিক ভাবেই অগ্রাধিকার অর্জন করেছে। তবে ২০০৮ সাল থেকে বাজেটে কৃষি সেক্টরের বরাদ্দ তেমন বাড়েনি (চিত্র ১), বরং মোট বাজেটে তা শতকরা হারে ক্রমাগত কমছে। জাতীয় বাজেটে মোট ভর্তূকির পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু কৃষিখাতে তা প্রতিবছর ক্রমাগতভাবে কমছে (চিত্র-২)।

 

চিত্র-১: বছরভিত্তিক জাতীয় বাজেটে কৃষি সেক্টরে বিনিয়োগ

 

চিত্র-২: বছরভিত্তিক জাতীয় বাজেটে কৃষি সেক্টরে ভর্তূকি

সত্তরের দশকেও দেশের কৃষিশিল্প অত্যন্ত পশ্চদৎপদ এবং আকর্ষণহীন অবস্থায়, যার ফল হয়েছিল ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি। ব্যাপক খাদ্য আমদানি এবং খাদ্য সহায়তা দেশকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল। আশির দশকের শেষ দিকে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে। সরকার কৃষি খাতের উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেয় এবং সারসহ কৃষি উপকরণের বাণিজ্য প্রাইভেট সেক্টরে দিয়ে দেয়। কৃষি নীতিতে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষি খাতে গতি সৃষ্টি করে কৃষি বাজার এবং কৃষি প্রযূক্তি সহ কৃষি ব্যবসা উপকরণ যেমন, উন্নত বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ ইত্যাদির উপর কাজ হয়। প্রাইভেট সেক্টরে কৃষি ব্যবসায় সরকারী সাহায্য-সহযোগীতা জোরদার করা হয়। নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও উন্নয়ন উন্নত বাজার সংযোগ সৃষ্টি, মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ এবং ব্যবসা সহায়তা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন কৃষি নীতিতে ব্যবসা সহায়তা সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রযূক্তি উন্নয়নের উপর জোর দেয়া হয়।

বাংলাদেশে দারিদ্র আজও ব্যাপক বিস্তৃত, যদিওবা দেশটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জনের দারপ্রান্তে। তবে মৌলিক খাদ্য শস্যের চাহিদা বাড়ছে ধীর গতিতে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান মধ্যম শ্রেনীর জনসংখ্যা এবং দ্রুত সম্প্রসারণশীল শহরায়নের কারণে জনগণ এখন চাচ্ছে রকমারি এবং উন্নতমানের খাদ্য (ভড়ড়ফ ফরাবৎংরঃু ধহফ যরময য়ঁধষরঃু ভড়ড়ফ) এবং সেই সাথে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যর চাহিদাও বাড়ছে। এসব কারণে কৃষকের সামনে এখন নানাবিদ নতুন ফসল, উচ্চমূল্য ফসল, মাছ-মাংস, ফল-মূল, তৈলবীজ, দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদন করে আয় বৃদ্ধির বিরাট সম্ভাবনাও সৃষ্টি হচ্ছে। বিদেশী ফসল দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়ছে। এই সব সুযোগ ও সম্ভবনাকে কাজে লাগাতে এবং সফল করতে কৃষি ব্যবসাকে (অমৎরনঁংরহবংং) কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের সাথে কাজ করতে হবে, যাতে নতুন নতুন ফসল এবং পণ্য উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াজাত হতে পারে এবং মূল্য-সংযোজন পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হতে পারে।

বৃহৎ অর্থে কৃষিতে শস্য, প্রাণিসম্পদ (গবাদিপশু, মৎস্য ও পোল্ট্রি) এবং বন খাত অর্ন্তভূক্ত। শস্যের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, গম, শাক-সবজি, আখ, ডাল ফসল ইত্যাদি। প্রাণিসম্পদের মধ্যে অর্ন্তভূক্ত গবাদিপশু, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, হাঁস-মুরগী ও মৎস্য। আমাদের জিডিপিতে কৃষির বর্তমান অবদান ১৮.৪০ ভাগ (২০১১-২০১২ অর্থ বছরের)। কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় উপ-খাত হল ফসল যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৭২ ভাগ জোগান দেয়। মৎস্য, পশুসম্পদ এবং বন উপ-খাতের অংশ যথাক্রমে শতকরা ১০.৩৩, ১০.১১ এবং ১০.০০ ভাগ।

একটি কৃষি ভিক্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফসল এবং ফল-মূল উৎপাদিত হয়। অধিকন্তু পোল্ট্রি, ডেইরী, মৎস্য ইত্যাদি উপ-খাত হিসেবে সাম্প্রতিক কালে উদীয়মান এ সকল কৃষি জাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানিরও অনেক সুযোগও সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি ভিত্তিক শিল্পের মধ্যে রয়েছে পোল্ট্রি ফার্ম, ডেইরী ফার্ম, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, মৎস্য হিমায়িতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। দেশের ব্যবসায়ী উদ্যেক্তা এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীগণ বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়া জাত শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী। জয়েন্ট ভেন্সার প্রকল্প এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদেরকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

কৃষি ভিত্তিক উপ-খাত সমূহ (ঝঁন-ংবপঃড়ৎ ড়ভ ধমৎরপঁষঃঁৎব)

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ন খাত, কারণ দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১৮.৪ ভাগ এবং কৃষিখাত মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ ভাগের কর্মসংস্থান করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এজন্যই একটি গ্রামীণ অর্থনীতি (ৎঁৎধষ বপড়হড়সু) বলা যেতে পারে। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমান অর্থ বছরে ৬.৩২ শতাংশ যা বিগত অর্থ বছরের তুলনায় প্রায় ০.৩৯ শতাংশ কম। জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস প্রধানত: কৃষি সেক্টরের ধীরগতির প্রবৃদ্ধির কারনেই (ইইঝ, ২০১১)। কৃষি ভিত্তিক শিল্প দেশের মোট শিল্পকারখানার প্রায় ৫০ ভাগ অথচ, মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত।

চলমান অর্থবছরে কৃষির প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৫৩ ভাগ অথচ বিগত বছরে ইহা ছিল ৫.১৩ ভাগ। ফসল এবং উদ্যান উপ-খাতের প্রবৃদ্ধিতে ধস নামে ০.৯৪ ভাগ, যা বিগত বছরে ছিল ৫.৬৫ ভাগ। সরকার জিডিপির প্রবৃদ্ধি এই অর্থ বছরে অভিক্ষেপণ (ঢ়ৎড়লবপঃরড়হ) করেছে ৭ ভাগ যা বিগত বছরে ছিল ৬.৭১ ভাগ। যা হোক, ওগঋ সহ দাতাসংস্থা সমূহ আমাদের প্রবৃদ্ধির অভিক্ষেপণ দেখিয়েছে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ভাগ।

খাদ্য এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপাত্ত অনুসারে ধান এবং গমের উৎপাদন চলমান অর্থ বছরে হবে ৩.৪৮ কোটি টন যা বিগত বছরের ছিল ৩.৪৫ কোটি টন। বিবিএস এর পরিসংখ্যান অনুসারে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি বিগত বছরের ৬.২২ ভাগ থেকে নিচে নেমে এখন ৬.০৬ ভাগ। এই সেক্টরের বিপর্যয়কারী প্রভাব রয়েছে কর্মসংস্থান, দারিদ্র দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তার উপর।

বাংলাদেশের কৃষি জমি খন্ড-বিখন্ডিত এবং তা সাধারণত ছোট, যা সমবায় পদ্ধতিতে আবাদ করে উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার জনপ্রিয়তার লাভ করছে। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। বাংলাদেশের ধান, পাট, আখ, আলু, ডাল ফসল, গম, চা, তামাক, তৈলবীজ প্রধান ফসল। আমাদের কৃষি সেক্টরে ফসল উপ-খাতই শক্তিশালী যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৭০ ভাগ যোগান দিচ্ছে।

জাতির খাদ্য চাহিদার যোগান দেয়াই সরকারের মূখ্য উদ্দেশ্য। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে খাদ্য শস্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, সিডর, আইলা ইত্যাদির ফলে খাদ্য এবং অর্থকরী ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারও নানান কর্মসূচী – যেমন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ নির্মাণ। এসব কর্মসূচীর মধ্যে আরো রয়েছে উন্নত জাতের ফসলের জাত, বীজ ব্যবহার এবং বালাই দমন ইত্যাদি।

যদিও ধান এবং পাট আমাদের প্রাথমিক ফসল তবে গম, ভূট্টা এবং শাক-সবজি ইত্যাদিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ এর ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে গম চাষীরা ভূট্টা উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ভূট্টা মূলত: মাছ এবং পোল্ট্রি ফিড প্রস্তুতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চালে চা এর আবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের উর্বর মাটি ও পর্যাপ্ত পানি থাকার কারণে অনেক এলাকাতেই ধানের আবাদ হচেছ বৎসরে তিন বার।

বিভিন্ন কারণেই বাংলাদেশের কৃষিতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ক্রমাগত ভাবে বেড়েছে। এ সকল কারনের মধ্যে রয়েছে, বন্যা নিয়ন্ত্রন ও সেচ, কার্যকর সার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি ঋণের উন্নত বন্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। ২০১০-২০১১ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন ছিল ২৮.৮ মিলিয়ন টন। সে তুলনায় গমের উৎপাদন ছিল ৯ মিলিয়ন টন। কিন্তু উৎপাদন সামর্থের উপরে জনসংখ্যার চাপ ক্রমশঃ বেড়ে চলছে। ফলে খাদ্য ঘাটতি বিশেষত: গমের উপর নির্ভরতা লেগে থাকছে। তা সত্বেও আমাদের কৃষি ব্যবস্থা বহুমূখী সমস্যার মোকাবেলা করে এগিয়ে চলছে। কোথাও কোথাও যেমন- উত্তরাঞ্চলে মৌসূমী খাদ্যাভাব (ঝবধংড়হধমষ ঐঁহমবৎ- সড়হমধ) এখনো সমস্যা হিসেবে বিরাজমান।

বাংলাদেশের গৌণ ফসল (সরহড়ৎ পৎড়ঢ়ং) যেমন- ডাল, মসলা, ইক্ষু, ফল-মূল, শাক-সবজি এবং তামাক এর উৎপাদন আগেকার মতই থেকে যাবে বলে ধারণা করা যায়। এ সকল গৌণ ফসলের অবদান আমাদের ফসল উপ-খাতে প্রায় ৩০ ভাগ। গবাদি পশুর উৎপাদন বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৩.৪৬ ভাগ, যা পূর্বেকার বছরগুলোতে ছিল ২.৪৪ ভাগ।

শস্য উপ-খাত (ঈৎড়ঢ়ং ংঁন-ংবপঃড়ৎ)

বাংলাদেশে কৃষি ভিত্তিক শিল্পের রয়েছে উজ্জল সম্ভবনা, যেহেতু দেশটি পর্যাপ্ত পরিমানে খাদ্যশস্য, ফল-মূল ও শাক-সবজি উৎপাদন করছে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলছে। আলু, ফুলকপি, বাধাকপি, টমেটো, সীম, বিভিন্নজাতের লাউ-কুমড়া, পালনশাক, মটরসুটি ইত্যাদিও উৎপাদিত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। এর পাশপাশি ব্রকলি, গাজর, সেলারি, কেপচিকাম, স্ট্রবেরী ইত্যাদির উৎপাদনও হচ্ছে। কিন্তু কৃষি ব্যবসা জোরদারকরণে উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতা ছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারী এবং বৃহৎ কৃষি ভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষিজাত পণ্য বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয় দেশ সমূহে রপ্তানি করতে হলে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে হবে যাতে করে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। এর ফলে কৃষকরাও কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের আয় এবং জীবনমান উন্নয়নে অনুপ্রাণিত হবে।

বাংলাদেশের তিনটি পাহাড়ি জেলায় (যা বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় এক দশমাংশ) প্রচুর পরিমাণে আনারস, কমলালেবু, কলা, পেঁপে, কাঠাল এবং আম ইত্যাদি উৎপাদিত হয়। কিন্তু বেশীর ভাগ পণ্য পঁচনশীল হওয়াতে এবং যথাযথ বিপণন সুযোগ সুবিধা না থাকায় চাষীরা তাদের পণ্যের উপযুক্ত মূল্য পায় না। উপরোক্ত ফলফলাদী এবং শাক-সবজি ছাড়াও বহুসংখ্যক চাষীরা পাহাড়ী এলাকায় মূল্যবান মশলাদী যেমন, আঁদা, হলুদ ইত্যাদি আবাদ করছে যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় এক চর্তুথাংশ পূরণ করছে। এ অঞ্চলে কৃষকেরা মনে করে যে, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে তারা কৃষিজাত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই উদ্দেশ্যে সম্ভবনাময় উদ্যেক্তাদেরকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উন্নয়নে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা দেবে। কাজেই পাহাড়ী অঞ্চলের কৃষক এবং জনগণের স্বার্থে ঐ অঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাত উপ-খাত (ঋড়ড়ফ চৎড়পবংংরহম ঝঁন-ংবপঃড়ৎ)

বাংলাদেশের শিল্পখাতের মধ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প অন্যতম প্রধান এবং সম্ভাবনাময় খাত। যা কর্মসংস্থান এবং মূল্য সংযোজন ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখতে পারছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প দেশের প্রস্তুতকৃত খাদ্য উৎপাদনের প্রায় ২২ ভাগের চাইতেও বেশী এবং এই উপখাত ২০ ভাগ শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান করছে। মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (জিডিপি) সকল খাদ্য প্রক্রিয়াজাত এন্টারপ্রাইজ এর অবদান ২ ভাগ। দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প প্রকৃতিগত ভাবেই আকার, প্রযূক্তি, পণ্যের গুনগতমান, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন এবং বন্টনের ভিত্তিতে বহুমূখী। এই খাতে প্রাথমিকভবে মূলত: ক্ষুদ্র এবং মাঝারী শিল্পই বেশী এবং স্থানীয় উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্ভাবনা, মূল্য সংযোজন এবং রপ্তানীর সাথে সংযুক্ত। দেশে প্রায় ৭০০ প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য    প্রস্তুতকারী শিল্প রয়েছে, যার মধ্যে গৃহে প্রস্তুতকৃত পণ্যও আছে এবং এর মধ্যে অন্তত ৩০ টি শিল্প কারখানা। যার মধ্যে রয়েছে কনফেকশনারী, ফল-মূল ও শাক-সবজি, সিরিয়াল, ডেয়রী বা দুদ্ধজাত, কার্বনেটেড এবং নন কার্বনেটেড জুস, কোমল পানীয় এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সামগ্রীর। বাংলাদেশের প্রায় ১৫ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে এখানে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিপুল অভ্যন্তরীণ বাজার। এই সম্ভাবনা বরং আরো বৃদ্ধি পাবে যদি আমাদের সীমানা সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রায় ৭ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চলের জনগণের একই ধরণের খাদ্যভ্যাস এবং সংস্কৃতিকে বিবেচনায় রাখা হয়।

যা হোকনা কেন, বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পক্ষেত্রে এখনো রয়েছে যথাযথ প্রযূক্তিগত সহায়তার অভাব। এই শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা যদি সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে ভড়ৎধিৎফ ধহফ নধপশধিৎফ লিংকেজ স্থাপন করা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের বহু ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের উৎপাদন লক্ষ্যনীয়। কেবলমাত্র নতুন পণ্যের উন্নয়নই নয় বরং আধূনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, গুণগতমানের উন্নয়ন, বায়োসেপ্টি এবং প্যাকেজিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সেই সাথে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিপণন জোরদার করার পাশাপাশি উৎপাদন পদ্ধতির উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প কৃষি উৎপাদনের উপরে বহুলাংশে নির্ভরলশীল যেহেতু তার কাঁচামাল মূলত কৃষিজাত পণ্য। এ কারণে এই শিল্পকে নানাবিদ চ্যালেঞ্জ এর মোকাবেলা করতে হয়। যার মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির উপর নির্ভলশীলতা এবং মৌসূম ভিত্তিক ফসল উৎপাদন। প্রতিবন্ধকতা থাকার  সত্বেও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের রয়েছে সর্বাধিক সম্ভবনা। এই সম্ভবনাকে সম্পূর্ন রূপে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন ঝঁংঃধরহবফ ফসল উৎপাদন, মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন এবং জনগনের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প দেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং রপ্তানির ভিত্তিতে নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। লাগসই প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে কৃষি ভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন করতে হলে বহুমূখী প্রতিযোগিতার মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান অনেকগুলো খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং সংরক্ষণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এই সেক্টরে যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব থেকে পূর্ণ সুবিধা গ্রহন এবং এই সেক্টরের উন্নয়ন ঘটতে পারে।

বন উপ-খাত (ঋড়ৎবংঃ ঝঁন-ংবপঃড়ৎ)

বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে কৃষি থেকেই জীবিকা নির্বাহ করে। ২০১০-১১ অর্থ বছরে শস্য এবং বন উপ-খাত আমাদের জিডিপিতে ১৬.০৩ ভাগ অবদান রেখেছে। বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চল প্রায় ২.১৮ মিলিয়ন হেক্টর, যা দেশের মোট সমতল ভূমির ১৭.০১ ভাগ। সরকারী বনভূমির বেশীর ভাগই বৃক্ষহীন, যার প্রধান কারণ বেপরোয়া বনজ সম্পদ আহরণ (ঊীঢ়ষড়রঃরড়হ)। কেবলমাত্র সরকারী জমির ০.৮৪ মিলিয়ন হেক্টরে (৫.৮ শতাংশ) গ্রহণযোগ্য মাত্রায় বনভূমি রয়েছে। বস্তুত এরিয়া এবং উৎপাদনের বিবেচনায় বাংলাদেশের বনভূমি ক্রমহ্রাসমান। কয়েক দশক আগেও আমাদের বনভুমির ছিল ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, কিন্তু তা এখন কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। দ্রুতবর্ধনশীল জনগোষ্ঠী, অতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং মাত্রতিরিক্ত বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহারের কারনে দেশে এখন পাট, টিম্বার, জ্বালানীকাঠ, গোÑখাদ্য (ঋড়ফফবৎ), বাঁশ, বেত, ঔষধীবৃক্ষ ইত্যাদির তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে। কাঠ ভিত্তিক শিল্পকারখানা- যেমন কাগজের কল, নিউজপ্রিন্ট মিল, পাল্প মিল, হার্ডবোর্ড মিল, পারটিকেল বোর্ড মিল, দিয়াশলাই কারখানা, আসবাবপত্র কারখানা, করাতকল ইত্যাদি কাঁচামালের অভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

মানুষ এবং পরিবেশের উপর ভূমি এবং বনজ সম্পদ এর অভাব তীব্র প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় জনগণকে তাদের আদি বনজ সম্পদ থেকে উচ্ছেদ করার কারণে পাহাড়ী অঞ্চলের বনভূমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বনভূমির সংকোচন ও অনুন্নয়ন এর ফলে বায়োডাইভারসিটি এর উপরেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব। উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। সংকুচিত বনভুমির কারণে পাহাড়ী মানুষের আবাস, জীবন জীবিকা এবং সংস্কৃতি ও তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭৩,০০০ হেক্টর বনভূমি উজার হয়েছে এবং তা কৃষি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে প্রতি বছর প্রায় ৮,০০০ হেক্টর বনভূমি বনশূন্য হয়েছে।

 

ড. মোঃ মিজানুর রহমান১

ড. মোঃ মোশাররফ হোসেন২

লেখকঃ

১। সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

২। প্রাক্তন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উচ্চশিক্ষা গবেষণা সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট এবং ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare