বাকৃবি গবেষকের প্রাণির ভ্রুণ সংরক্ষণ এবং স্থানান্তরের সফলতা ভেড়া হতে মিলবে বছরে ২৫-৩০-টি কাঙ্খিত ভ্রুণ

 

এম এস সরদার

গবাদিপ্রাণির ভ্রুণ সংরক্ষণ এবং স্থানান্তরের সফলতা পেয়েছেন ভেটেরিনারি অনুষদের সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের গবেষকরা। ফলে সুপার ওভুলেশনের মাধ্যমে বছরে ২৫-৩০টি উন্নত প্রজাতির কাঙ্খিত ভ্রুণ পাওয়া যাবে। গবেষকরা গত দুই বছর ধরে ভেড়ার ভ্রুণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে এ সফলতা পান।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে ভেড়ার ভ্রুণ উৎপাদন, সংরক্ষণ, স্থানান্তর এবং বাচ্চা প্রসবের সফলতা বাংলাদেশে এটিই প্রথম। বাংলাদেশে মাংস ও দুধের চাহিদা পূরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরার জন্য গবাদিপ্রাণির জাত উন্নয়নের বিকল্প নেই। স্বল্পতম সময়ে উচ্চগুণসম্পন্ন অধিকসংখ্যক গবাদি প্রাণির বাচ্চা উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে জাত উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহেন্সমেন্ট (হেকেপ) প্রজেক্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের গবেষকগণ গরু ও ভেড়াতে ভ্রুণ স্থানান্তরের কাজ শুরু করেন।

গবেষকরা বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘকাল হতে কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থা প্রচলন থাকলেও বহুমাত্রিক কারণে গর্ভধারণের হার এখন পর্যন্ত আশানুরূপ নয়। এই উপ-প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নতজাতের ষাঁড়ের সিমেন সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং তা মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গর্ভধারণের হার বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেই সংঙ্গে লিঙ্গ নির্ধারণী (Pre-sexed) শুক্রাণু প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

উন্নত দেশগুলো নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও তা মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রাণি সম্পদের আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে গাভীর ভ্রুণ উৎপাদন ও প্রতিস্থাপন প্রযুক্তিটি বাংলাদেশে অনুপস্থিত ছিল। এই উপ-প্রকল্প উক্ত প্রযুক্তিদ্বয় অর্জনে ও দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উন্নত জাতের গাভী ও দেশীয় ভেড়ী হতে ভ্রুণ উৎপাদন, ভ্রুণগুলোকে মাঠ পর্যায়ে গাভী ও ভেড়ীতে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে সংরক্ষণ (Vitrification) এবং উন্নতজাতের ষাঁড় হতে উচ্চমানসম্পন্ন লিঙ্গ নির্ধারণী শুক্রাণু উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে চলমান প্রকল্পটি অগ্রসর হচ্ছে।

একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজনন কৌশল তৈরীর জন্য বিজ্ঞানী, ব্রিডার ও সমাজ তথা খামারীদের যৌথ প্রয়াস আবশ্যক। সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রাণী প্রজনন সহায়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষকের চাহিদা পূরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নে গুরত্বপূর্ন অবদান রাখা জরুরী।

গবেষকরা জানান, ইতোমধ্যে ১১টি ভেড়ীতে ২২টি হিমায়িত ভ্রুণ এবং ৪টি গাভীতে ৮টি হিমায়িত ভ্রুণ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হিমায়িতভ্রুণ প্রতিস্থাপিত ১১টি ভেড়ীর মধ্যে গত ০২ মে ১৭ তারিখ মঙ্গলবার রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে একটি ভেড়ী ২টি শাবক প্রসব করেছে, যার মধ্যে একটি ভেড়া (বাউভি উৎসা) ও ১টি ভেড়ী (বাউভি আশা) শাবক; উল্লেখ্য যে, উক্ত ভেড়ীতে ২টিই হিমায়িত ভ্রুণ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। ভেড়ীতে হিমায়িত ভ্রুণের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব বাংলাদেশে এটিই প্রথম। এছাড়াও এরই মধ্যে গরুর ভ্রুণ প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্ভব হয়েছে। এ থেকে শিগগিরই সুস্থ এবং মানসম্মত বাছুর পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তত্ত্বাবধানে ময়মনসিংহের বিভিন্ন বাণিজ্যিক খামারেও এ গবেষণা চলছে। এ পদ্ধতিতে মাত্র ২৫০-৩০০ টাকায় ভ্রুণ প্রতিস্থাপন সম্ভব হবে যা দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে নবদিগন্তের সূচনা করবে।

উন্নত মাতৃদেহে ওভুলেশনের পর তা দেশী জাতের গরু ও ভেড়াতে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে শতভাগ উন্নতজাতের বাছুর পাওয়া সম্ভব। এছাড়া একজন মাংস উৎপাদনকারী খামারী অধিক মুনাফার জন্য ষাঁড় গরু পছন্দ করে থাকেন। এক্ষেত্রে এ ভ্রুণ প্রতিস্থাপনের সময় ষাঁড় বাছুর উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একইভাবে দুধ উৎপাদনকারী খামারীর জন্য বকনা বাছুর নিশ্চিতেরও সুযোগ রয়েছে এ পদ্ধতিতে। এছাড়াও দেশের কৃত্রিম প্রজননে সফলতা খুব কম হয়। ফলে খামারীদের লালনপালন ব্যয়ও বেড়ে যায়। খামারিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন। এ পদ্ধতিতে গরু বা ভেড়া গরম হওয়ার সাত দিন পর ভ্রুণ প্রতিস্থাপন করে খামারীদের এ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে দেশে উন্নতজাতের বীজ উৎপাদনকারী প্রাণি আমদানি ব্যয়ও কমবে।

প্রকল্পের এসপিএম প্রফেসর ড. নাছরীন সুলতানা জুয়েনা জানান, সাধারণ নিয়মে প্রতিটি ভেড়ী বছরে সর্বোচ্চ ৪টি এবং গাভী বছরে ১টির মতো বাচ্চা প্রসব করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় একটি নির্বাচিত উন্নত জাতের ভেড়ী ও গাভী থেকে সুপার ওভুলেশনের মাধ্যমে বছরে ২৫ থেকে ৩০টি উচ্চগুনসম্পন্ন ভ্রুণ উৎপাদন করা সম্ভব এবং যার মাধ্যমে প্রথমবারেই ভ্রুন প্রতিস্থাপন করে সাধারণ জাতের ভেড়ী ও গাভী হতে উন্নত জাতের শাবক ও বাছুর উৎপাদন করা যেতে পারে। এতে করে একজন খামারী অতি অল্পসময়ে গবাদিপ্রাণির জাত উন্নয়ন করতে পারবেন।

তিনি আরও জানান, প্রকল্পের অর্থায়নে রিসার্চ অ্যানিমেল ফার্ম প্রতিষ্ঠা করে উন্নত জাতের গাভী, ষাঁড়, ভেড়ার সিমেন সংগ্রহ করে গবেষণা করা হচ্ছে। ভ্রুণ প্রতিস্থাপনের ফলে গরু অথবা ভেড়ার বাচ্চা উৎপাদন এবং এর দুধ, মাংস ও চামড়ায় বিপ্লব ঘটবে। এতে আর্থিকভাবে কয়েকগুণ বেশি লাভবান হবেন দরিদ্র চাষি ও মাঠ পর্যায়ের পালনকারীসহ বাণিজ্যিক খামারিরা।

প্রকল্পের ডিএসপিএম প্রফেসর ড. ফরিদা ইয়াসমিন বারী বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো এখানে গবাদিপ্রাণির ভ্রুণ সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে কৃষকরা প্রয়োজনমতো ভ্রুণ সংগ্রহ করে তা প্রতিস্থাপন করে গবাদি প্রাণির মানসম্মত প্রজনন নিশ্চিত করতে পারবেন। এছাড়া বাকৃবি’র ভেটেরিনারি অনুষদের সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগে স্থায়ী সিমেন ও ভ্রুণব্যাংক তৈরী করা হবে বলে জানান।

প্রকল্পের পিএইচডি ফেলো মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার আশা প্রকাশ করে বলেন, উদ্ভাবিত হিমায়িত ভ্রুণ স্থানান্তর প্রযুক্তি গবাদি প্রাণির খামারে প্রয়োগের মাধ্যমে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখা সম্ভব হবে।

লেখকঃ

বাকৃবি প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ।

মোবাইল ০১৭৩ ৭৭২১৬০৩।

শাহজালাল হল, ২৩০/ই।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare