বাড়ছে হাইব্রিড সবজির চাহিদা

ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া *

সবজি মানুষের নিত্য দিনের খাদ্যের আবশ্যিক অনুসঙ্গ। সবজিজাত খাদ্য থেকে পাওয়া যায় দেহের অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন, খনিজ দ্রব্য আর আঁশ। রঙিন সবজি দেহের এন্টিঅক্সিডেন্টের অন্যতম উৎসও। ফলে দেহের জন্য সবজির গুরুত্ব কতটা তা সহজেয় অনুমেয়। সে কারণে দেহ সুস্থ ও সবল রাখার জন্য প্রতিদিন গড়ে একজন মানুষকে ২২০ গ্রাম সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। সে তুলনায় আমরা প্রতিদিন গড়ে গ্রহণ করছি ১৬৬ গ্রাম।

সবজির জাত আসলে দুই রকম। এক রকমের সবজির জাতকে বলা হয় ওপি (ঙ.চ) জাত। ও.পি. শব্দটি এসেছে ঙঢ়বহ চড়ষষরহধঃবফ শব্দ দু’টির আদ্যক্ষর থেকে। উদ্ভিদকূলের মধ্যে অবাধ পরাগায়ন ঘটার সুযোগ ও.পি. জাতে রয়েছে। বিশেষত পর-পরাগী জাতের অনিয়ন্ত্রিত পরাগায়ন করতে সক্ষম জাতকে ও.পি. জাত বলা হয়। হাইব্রিড জাত বাদ দিলে সনাতন পদ্ধতিতে সবজির যেসব জাত আমাদের কৃষকগণ বাছাই করে নিয়েছে সেগুলো সবই ও.পি. জাত। আবার বিজ্ঞানীরাও কোন পর-পরাগী সবজির কৌলি সম্পদ সংগ্রহ করে তা থেকে একটি জাত উত্তম বলে বিবেচিত হলে এর বীজ বর্ধন করে যে জাত উদ্ভাবন করে নেন সেগুলো ও.পি. জাতেরই অন্তর্ভূক্ত। এদের ফলনশীলতা মুক্ত পরাগী স্বভাবের কারণেই খুব বেশি নয়। কোন গাছের ফুলের গর্ভমু-ে কোন গাছের ফুলের পরাগরেণু এসে যুক্ত হচ্ছে এর কোন হিসেব রাখার কোন উপায় এখানে নেই। ভাল বা মন্দ যে কোন গাছের সাথে এখানে ঘটে যেতে পারে পরাগায়ন। ফলে এভাবে তৈরি হওয়া বীজ দিয়ে সবজির আবাদ করে কাঙ্খিত সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মুক্ত পরাগী জাতে পরাগরেণু উড়ে যেতে পারে বহু দূর পর্যন্ত। আর কীট পরাগী কোন কোন ফসলে পরাগরেণু কীটপতঙ্গ বয়ে নিতে পারে ৫০০-৭০০ মিটার পর্যন্ত। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ১৩০০-১৪০০ মিটার পর্যন্ত। কাজেই ওপি জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা এবং এদের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হয় না এ কারণেই। এজন্যই মানুষের কাছে হাইব্রিড সবজি ক্রমশ গ্রহণ যোগ্য হয়ে উঠছে।

 

অন্য আরেক রকম জাত রয়েছে সবজির। দু’টি নির্দিষ্ট এবং পরীক্ষিত জিনগতভাবে ভিন্ন রকম পেরেন্টের মধ্যে সংকরায়ন সম্পন্ন করে প্রাপ্ত ঋ১ বীজ বাণিজ্যিক আবাদের জন্য বাজারজাত করলে একে হাইব্রিড জাত বলা হয়। এসব জাতের বীজ ফসল ফলাবার জন্য কেবল একবারই ব্যবহার করা হয়। কোন হাইব্রিড জাত সফল বলে বিবেচিত হলে প্রতি বছরই এর বীজ কিনে নিতে হয়। চাষীরা তা কিনে নিতে আগ্রহীও। কারণ নির্দিষ্ট হাইব্রিড জাতের সবজি হুবহু প্রতিবছর একই রকম ফলন দেয় যদি প্রতি বছর ঐ নির্দিষ্ট হাইব্রিড জাতটির বীজ ব্যবহার করা হয়। এরকম হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন এবং হাইব্রিড জাতের বীজের ব্যবহার পৃথিবীর বহু দেশে সম্ভবপর হয়েছে। আমাদের দেশে নিজস্ব হাইব্রিড জাতের সংখ্যা এত কম যে সে সুযোগ নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাইভেট বীজ কোম্পানীর মাধ্যমে এদেশে প্রবেশ করেছে বহু সবজি ফসলের হাইব্রিড বীজ। মানুষ দাম দিয়ে সেসব সবজির বীজ ক্রয় করছে। সবজিতে হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য সব ফসলে আসলে এক রকম নয়। ফসল ভেদে হাইব্রিড জাতের ভিন্ন ভিন্ন রকম সুবিধা রয়েছে যা আমাদের জানা দরকার সবজি উৎপাদনের নানাবিধ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই। সন্দেহ নেই সবজিতে হাইব্রিড জাত ব্যবহারের একটি কারণ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। সবজি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণও একাধিক। সবজি ভেদে ফলের ওজন, কন্দ বা ব্যবহার্য অংশের ওজন ইত্যাদি বৃদ্ধি পাবার কারণে ফলন বৃদ্ধি পেতে পারে। অথবা ফলন বাড়তে পারে গাছে ফলের, কন্দের বা অন্যান্য ব্যবহার্য অংশের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে। কখনো ফলন বাড়তে পারে ওজন এবং সংখ্যা দু’টিই বৃদ্ধি পাবার কারণেই।

কোন কোন সবজির হাইব্রিড জাত ভারী আগাম বলে সহজেই তা কৃষকের নজর কেড়ে নেয়। আগাম সবজির বাজারে দামই আলাদা। রোগ জীবাণু সহিষ্ণুতার কারণেও কোন কোন সবজিতে হাইব্রিড জাতের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্য কোন ক্ষেত্রে আবার কীট প্রতিরোধী জাত বড় আকর্ষণীয়। হাইব্রিড জাতের ফলের নির্দিষ্ট আকার বা আকৃতিও মানুষের বেশ কাম্য। ফলে এ থেকে বোঝা যাচেছ যে, সবজিতে হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদনের লক্ষ্য সবজি ভেদে একেক রকম।

নানা রকম কোম্পানীর বিদেশ থেকে বীজ আমদানির সুবাদে প্রতিটি সবজি ফসলেই একাধিক জাত রয়েছে বাজারে এখন। সবজিতে নানা রকম হাইব্রিডের সমাহার ঘটছে এদেশে সবজি বীজ আমদানির অবাধ সুযোগ থাকার ফলে। এতে ভালো হয়েছে এই যে, নানা রকম সবজি জাত বাজারে আসায় উত্তম জাত বাছাই করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য এর মন্দ দিকও কিছু রয়েছে। ফটকা ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে নি¤œ মানের হাইব্রিড বীজ বাজারজাত করে স্বল্প মেয়াদে কিছু পয়সা হাতিয়ে নিতে পারে। তবে নিয়মিত বীজ ব্যবসার সাথে জড়িত কোম্পানীগুলো যথাসম্ভব উত্তম জাত বাজারজাত করে দীর্ঘ মেয়াদে বীজ ব্যবসা করতে আগ্রহী বিধায় ভালো জাত পাবার সম্ভাবনাই অধিক। প্রতিযোগীতামূলক বাজারে উত্তম জাত ছাড়া বীজ ব্যবসায় টিকে থাকার সুযোগ যেমন নেই তেমনি দীর্ঘ মেয়াদে মুনাফা অর্জনও সম্ভব নয়।

বাজারে এখন বহু সবজির হাইব্রিড বীজ পাওয়া যাচ্ছে। এসব সবজির মধ্যে অন্যতম হলো কুমড়া পরিবারের সবজিগুলো। শসা, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, লাউ, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, তরমুজ, টমেটো, মরিচ, বেগুন এসব ফসলে একটি ফলে অনেকগুলো বীজ তৈরি হয় বলে সংকরায়ন করে সহজেই অনেক হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করা যায়। সে কারণেই এদের হাইব্রিড জাতের সংখ্যাও বাজারে অনেক। আকার, আকৃতি, সংখ্যা এমনিতর নানা দিক থেকেই একটি জাত অন্যটি থেকে ভিন্ন রকম। ফলে বহুরকম হাইব্রিড জাত থেকে নিজস্ব চাহিদা মাফিক হাইব্রিড জাত বাছাই কুমড়া পরিবারের ফসলে সহজেই করা যায়। ঢেঁড়স, করলা এসব সবজি ফসলেও আজকাল হাইব্রিড জাত বেশ সুলভ। বেগুন পরিবারের সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন আর মরিচেরও বেশ কিছু হাইব্রিড জাত রয়েছে। স্ব-পরাগী প্রধান এসব সবজির এক একটি ফুল সংকরায়ন করে একটি ফলে পাওয়া যায় কয়েক শত পর্যন্ত বীজ। ফলে হস্ত পুংহীনকরণ আর হস্ত পরাগায়ন করে পাওয়া হাইব্রিড জাত এই তিনটি সবজিতে বেশ সুলভ। টমেটো আর মরিচের বহু ভিন্ন ভিন্ন রকম হাইব্রিড জাত এখন বাজারে রয়েছে। মরিচেরতো হাইব্রিড জাতগুলোর মধ্যে ভিন্নতা দেখে অবাক হতে হয়। কোন কোন জাতে মরিচের ঘনত্ব আর বিন্যাস সত্যিই অবাক হবার মতো। হাইব্রিড জাত পাওয়া যাচ্ছে এখন অবশ্য ফুল কপি, বাঁধা কপি এসব ফসলেও। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বহু ভিন্ন ভিন্ন রকমের হাইব্রিড জাত রয়েছে এ দু’টি সবজিতে। আকার-আকৃতি আর আশু-নাবি প্রকৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ হাইব্রিড জাত রয়েছে এদের। বাজারে এখন হাইব্রিড সবজির বেশ দেখা মেলে। অনেকে দেশি জাতের সবজিকে প্রাধান্য দেওয়ায় হাইব্রিড সবজির প্রতি কেমন একটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। এমনকি দামও কম হয় বাজারে কোন কোন হাইব্রিড জাতের এই অজুহাতে যে, এদের স্বাদ দেশি জাতের চেয়ে কম। অথচ বেশ চমৎকার হাইব্রিড শসার আকার আকৃতি। হাইব্রিড টমেটোর মাংসল অথচ শক্ত সামর্থ গঠন কাঠামো বেশ কাঙ্খিত মানুষের। হাইব্রিড তরমুজেরতো বীজহীনতার কারণে স্বাদই আলাদা। জাপানের হাইব্রিড বাঙ্গির কদরই অন্য রকম। হাইব্রিড ফুলকপির বুনট শক্ত, আকৃতি মাঝারি, ভারী সুন্দর এদের বর্ণ। দিন দিন নানা গুণের কারণেই হাইব্রিড সবজি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

হাইব্রিড সবজির বীজ উৎপাদন ধানের হাইব্রিড বীজের তুলনায় বেশ সহজ। কুমড়া পরিবারের সবজিতে পুরুষ ও স্ত্রী ফুলের বিন্যাসই হাইব্রিড তৈরির কৌশলটাকে সহজ করে তুলেছে। কখনো শুধু কাঙ্খিত পুরুষ গাছের পরাগরেণু মৌমাছি দ্বারা স্ত্রী গাছের স্ত্রী ফুলে এসে সংস্থাপিত হলেই পাওয়া যায় হাইব্রিড বীজ। কখনো আবার স্ত্রী গাছের পুরুষ ফুল কর্তন করে দিয়ে রেখে দেওয়া হয় কীটপতঙ্গ পুরুষ ফুলের পরাগরেণু এনে ছুঁইয়ে দেবে গর্ভমু- সে আশায়। আমাদের দেশে সবজি গবেষণায় প্রজননবিদদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে দেবার সুযোগ না থাকায় হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনের কাজ ভীষণ রকম পিছিয়ে পড়েছে। ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা সবজির উপরই আমাদের যত নির্ভরতা, সে তুলনায় প্রাইভেট বীজ কোম্পানীর কোন কোনটার সাফল্য নজর কাড়া। চাহিদার নিরিখে তাদের বীজ উৎপাদন করতে হয় বলে হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন তাদের জন্য বেশ জরুরী। প্রাইভেট বীজ কোম্পানীর হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনের একটি বাড়তি সুবিধাও রয়েছে। এই জাতের বীজ প্রতি বছর কৃষককে কিনতে হয় কাক্ষিত ফলন ও গুণমান রক্ষার স্বার্থেই। প্রাইভেট কোম্পানীর প্রজননবিদগণ সহজেই হাইব্রিড জাতের মধ্য দিয়ে রক্ষা করতে পারে তাদের জাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ। অন্য বীজ কোম্পানী হুবহু তাদের জাতের মত জাত উদ্ভাবন করতে পারে না ঐ জাতের নির্দিষ্ট পেরেন্ট দু’টি তাদের স্ব স্ব প্রজননবিদদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে।

বাংলাদেশে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সবজি বীজের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বীজ। এসব আমদানিকৃত বীজের অধিকাংশই আসলে হাইব্রিড সবজি বীজ। পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে সবজি বীজ আমদানি করে আমাদের প্রাইভেট বীজ কোম্পানীগুলো। প্রধানত যেসব দেশ থেকে এসব বীজ আমদানি করা হয় সে দেশগুলো হলো- থাইল্যা-, ভারত, চীন, কোরিয়া, জাপান, ইটালি এবং অস্ট্রেলিয়া। তরমুজ, ফুলকপি এবং বাঁধাকপির শতকরা ১০০ ভাগ বীজই বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। মূলার ক্ষেত্রে শতকরা ৪০ ভাগ বীজ বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। টমেটো, বেগুন, মরিচ এদেরও কিছু বীজ আসে বাইরে থেকে। কুমড়া জাতীয় ফসলগুলোর মধ্যে শসা, চিচিঙ্গার কিছু বীজও আসে বাইরে থেকে। এসব সবজির অধিকাংশই আসলে হাইব্রিড প্রকৃতির।

হাইব্রিড জাতের ফসল নিয়ে কোন কোন মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। হতে পারে কোন কোন হাইব্রিড সবজি আমাদের চেনাজানা সবজির চেয়ে স্বাদ কিছুটা কম। আবার এটাও হতে পারে এসব অনেক হাইব্রিড সবজি আমরা খেতে অভ্যস্ত নই বলে এগুলো কম স্বাদ লাগে। তবে হাইব্রিড ফসল বা সব হাইব্রিড জাতের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ টেকার কথা নয় এ কারণে যে, হাইব্রিড ফুলকপি, হাইব্রিড তরমুজ এসব ওপি জাত অপেক্ষা শ্রেয়তর। হাইব্রিড বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়া একটি বীজ উৎপাদন বিশেষ কৌশল মাত্র, এটি কোনভাবেই ক্ষতিকারক কোন প্রক্রিয়া নয়। ফলে ঢালাও ভাবে হাইব্রিড সবজি অপছন্দ করার কোন কারণ নেই। নানা দিক থেকে লাভজনক বলেই হাইব্রিড সবজি মানুষর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা এ কৌশলটিকে রপ্ত করতে পারলে নিজেদের জিন সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আগামীতে নিজেদের রুচি অনুযায়ী উদ্ভাবন করতে পারবো আমাদের পছন্দের হাইব্রিড সবজি।

লেখকঃ

প্রোভিসি ও অধ্যাপক, শেরে বংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *