বাংলাদেশের কৃষি: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ

ড. মো. দেলোয়ার হেসেন মজুমদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগতভাবে নি¤œমূখী হচ্ছে ফলশ্রুতিতে পানিতে আর্সেনিকসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারপরও যদি এ প্রজাতির গাছ লাগানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে তা সহজেই অনুমেয়। অথচ আমরা এর পরিবর্তে বেলজিয়াম, একাশিয়া, ইপিল-ইপিল, মেহগনি ইত্যাদি কাঠের গাছের সাথে ফল গাছ (আম, জাম, কলা, লিচু, পেয়ারা, কাঠাল, তাল, খেজুর ইত্যাদি) লাগিয়ে একদিকে পরিবেশের উন্নতি সাধন অন্যদিকে ফলের চাহিদা ও পূরণ করতে পারি।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ লক্ষ মেঃ টন বীজ ব্যবহার হয় তার মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে মাত্র ধানের ৩৫-৪০ ভাগ এবং অন্যান্য ফসলের মাত্র ১০-১২ ভাগ। সরকার কৃষকদের ভাল মানের বীজ সরববাহের লক্ষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে (ডিএই) কৃষক পর্যায়ে ভিত্তি বীজের প্রদর্শনী স্থাপন করে এ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত এ বীজ দিয়ে বর্তমানে প্রায় ৭০ ভাগ উন্নত মানের ধান বীজের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে। সরকারের নন ইউরিয়া সারের মূল্য কমানো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদারকির ফলে বর্তমানে সুষম (ইধষধহপবফ) সারের ব্যবহার বৃদ্বি পেয়েছে। ফলে গত ৫ বছর যাবৎ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফল স্বরুপ গত ৩ বছর যাবৎ এক টন চালও বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়নি। এত প্রতিকুল পরিবেশেও কৃষি উৎপাদন গত ৫ বছর শক্ত ভিত্তির উপর দাড়িয়েছে, ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভাল অবস্থানে আছে।

ঘঅজঝ’ ২০১০ সালের একটা গবেষণায় দেখা গেছে জনসংখ্যা বর্তমান হারে বৃদ্বি পেতে থাকলে এবং খাদ্য গ্রহণ ৪৫৪ গ্রাম/জন/দিন হিসেবে আগামী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লোক সংখ্যা দাঁড়াবে ১৯ কোটি, খাদ্যের প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ১৫ লাখ মে. টন। আর ২০৫০ সালে লোকসংখ্যা দাড়াবে ২৫ কোটি এবং খাদ্য চাহিদা দাড়াবে ৪ কোটি ২৫ লাখ মে: টন। সেই সাথে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দাড়াবে ২০২৫ সালে বর্তমানে ৮১ লাখ হে: থেকে কমে ৬৯ লাখ হেক্টরে এবং ২০৫০ সালে দাড়াবে মাত্র ৪৮ লাখ হেক্টরে। সুতরাং এত অল্প পরিমাণ চাষযোগ্য জমিতে ৪.২৫ কোটি মে: টন চাল উৎপাদন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতএব এখন থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সমুন্নত রেখে খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। (ঝবসরহধৎ ড়হ ংপরবহপব ভড়ৎ ভড়ড়ফ ংবপঁৎরঃু’২০১০)

 

উপসংহারঃ আমরা জানি কৃষিতে নানাবিধ সমস্যা আছে যার সমাধান ও রয়েছে। আমরা কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট যা ধরে রাখতে হবে। শ্রীলংকতে এবছর পঞ্চাশ হাজার টন চাল রপ্তানি হয়েছে। নেপালে আমরা ভুমিকম্পে সহয়তা হিসেবে চাল দিয়েছি। তাপমাত্রা সহিঞ্চু গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্বি পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লক্ষ টন গমের চাহিদা রয়েছে, উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২-১৩ লক্ষ টন। যার জন্য খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লক্ষ টন গম আমদানি করতে হচেছ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮৬ লক্ষ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে স্বল্পে পরিসরে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে। এ মূহুর্তে সব্জি ও ফলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। ডাল ও তৈল জাতীয় ফসলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভোজ্য তেলের প্রায় ৭০% ভাগ আমদানি করতে হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুড়া থেকে রাইস বার্ণ অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈল আমদানি দিন দিন কমে যাচেছ। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০% ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষীরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানীও কমেছে। সারা বছর ব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টি নির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচী গ্রহন করেছে। ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে। যেখানে কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আর ও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

————————————–

লেখক:

কৃষি গবেষক ও পুষ্টিবিদ,

উপ-পরিচালক (কৃষি সম্প্র: ও গ্রামীণ অর্থনীতি), জাতীয় প্রশিক্ষণ একাডেমী, গাজীপুর। ফোন-০১৮১৫৫৯৭৩০৪

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *