বাংলাদেশে মত্‍স্যখাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

এ.এস.এম.রাশেদুল হক
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দরিদ্র দেশগুলো কোনভাবেই দায়ী না হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব দরিদ্র দেশগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে৷ আর এ কারণে বিশ্বব্যাপী দাবি উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য ধনী দেশগুলোকেই প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রযুক্তির যোগান দিতে হবে৷ কোন দেশের জলবায়ু পরিবর্তন বলতে সে দেশের দীর্ঘমেয়াদী প্রাকৃতিক আবহাওয়ার গড় পরিবর্তনকেই বোঝানো হয়ে থাবে৷ এক কথায় জলবায়ু হচ্ছে কোন অঞ্চলের বা দেশের কমপক্ষে ৩০ বছরের গড় প্রাকৃতিক আবহাওয়া৷
ভূ-পৃষ্টে তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ও ঋতু বৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঘটছে৷ দেশে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, তাপদাহ, অসময়ে অধিক গরম বা শীত, অসময়ে বৃষ্টিপাত, অকাল বন্যা, হিমবাহ ও পর্বত চুড়ার জমাট বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার কাণে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চলের পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) অনুমান অনুসারে একুশ শতকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৮ ডিগ্রী থেকে ৪.০ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে৷ ফলে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের পরিমান বৃদ্ধি পাবে, দেশে অকাল বন্যা দেখা দিবে৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ০.১৮ থেকে ০.৭৮ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে ও উপকূলীয় প্রাকৃতিক দূর্যোগ বৃদ্ধি পাবে৷ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত নদীগুলোতে লবণাক্রান্ত বেড়ে যাবে৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিপদাপন্ন দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে৷ বাংলাদেশে প্রতি ৪-৫ বছরে একবার তীব্র বন্যার শিকার হচ্ছে যা দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশী এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের জীবনহানি হচ্ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়িসহ জীবন জীবিকার মারাত্নক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে৷ বাংলাদেশে গড়ে প্রতি ৩ বছরে একটি ভয়াবহ ঘূণিঝড় আঘাত হানছে৷ বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে বা পড়ে এই ঘূণিঝড়গুলো সৃষ্টি হচ্ছে এবং বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের উপর দিয়ে ধেয়ে আসায় তা তীব্রতর হচ্ছে৷ ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতি ঘন্টায় ১৫০ কি.মি. এর বেশী হবার কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস সাত মিটার পর্যন্ত উঁচু হচ্ছে৷ এ ধরণের ঘুর্ণিঝড় উপকুলীয় অঞ্চলে প্রচুর মানুষ ও গবাদিপশুর জীবনহানি এবং ঘরবাড়ির উপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আনছে৷ ১৯৯১ সালের ঘূণিঝড়ে ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষের জীবনহানি ঘটেছে৷ সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সাগর প্রায়ই উত্তাল থাকছে এবং সাইক্লোন, সিডর ও আইলা উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানছে৷ ফলে লক্ষ লক্ষ জেলেদের জীবন জীবিকাসহ নৌকানির্ভর মত্‍স্যজীবীদের জান মালের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে ও জেলেদের সমুদ্রগমন হুমকির মুখে পড়ছে৷
আইপিসিসি’র ৪র্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুসারে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রভাবগুলো হচ্ছে-
১. বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে
২. অতি বন্যা, অতিরিক্ত বৃষ্টি বা অসময়ে বৃষ্টিপাত হবে
৩. দীর্ঘমেয়াদী খরা বা অনাবৃষ্টি দেখা দিবে
৪. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে
৫. দেশের অভ্যন্তরের নদ-নদী গুলোতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটবে
৬. দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোন এর প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে৷
মত্‍স্য সেক্টরের ওপর এর প্রভাব:
বাংলাদেশের মত্‍স্য সম্পদকে মোটামুটি চারভাগে ভাগ করা যায়-
ক. অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়
খ. অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়
গ. উপকূলীয় মত্‍স্য সম্পদ (আধা লবণাক্ত অঞ্চল)
ঘ. সামুদ্রিক মত্‍স্য সম্পদ
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলজসম্পদের সকল ক্ষেত্রেই এর কিছুনা কিছু প্রভাব পড়তে শুরু করেছে৷ আইইউসিএন এর তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে বর্তমানে স্বাদুপানির দেশীয় প্রজাতির ৫৪টি মাছের অবস্থা সংকটাপন্ন৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় মত্‍স্য সম্পদের ওপর এর প্রভার সবচেয়ে বেশী পরিলক্ষিত হচ্ছে৷ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরার প্রকোপ, অতিবৃষ্টি ও বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লোনা পানির অনুপ্রবেশ এবং জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলজসম্পদের ওপর প্রভাব নিম্নে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে-
১. খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-দিঘীর পানি শুকিয়ে যাবে ও জলাশয়গুলোতে পানির স্বল্পতা দেখা দিবে (বিশেষকরে দেশের উত্তরাঞ্চলে)৷ ফলে শুস্ক মৌসুমে মাছের উত্‍পাদন হ্রাস পাবে ও পানির অভাবে মাছের আশ্রয়স্থল সংকুচিত হবে এবং প্রজননক্ষম মাছের পরিমান হ্রাস পাবে৷
২. উন্মুক্ত জলাশয়ে বসবাসকারী কিছু প্রজাতির মাছ আবাসস্থল পরিবর্তন করবে ৷ মাছের প্রজনন ও অভিপ্রয়ানের সময় পরিবর্তনের ফলে মাছ ও চিংড়ির প্রজাতি বৈচিত্র্য ও প্রাপ্যতা কমতে শুরু করবে৷ ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ও চিংড়ির মাইগ্রেশন এ ব্যঘাত ঘটবে এবং ফিসিং গ্রাউন্ডের পরিবর্তন হবে৷
৩. বিল, খাল, নদী, হাওড় শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এর অধিকাংশ কৃষি জমিতে রুপান্তরিত হবে, ফলে মাছের আবাস সংকুচিত হবে৷
৪. হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্থ হবে৷ ফলে স্বাদুপানির মাছের প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে৷ দীর্ঘ সময় ধরে খরা থাকলে মাছের শুক্রাশয় বা ডিম্বাশয়ের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটবে এবং মাছের জৈবিক প্রক্রিয়ায় সমস্য দেখা দিবে৷
৫. খরার প্রকোপ বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি ও বন্যা, লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে প্রতিষ্ঠিত মত্‍স্য অবয়াশ্রমগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে ৷ মাছের প্রাকৃতিক ও আহরণজনিত মৃত্যুহার বাড়বে এবং মত্‍স্যকূলের প্রজননে ব্যঘাত সৃষ্টি হবে৷
৬. বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে মাটি/বালি পড়ে বিল, খাল, নদী, হাওর-বাওড়ের নব্যতা হারাবে ও মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হবে৷ সাগর ও উপকূলের ইলিশ মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটবে৷
৭. উপকুলীয় এলাকার চিংড়ির ঘের ও মাছের পুকুর তলিয়ে/ পাড় ভেঙ্গে যাবে ৷ পুকুর/ ঘেরের পানির ভৌত-রাসায়নিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে জলাশয়ের উত্‍পাদনশীলতা নষ্ট হবে এবং মাছ ও চিংড়ির উত্‍পাদন হ্রাস পাবে এবং মাছ ও চিংড়ির প্রজাতি বৈচিত্র্য ও প্রাপ্যতার পরিবর্তন ঘটবে৷ পুকুর/ঘের পানিতে ভেসে মজুদকৃত মাছ/চিংড়ি বেরিয়ে যাবে ও মত্‍স্যচাষিগন ক্ষতিগ্রস্থ হবে৷
৮. অতি বন্যায় পুকুর ভেসে পুকুরে চাষকৃত বিদেশী ও রাক্ষুসে মাছ উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রবেশ করে জলজ জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট করবে৷ অথবা বাহিরের রাক্ষুসে ও অন্যান্য মাছ পুকুরে প্রবেশ করে মাছের নতুন নতুন রোগ দেখা দিবে৷ এছাড়া বাহিরের ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে পুকুরের পানি দূষণ ঘটাবে৷ এতে রোগ জীবানুর প্রকোপ বেড়ে পুকুরের চাষকৃত মাছের মড়ক দেখা দিতে পারে৷
৯. সামুদ্রিক মত্‍স্য সম্পদ, বিশেষকরে প্যারাবন ও কোরাল ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে নানা জাতের মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়ার প্রজনন ও নার্সারিক্ষেত্র নষ্ট হয়ে এসবের উত্‍পাদন ক্ষতিগ্রস্থ হবে৷
প্রতিকার : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোর সময় ও তীব্রতা সম্পর্কে আইপিসিসির পূর্বাভাসে ভবিষ্যতবাণী থাকলেও পরিবর্তনের গতিপথ সম্পর্কে যে ধারনা দেওয়া হয়েছে তা পুরোপরি পরিস্কার৷ বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তন এবং গ্রীস্মকালীন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বাড়ার ঘটনা এর প্রমান ৷ যেমন সাইক্লোন, সিডর, আইলা ও মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে মিয়ানমারে নার্গিস আঘাত হানার মধ্যে দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে৷ মত্‍স্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হবে দীর্ঘ মেয়াদী ও বহুমূখী৷ তাই মত্‍স্য খাতে ঝুঁকি মোকাবেলায় নিম্নোক্ত কার্যক্রমগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন৷
১৷ খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-দিঘী ও হাওর-বাঁওড় খনন/পুনঃখনন বা সংস্কার করে জলাশয়ের গভীরতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে মাছের আবাসস্থল সম্প্রসারিত হয়৷ এ ছাড়া জলাশয়ের গভীরতম অংশে মত্‍স্য অভয়াশ্র স্থাপন করে শুস্ক মৌসুমে মাছের মজুদ রক্ষা করা প্রয়োজন৷ এতে করে বর্ষা মৌসুমে প্রজননক্ষম মাছের পরিমান বৃদ্ধি পাবে এবং সংকটাপন্ন বা বিপন্ন প্রজাতির মাছের মজুদ বৃদ্ধি পাবে৷
২৷ পুকুরের পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে অথবা ভূ-গর্ভস্থ পানির উত্‍স থেকে বা অন্য কোন উত্‍স থেকে পুকুরের পানির সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে৷
৩৷ চিংড়ি ঘের ও পুকুরের পাড় উচু ও মজবুত করতে হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি সহনশীল মাছ (যেমন-ভেটকি, টেংরা, চিংড়ি, কাঁকড়া) চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে৷ খরা প্রবণ এলাকায় মাছ চাষের পরিবর্তন এনে মৌসুমী চাষ পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে (যেমন-মনোসেক্্র তেলাপিয়া চাষ, পাংগাস চাষ, কৈ, শিং, মাগুর মাছ চাষ ইত্যাদি)৷
৪৷ বন্যার ফলে যাতে উন্মুক্ত জলাশয়ে বিদেশী রাক্ষুসে মাছের (যেমন- পিরানহা, আফ্রিকান মাগুর ইত্যাদি) অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে সেজন্য চাষকৃত জলাশয়ে বানা/ বেড়ি বাধ নির্মানের
(চলবে)
জেলা মত্‍স্য কর্মকর্তা, গাইবান্ধা

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *