বাকৃবিতে গবেষণা সাফল্য: প্রথমবারের মত বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন

 

মো: আব্দুর রহমান

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তালমিলিয়ে দেশে পোল্ট্রি এবং মৎস্য উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে প্রাণি সম্পদ বিশেষ করে ছাগলের উৎপাদন তেমনটা আশানুরূপ বাড়েনি। এদেশে প্রাপ্ত প্রায় ২০ মিলিয়ন ছাগলের প্রায় ৯৩ শতাংশ পালন করে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ধরণের খামারিরা। অথচ গবাদি প্রাণিকুলের মধ্যে ছাগল পালন যতটা লাভজনক ও সহজ অন্যগুলো তেমন নয়। ছাগলের যেসব জাত আছে যেমন অ্যাংগোরা, বারবারি, বিটাল, যমুনাপারি, সুরতি, মারওয়ারি, মালবারি, গাড্ডি, কাশ্মিরী, পশমিনা, সানেন, টুগেনবার্গ, অরপাইন, মোহসানা, ফিজি, অ্যাংলোলু। এসবের মধ্যে বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল বিশ্বমানের বিশ্ব সেরা। এসব ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস যেমন সুস্বাদু, চামড়া তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে উন্নতমানের বলে স্বীকৃত। সার্বিক বিচারে এসব গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের বাণিজ্যিক উৎপাদন এদেশে এখনো প্রসার লাভ করেনি। এ লক্ষ্যে পৃথিবীর অন্যতম সেরা জাতের ছাগল ‘ব্ল্যাক বেঙ্গলের’ জীবনরহস্য উন্মোচন (জিনোম সিকোয়েন্সিং) করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের পশুপ্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এম. এ. এম ইয়াহিয়া খন্দকারের নেতৃত্বে এই সাফল্য এসেছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে পুরো গবেষণাটি হয়েছে।

গত (১২ নভেম্বর) ২০১৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জৈব প্রযুক্তিবিষয়ক সংস্থা এনসিবিআই থেকে তা নিবন্ধন পেয়েছে। বাংলাদেশের স্থানীয় জাতের ছাগলের জীবন রহস্য উন্মোচনের তথ্য ১৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বাংলাদেশে মোট ছাগলের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ, যার ৯০ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। এ জাতের ছাগল প্রতিবারে একাধিক বাচ্চা দেয়। দ্রুত প্রজননশীল, চামড়া উন্নত মানের এবং উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার উপযোগী। এ ছাড়া ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস স্বাদে, গন্ধে ও রসালতায় অনন্য হিসেবে পরিচিত। দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন ছাগলের মাংস উৎপাদিত হয়, যা মোট উৎপাদিত গবাদিপশুর মাংসের প্রায় ২৫ ভাগ। এ জাতের অধিকাংশ ছাগলের গায়ের রং কালো। তবে বাদামি, সাদা রঙেরও দেখা যায়।

বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং এর প্রয়োজনীয়তাঃ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের বাচ্চা উৎপাদন ক্ষমতা অধিক এবং তারা দেশীয় জলবায়ুতে বিশেষভাবে উৎপাদন উপযোগী। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল প্রধাণত গোশত ও চামড়া উৎপাদনকারী জাত হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত। এজন্য আমরা খুব গর্ব করে বলতে পারি ব্ল্যাক বেঙ্গল আমাদের ছাগলের জাত। এদের গড় ওজন ১৫-২০ কেজি। কখনও কখনও ৩০-৩২ কেজি পর্যন্ত হয়। দৈনিক ওজন বৃদ্ধির হার দৈনিক ২০-৪০ গ্রাম। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ছাগল পালনের মাধ্যমে একজন ভূমিহীন বা প্রান্তিক খামারি বাড়তি আয় করতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন বৈশিষ্ট্যাবলীর মধ্যে যথেষ্ঠ বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এ জাতের ছাগলের দৈহিক বৃদ্ধিও হার অন্যান্য জাতের তুলনায় কম। জেনোমিক কৌশল প্রয়োগ করে স্বল্প সময়ে ও নিখূঁতভাবে এ ছাগলের উৎপাদন সম্ভব। বিপুল উৎপাদন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রাণিটির উৎপাদন পরিকল্পনা মাফিক পর্যাপ্ত দীর্ঘ মেয়াদি গবেষণা ও সম্প্রসারণ অদ্যাবদি অপ্রতুল। দারিদ্র বিমোচন, পুষ্টি সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এই বাংলাদেশি প্রাণিসম্পদ।

বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং এর উদ্দেশ্যঃ ক) বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের একটি পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্স জিনোম তৈরী করা।

খ) ডিএনএ মার্কার আবিষ্কার ও মার্কার গুলোর মাধ্যমে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের ওজন বৃদ্ধি হার, দুধ উৎপাদন, বাচ্চা উৎপাদন হার, রোগ প্রতিরোধ ও মাংসের গঠন সংক্রান্ত জীন আবিষ্কার ও তাদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়।

গ) ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জিনোমে মোট জিনোম সংখ্যা, গঠন ও কার্যাবলী নিরুপণ।

যেভাবে সম্পন্ন করা হলো ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিংঃ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএলআরআই) হতে বংশ ইতিহাস জানা ও সংরক্ষিত বিশুদ্ধ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের কানের টিস্যু সংগ্রহ করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের পশুপ্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ ও পোল্ট্রি বায়োটেকনলজি এবং জিনোমিং ল্যাবরাটরিতে উচ্চ গুণগত মানের জিনোমিক ডিএনএ প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীতে GENEWIS জিনোম সিকোয়েন্সিং সেন্টারে Next Generation DNA Sequencer lllumina HiseqX 2*150 paired end (PE) configuration এ সংরক্ষিত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের ১২৫.০২০ গিগা বেজ প্রাথমিক নিউক্লিওটাইড ডেটা সংগ্রহ করা হয়। এরপর বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের High Performance Computing (HPC) Facility (BFRen) ব্যবহার করে সংগৃহিত প্রাথমিক ডাটা থেকে ছাগলের পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্স গাইডেড এসেম্বলী সম্পন্ন করা হয়।

উল্লেখ্য যে, এ গবেষণায় নিউক্লিয়ার ও মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম আলাদাভাবে এসেম্বল করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল জিনোম তথ্যসমূহ আন্তর্জাতিক জিনোম ডাটাবেজে (National Center for Biotechnology Information USA) জমা করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ এসেম্বলকৃত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জিনোম প্রায় ২.৯ গিগা বেজ নিউক্লিওটাইড রয়েছে। এছাড়া ইহার  মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম সাইজ ১৬,৬৪০টি নিউক্লিওটাইড যাতে ৩৭টি জীন রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জিনোমে জিনের সংখ্যা ও গঠন জানার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

এ আবিষ্কারের সুফল পেতে করণীয়ঃ

ক) আবিষ্কৃত SNP মার্কারগুলো প্রয়োগ করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের দৈহিক বৃদ্ধি, দুধ উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, মাংসের গুণাগুন, গায়ের রং, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত জীন সমূহ আবিষ্কার করতে হবে।

খ) মাঠ পর্যায়ে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জেনাটিক ভিন্নতা নিরুপন এবং প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে প্রজনন কৌশল প্রয়োগ।

গ) জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সংবেদনশীল ও খাপ খাওয়ার জন্য ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের নিয়ামক জীন আবিষ্কার।

ঘ) ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের সাথে আবিষ্কৃত জিনের সম্পর্ক নিরুপণের মাধ্যমে অধিকতর উৎপাদনশীল ছাগল বাছাই ও উৎপাদন করতে হবে।

ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং ও এসেম্বলী টিমঃ বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং গবেষণা টিমের প্রধান গবেষক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এম. এ. এম ইয়াহিয়া খন্দকারের নেতৃত্বে অন্যান্য গবেষকবৃন্দ হলেন- পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সামসুল আলম ভূঞা, বিএলআরআই এর ছাগল ও ভেড়া উৎপাদন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. আব্দুল জলিল, বিএলআরআই এর বায়োটেকনলজি বিভাগের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড, গৌতম কুমার দেব, বিএলআরআই এর ছাগল ও ভেড়া উৎপাদন বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. পনির চৌধুরি ও নূরে হাছনি দিশা।

গবেষকদের বক্তব্যঃ এ ব্যাপারে ছাগলের জীবনরহস্য উন্মোচনকারী গবেষণা দলের অন্যতম গবেষক বজলুর রহমান মোল্যা বলেন, বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অল্প জায়গায় পালন করা যায়, দ্রুত বড় হয় বলে একে গরিবের গাভি বলা হয়। কিন্তু এই ছাগলের আকৃতি একটু ছোট ও মাংস কম হয়। জীবনরহস্য উন্মোচনের ফলে এখন এর কোন কোন জিন তার আকৃতি ও শরীরে মাংসের পরিমাণ নির্ধারণ করে, তা জানা যাবে। ফলে আরও উন্নত জাত উদ্ভাবন করা সহজ হবে।

গবেষণা দলের গবেষক পশুপ্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সামসুল আলম ভূঞা বলেন, এর আগে ২০১৬ সালে জাতিসংঘের কৃষিবিষয়ক সংস্থা (এফএও) ও আন্তর্জাতিক আণবিক গবেষণা সংস্থা থেকে বিশ্বের ১০০টি ছাগলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি গবেষণা করে। তাতে বাংলাদেশের স্থানীয় জাতের ছাগল ব্ল্যাক বেঙ্গলকে বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমেন্টে ছাগল ও চীন ইউনান ছাগলের জীবনরহস্য উন্মোচন করা হয়। তারা ওই দুই জাতের ছাগলের আরও উন্নত জাত উদ্ভাবন করে সে দেশের কৃষকদের কাছে তা সরবরাহ করছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাঃ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস বিশ্বজুড়ে কুষ্টিয়া গ্রেড নামে পরিচিত, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা ছাগলের মাংস হিসেবে সমাদৃত। জীবনরহস্য উন্মোচনের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই উদ্ভাবন এই ছাগলের জাতের আরও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ওই ছাগলের ওজন ও মাংসের পরিমাণ বাড়ানো এবং মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের দলটি পরবর্তী ধাপে গবেষণা করবে বলে জানিয়েছে।

লেখকঃ

১২৬/গ, আশরাফুল হক হল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare