বিনা ধান-১৪: নাবীতে চাষযোগ্য বোরো ধানের নতুন জাত

 

ড. এম. মনজুরুল আলম মন্ডল*

 

বিনাধান-১৪ নাবী বোরো মৌসুমের চাষাবাদের উপযোগী নতুন একাটি জাত যা পরমাণু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছে।

জাতটির বৈশিষ্ট্য হলোঃ এটি উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত গুণাগুণ সম্পন্ন নাবি রোপনোপযোগী ও উচ্চ তাপমাত্রা সহিষ্ণু বোরো ধানের জাত। গাছ খাট ও শক্ত বলে হেলে পড়ে না । পূর্ণ বয়স্ক গাছের উচ্চতা ৯০-১০০ সেঃমিঃ। পাতা গাঢ় সবুজ, লম্বা ও চওড়া। ডিগ পাতা খাড়া। ছড়া ২৪ সেঃ মিঃ লম্বা ও গড়ে ১১৫-১৩০ টি ধান ধরে। এটি আগাম পাকে, জীবনকাল- বোরো মৌসুমে ১২০-১৩০ দিন এবং আমন মৌসুমে ১০০ দিন। আমন মৌসুমে আগে লাগালেও চিটা হয় না। যথোপযুক্ত পরিচর্যায় বোরো মৌসুমে হেক্টর প্রতি ৬.৫-৭.০ টন (একরে ৬০-৭০ মন) এবং আমন মৌসুমে ৫.০-৫.৩ টন ফলন দেয়। চাউলে আমিষের পরিমাণ ১০%। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয় এবং দীর্ঘক্ষণ রাখলে নষ্ট হয় না। জাতটি বিভিন্ন রোগ যথা  পাতা পোড়া, খোল পঁচা ও কান্ড পঁচা ইত্যাদি রোগ তুলনামূলকভাবে বেশী প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া এই জাতটির প্রায় সব ধরণের পোকার আক্রমণ, বিশেষ করে বাদামী গাছ ফড়িং, গলমাছি ও পামরী পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশী। বিনাধান-১৪ বোরো মৌসুমের জন্য আনুমোদিত হলেও জাতটি প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায় অর্থাৎ আউস ও আমন মৌসুমে চাষ করা যায়।

 

বিশেষ গুণ: নাবী বোরো মৌসুমে চাষযোগ্য। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ হতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রোপণ করা যায়। ফলে শীতকালীন ফসল যেমন সরিষা, আলু, মসুর ইত্যাদি চাষ করার পর এ জাতটি লাগানো যায়। ফলে বোরো চাষের আওতায় মোট জমির অর্ধেক জমিতে অর্থাৎ প্রায় ২০ লক্ষ হেক্টর জমিতে সরিষা, আলু আবাদ করা সম্ভব। ফলে ২০ লক্ষ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করে প্রায় ১৪ লক্ষ টন ভোজ্য তেল পাওয়া যাবে যা চাহিদা মেটাবে। ফলে বিদেশ থেকে ভোজ্য তেল আমদানির প্রয়োজন হবে না।

যে শস্য পর্যায়ের জন্য এ জাতটি উপযুক্ত: (ক) আগাম রোপা আমন – সরিষা – বোরো, (খ) আগাম রোপা আমন – আল ু- বোরো এবং (গ) আগাম রোপা আমন- মসুর/মটরশুটি – বোরো

 

আঞ্চলিক উপযোগীতা: লবণাক্ত এলাকা ছাড়া দেশের প্রায় সকল উচুঁ ও মধ্যম উচুঁ জমিতে বিশেষ করে বৃহত্তম রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল, যশোহর, ঢাকা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে জাতটির অধিক ফলন পাওয়া যায়।

 

চাষাবাদ পদ্ধতি: জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী বোরো জাতের মতই। তবে এর জীবনকাল কম বিধায় ভাল ফলন পেতে হলে চারার বয়স ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিম্নে জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি দেয়া হ’ল :

বীজ হার, বীজ বাছাই ও শোধন: প্রতি হেক্টর জমি চাষের জন্য ২৫-৩০ কেজি বা একর প্রতি ১০-১২ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। ভারী, পুষ্ট ও রোগবালাই মুক্ত বীজ বাছাই করুন এবং বপনের আগে বীজ শোধন করা ভাল।

 

বীজতলা তৈরী: বোরো মৌসুমে অঞ্চল ভেদে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এবং আমন মৌসুমে জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলায় বীজ ফেলতে হবে। পাঁচ শতাংশ (২০০ বর্গ মিটার) পরিমাণ বীজতলায় ১০ কেজি বীজ ফেলা যায়।

 

বিশেষ সর্তকতাঃ এ জাতটি জানুয়ারি মাসের মধ্যে রোপণ করলে ধান কিছুটা ঝড়ার সম্ভাবনা থাকে বিধায় র্ফেরুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রোপণ করলে ধান ঝরে পড়ে না। চারার বয়স ও রোপণ পদ্ধতি: বোরো মৌসুমে ৩০-৪০ দিন বয়সের চারা রোপন কলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। তবে ৫০ দিনের চারা রোপণ করলেও তেমন ক্ষতি হয় না। আমন মৌসুমে ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা রোপণ কলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। বেশী বয়সের চারা লাগালে ফলন কমে যায়, তাই আমন মৌসুমের জন্য ৪ সপ্তাহের বেশী বয়সের চারা রোপন করা কোন অবস্থাতেই উচিৎ নয়। বীজতলায় চারা করার পর লাইন করে চারা রোপন করলে ফলন বেশি হয়। ২-৩ টি সুস্থ-সবল চারা একত্রে এক গুছিতে রোপণ করতে হবে। সারি হতে সারির দূরত ২০ সেঃমিঃ এবং সারিতে গুছির দূরত্ব ১৫ সেঃমিঃ থাকা ভাল।

 

 

সার প্রয়োগ মাত্রাঃ

 

 

বোরো মৌসুম

রোপণ জন্য জমি তৈরীর শেষ চাষের আগে সম্পূর্ণ টিএসপি, এমওপি এবং জিপসাম জমিতে সমভাবে ছিটিয়ে চাষের মাধ্যমে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সারের অর্ধেক পরিমাণ চারা রোপণের ৭-৮ দিন পর এবং বাকী অর্ধেক ৩০-৩৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে অথবা এক তৃতীয়াংশ চারা রোপণের ৭-৮ দিন পর, এক তৃতীয়াংশ চারা রোপণের ১৮-২০ দিন পর এবং শেষ তৃতীয়াংশ চারা রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর জমির উর্বরতার উপর নির্ভর করে প্রয়োগ করতে হবে। অনুর্বর জমিতে হেক্টর প্রতি বোরাক্স ২-৩ কেজি (একর প্রতি ১ কেজি) এবং দস্তা সার ৪-৫ কেজি (একর প্রতি ২ কেজি) হারে দেয়া যেতে পারে। ইউরিয়া সার প্রয়োগের ২/১ দিন আগে জমির অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আগাছা দমন করতে হবে। জমির উর্বরতা ও ফসলের অবস্থায় উপর নির্ভর করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ মাত্রার তারতম্য করা যেতে পারে।

 

পরিচর্যা: এই জাতের ধানের পরিচর্যা অন্যান্য উফশী জাতের মতই। হবে এর জীবনকাল কম বিধায় চারা রোপণের পর আগাছা দেখা দিলে দ্রুত নিড়ানী যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিস্কার ও মাটি নরম করতে হবে। বর্ষা মৌসুমের শেষে ফসল পাকার কিছু দিন পূর্বে পানির অভাব দেখা দিলে সেচের প্রয়োজন হতে পারে তবে ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি শুকিয়ে ফেলা ভাল।

 

রোগ ও পোকা- মাকড় দমন: রোগ বালাই ও কীট পতঙ্গের আক্রমণ দেখা দিলে নিকটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার উপদেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা নিলে প্রচলিত তরল বা আনাদার কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া খোলা ঝলসানো, ব্যাক্টেরিয়াল লিফব্লাইট বা পাতা ঝলসানো ও অন্যান্য রোগ দেখা দিলে উপযুক্ত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। খোল ঝলসানো, কান্ড পচাঁ রোগ দেখা দিলে বেনলেট, হোমাই, বেভিষ্টিন বা টপসিন মিথাইল মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োাগ করা যেতে পারে।

————————————–

লেখক: *প্রিন্সিপাল সায়িন্টিফিক অফিসার, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট,

ময়মনসিংহ, মোবাইলঃ ০১৭১৬৭৪৯৪২৯

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *