বাকৃবি গবেষকের সাফল্য মৎস্য চাষের নতুন পদ্ধতি “মাছ ও সব্জির সমন্বিত চাষ”

বর্তমানে বাজারে প্রাপ্ত অধিকাংশ তাজা শাক-সব্জি দেখা যায় উচ্চ মাত্রায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়। এসব ব্যয় বহুল হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মারাতœক স্বাস্থ্যহানী ঘটছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে কিভাবে সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে একই সাথে মাছ ও সব্জির চাষ করতে পারে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একোয়াকালচার বিভাগের প্রফেসর ড. এম এ সালাম। সম্প্রতি তিনি তাঁর গবেষণায় প্রাপ্ত সফলতার কথা জানিয়েছেন সাংবাদিকদের।

জানা যায়, বাড়ির ছাদে কিংবা আঙিনায় সমন্বিত এই পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ করতে কোন প্রকার রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। ফলে উৎপাদিত মাছ ও সবজি খুবই স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়া এই পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই উলম্ব (ভারটিকাল) পদ্ধতিতে সম্ভব হবে সবজি চাষ। সমন্বিত মাছ ও সবজি চাষের এই পদ্ধতিকে বলা হয় একোয়াপনিক্স (অয়ঁধঢ়ড়হরপং)।

সমন্বিত মাছ ও সব্জি চাষের উদ্ভাবন সম্পর্কে গবেষক ড. এম এ সালাম বলেন, ‘বর্তমানে ফসলে রোগবালাই প্রতিরোধে কীটনাশক, উৎপাদন বৃদ্ধিতে রাসায়নিক সার এবং দ্রুতবর্ধনশীল এন্টিবায়োটিক্সের প্রয়োগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন চাষীরা। যার ফলে মানুষের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিশেষ করে শহরে বসবাসকারী মানুষেরাই এ ঝুঁকির শিকার হচ্ছেন বেশী। এমতাবস্থায় বাড়ির ছাদে অথবা আঙ্গিনায় ট্যাঙ্কে মাছ চাষ করে এবং ট্যাঙ্কে ব্যবহৃত সেই পানি ব্যবহার করে কোন প্রকার রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে শাক-সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়া এই পদ্ধতি খরা ও উপকূলীয় লবনাক্ত অঞ্চলের জন্য  খুবই উপযোগী কারণ এতে প্রায় ৯৭ শতাংশ পানি কম লাগে।’

সমন্বিত এই পদ্ধতি সমন্ধে ড. সালাম আরো বলেন, ‘ বাড়ীর আঙিনা বা বাসার ছাদের  আয়তনের উপর নির্ভর যেকোন আকারের প্লাস্টিক ট্যাঙ্ক অথবা ড্রামের মধ্যে পানি দিয়ে সেখানে তেলাপিয়া, মাগুর, কই, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন দেশীয় জাতের মাছ চাষ করা যায়। সবজি চাষের জন্য একটি কাঠের আলনা তৈরী করে তাতে তিন সারিতে উল্টো করে একটির নিচে আরেকটি দুইপাশে কাটা প্লাস্টিকের বোতল বসিয়ে তাতে নুড়ি পাথর দিয়ে সবজির চারা লাগাতে হবে। এবার মাছের ট্যাঙ্কের পানি বালতি করে উপরে তুলে সেখান থেকে সাইফোন প্রক্রিয়ায় ফোটাফোটা করে উপরের ওই চারা লাগানো বোতলে সরবরাহ করতে হবে। এই পানি পর্যায়ক্রমে উপর থেকে নিচে আরও দুটি বোতলের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে একটি পাত্রে এসে জমা হয় যা পুণরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে মাছের ট্যাঙ্কের অ্যামোনিয়া  সমৃদ্ধ পানি গাছের শিকড়ে অবস্থিত ডি-নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া ভেঙ্গে গাছের খাদ্য উপযোগী নাইট্রেটে পরিণত করে পানিকে দূষণ মুক্ত করে এবং ওই পানিকে পুণরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী শাকসবজি চাষ করা যায়। তবে টমেটো, শসা, করোল্লা, শিম, ব্রকলি, পুদিনা, বেগুন, দেশী লেটুসসহ আমেরিকান লেটুস ফলন বেশ ভাল হয়।’

 

তিনি আরো বলেন, ‘এই পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য বাড়তি কোন প্রকার সার বা মাটির প্রয়োজন না পড়লেও মাছকে আলাদা খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। বাজার থেকে কিনে মাছকে যাতে খাদ্য দিতে না হয়, সেজন্য আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কালো সৈনিক নামের একটি পোকার লার্ভা মাছের প্রিয় খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এটি মাছের খুবই প্রিয় খাবার। এতে রয়েছে প্রোটিন, লিপিড এবং বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবন রয়েছে যা মাছের দ্রুত বর্ধনে সাহায্য করে।’

নতুন এই প্রযুক্তির ভবিষ্যত সম্পর্কে ড. সালাম বলেন, দেশের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা বা ছাদে এই পদ্ধতিতে টাটকা সবজি ও মাছ উৎপাদন করে পারিবারিক প্রোটিনের চাহিদা মিটিয়ে বাজার নির্ভরতা কমানো সম্ভব। তাছাড়া খরচ ও জায়গা কম লাগায় এই পদ্ধতির মাধ্যমে আর্থিকভাবেও লাভবান হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

লেখকঃ মোহা. ইউসুফ আলী

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ- ২২০২

মোবাইলঃ ০১৭২১৫১২৫৪০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare