বিএফআরআই ফিশ ড্রায়ারে কীটনাশনকমুক্ত ও গুণগতমান সম্পন্ন শুটকি উৎপাদন

 

ড. মো. ইনামুল হক

প্রচলিত পদ্ধতিতে শুটকি তৈরির বিভিন্ন অস্থাস্থ্যকর দিকগুলি যেমন-ধুঁলা-কাঁদা, মাছি, কুকুর, ইত্যাদির সংক্রমণ ও সর্বোপরি কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া উন্নতমানের স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি তৈরির জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এর সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, কক্সবাজার কর্তৃক সার্বক্ষণিক, অর্থাৎ রাত-দিন ২৪ ঘন্টা ব্যবহার উপযোগী ড্রায়ার উদ্ভাবিত হয়েছে। সদ্য উদ্ভাবিত এই নতুন ড্রায়ারটির নাম রাখা হয়েছে ‘‘বিএফআরআই ফিশড্রায়ার’’। এই ড্রায়ারটির মাধ্যমে শুটকি তৈরির স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত গুণগত মানসম্পন্ন শুটকি মাছ তৈরি করা যায়। এই ড্রায়ারটিতে সৌরশক্তি এবং বিদ্যুৎ শক্তি, উভায়ই ব্যবহার করা যায়। ড্রায়ারে সৌর শক্তি না বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তাঁর উপর ভিত্তি করে আবার দুইটি মডেল তৈরি করা হয়েছে। এই মডেল দুইটিকে যথাক্রমে সৌর মডেল এবং বৈদ্যুতিক মডেল বলা হয়। যে স্থানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ শক্তির প্রাপ্যতা আছে সেখানে বৈদ্যুতিক মডেল আর যে স্থানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ শক্তি নাই সেখানে সৌর মডেল ব্যবহারের জন্য উপদেশ দেওয়া হয়। উভয় মডেলে, স্বচ্ছ সেলুলয়েডের ঢাকনা থাকায় বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর দিকগুলি যেমন-ধুঁলাকাঁদা, মাছি, কুকুর, ইত্যাদির সংক্রমণ ও সর্বোপরি কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া উন্নত মানের স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি তৈরি করা হয়।

বৈশিষ্ট্য

             অধিকপুষ্টি ও উন্নত গুণগতমান সম্পন্ন শুটকি উৎপাদন।

             কীটনাশক মুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি উৎপাদন।

             চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সুবিধা সম্বলিত বিভিন্ন মডেল ব্যবহার।

             গুবিধা অনুযায়ী মডেল পছন্দ করে ইচ্ছানুসারে সৌর ও বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার

             রোদ হোক আর বৃষ্টি হোক, রাত-দিন ২৪ ঘন্টা ব্যবহার।

বিএফআরআই ফিশড্রায়ারের বিভিন্ন মডেলের গঠন ও কার্যপ্রাণালী

বিএফআরআই ফিশড্রায়ারের উভয় মডেলের মূল কাঠামো কাঠের তৈরি এবং আকার ও আকৃতিতে একই। প্রথমে কাঠ দ্বারা ২.৫ ফুট প্রস্থ, ২.৫ ফুট উচ্চতা ও ০৯ ফুট দৈর্ঘের একটা আয়তাকার ড্রায়ার কাঠামো তৈরি করে ছয়টি পায়া দ্বারা মাটির এক ফুট উচুতে স্থাপন করা হয় যা দেখতে অনেকটা আয়তা কারটানেলের মত মনে হয়। নয় ফুট দৈর্ঘের দুইটি টানেল পরস্পর সংযুক্ত করে একটি ১৮ ফুট দৈর্ঘের একটা পূর্ণাঙ্গ ড্রায়ার টানেল তৈরি করা হয়। টানেলের এক মুখে দরজা ও অন্য মুখেবাতাস বের হওয়ার জন্য নেট লাগানো হয়। দরজাযুক্ত মুখে একটা কাঠের পাটাতনের উপর একটি ফ্যান ও একটি হটপেরট স্থাপনের ব্যবস্থা থাকে। মেঝেকাল রং করা হয়। ড্রায়ারের উপরে ৪৫০ ঢালু করে ঢাকনা থাকে। শুধুমাত্র নেটের প্রান্ত ছাড়া অন্যান্য সকল পাশে (ঢাকনা ও দরজাসহ) দুই স্তরে ০.২ মি.মি. পুরুত্বের স্বচ্ছ সেলুলয়েড লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ ড্রায়ার তৈরি করা হয়। অবশ্য সৌর মডেলের এক প্রান্তে একটি সোলার প্যানেল (২০/৩০ ইঞ্চি আকারের) স্থাপন করা হয়। সোলার প্যানেলের ফটো ভোল্টিক সেল সূর্যোর তাপ শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে ফ্যান চালানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু যেখানে বিদ্যুৎ আছে সেখানে এই কাজের জন্য সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করাই শ্রেয়। উভয় মডেলে, স্বচ্ছ সেলুলয়েডের মধ্য দিয়ে সূর্য কিরণ ভিতরে প্রবেশ করে ও কালো অংশে শোমিত হয়ে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা ড্রায়ারের ভেতরের বাতাস গরম করে। এই গরম বাতাস ফ্যানের মাধ্যমে মাছের উপর দিয়ে প্রবাহিত করে দ্রুত মাছ শুকানো হয়। স্বচ্ছ পলিথিনের ঢাক্না থাকায় বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর দিকগুলি যেমন-ধুঁলা-কাঁদা, মাছি, কুকুর, ইত্যাদি সংক্রমণ ও সর্বোপরি কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া উন্নতমানের স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি তৈরি করা হয়।

বিএফআরআই ফিশ ড্রায়ারে শুটকি তৈরির কার্য প্রণালী

বিদেশে রপ্তানির জন্যই হোক আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের সচেতন ও সামর্থ্যবান ক্রেতাদের জন্যই হোক, বিএফআরআই ফিশ ড্রায়ার ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত ও গুণগতমান সম্পন্ন অনুসরণ করা উচিতঃ

             সাধারণভাবে খাওয়ার উপযোগী টাটকা মাছ জোগাড় করে (কোন অবস্থাতেই অতিরিক্ত পঁচা মাছ ব্যবহার করা যাবেনা) পরিস্কার পানি দ্বারা ধুয়ে চকচকে করা।

             মাছগুলিতে প্রথমে প্রজাতি ভেদে বাছাই করা ও পরে একই প্রজাতির মধ্য থেকে আকার ও জৈবিক অবস্থা (ডিম/চর্বির পরিমাণ) ভেদে বাছাই করা। বেশী চর্বি/ডিমযুক্ত মাছ শুটকি করার জন্য উপযুক্ত নয়।

             প্রজাতি ও আকার ভেদে এবং ক্রেতার চাহিদানুসারে মাছের নাড়ি-ভুঁড়ি বের করা, আইশ ফেলা ও স্লাইস করে আংশিক কেটে ড্রেসিং করে নেওয়া। যেমন, ছুড়ি মাছের পেটে অন্য মাছ থাকলে পেট কেটে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করা জরুরী কিন্তু রূপচান্দার ক্ষেত্রে পেটকাটা জরুরী নয় কিন্তু জরুরী স্লাইস করা জরুরী।

             ড্রেসিং করা মাছগুলি থেকে অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে নিয়ে বড়শীর সাহায্যে মাথা উপরের দিকে দিয়ে কাঠের আড়াতে সারিবদ্ধভাবে ড্রায়ারের নির্দিষ্ট স্থানে ঝুলিয়ে দিতে হবে (চিত্র ১)। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন একটি মাছ থেকে আর একটি মাছ কিছুটা ফাঁকা থাকে ও সহজে সব মাছের উপর দিয়ে বাতাস চলা চল করতে পারে। একটি ড্রায়ারে সর্বোচ্চ ৫০ কেজি কাঁচা মাছ শুকানোর জন্য দেওয়া যেতে পারে।

             মাছ দেয়া শেষ হলে, ড্রায়ারের মাঝামাঝি স্থানে একটি ইম্যাক্সিমাম-মিনিমাম থার্মোমিটার ঝুলিয়ে দিয়ে তাপমাত্রা দেখে নিতে হবে। পরে ঢাকনাটি বন্ধ করে দরজা খুলে ফ্যান চালু করতে হবে। তারপর তাপমাত্রা ও রোদের উপস্থিতি/ অনুপস্থিতির উপর ভিত্তিক রেহট-প্লেট ও তাপ মাত্রা ঠিক করতে হবে।

             কয়েক ঘন্টা পর পর তাপমাত্রা তদারকী করে হট-প্লেট বন্ধ চালু করতে হবে, সাথে সাথে হট-প্লেটের লেভেল সেটিং প্রয়োজনে পরিবর্তন করে তাপমাত্রা যাতে ৪৫-৫৫০ সে. থাকে সেই ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে

             একদিন অতিবাহিত হওয়ার পর প্রয়োজনে ফ্যান/হট-প্লেটের কাছের মাছগুলিতে পিছনের দিকে এবং পিছনের মাছগুলিতে সামনের দিকে দিয়ে শুকানোর সমতা আনা যেতে পারে।

             এইভাবে একাধারে তিনদিন শুকানোর পরে শুকনা মাছের ওজন যখন ১২-১৩ কেজির (অর্থাৎ প্রতি ০৪ কেজি কাঁচা মাছ (রূপচান্দা ও ছুড়ি মাছ) শুকিয়ে ০১ কেজি শুটকি হবে তখন শুটকি প্যাকেট করার উপযুক্ত হবে এবং শুটকি ড্রায়ার থেকে নামিয়ে নিতে হবে।

             ড্রায়ার থেকে নামিয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যে আধা কেজি বা এক কেজি আকারের প্যাকেট করে রাখতে হবে। প্যাকেট করে অল্প দিন সংরক্ষণের জন্য স্বচ্ছ পলিথিন, মাঝারি মেয়াদি সংরক্ষণের জন্য স্বচ্ছ সেলুলয়েড ও দীর্ঘ মেয়াদি সংরক্ষণের জন্য স্বচ্ছ প্লাষ্টিকের বৈয়ম ব্যবহার করা যেতে পারে। সবশেষে, লেবেল লাগিয়ে বাজারজাত/ গুদামজাত করা যেতে পারে।

উপসংহার

প্রচলিত পদ্ধতিতে শুটকি তৈরির অস্বাস্থ্যকর দিকগুলি যেমন-ধুঁলা-কাঁদা, মাছি, কুকুর, ইত্যাদির সংক্রমণ ও সর্বোপরি কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া উন্নতমানের স্বাস্থ্যসম্মত ও গুণগতমানসম্পন্ন শুটকি তৈরি করার জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ড্রায়ার প্রযুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকর। তবে, এ প্রযুক্তি টি শুটকি উৎপাদনে ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বেশী উপযোগী। এ প্রযুক্তির মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইতি মধ্যেই কিছু প্রশিক্ষণ কর্মসূচী পরিচালনা করা হয়েছে। প্রযুক্তিটি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে পারলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরিণ ও রপ্তানি বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসম্মত ও গুণগতমান সম্পন্ন শুটকি তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *