বিশ্ব খাদ্যদিবস- ২০১৩ স্বাস্থ্যকর ও ভেজালমুক্ত খাদ্য চাই

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ
ক্ষুদামুক্ত ও সুস্থ মানুষ দিয়ে বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এর জন্মকাল ১৯৪৫ সন থেকে ১৬ অক্টোবরকে স্মরণ করে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করছে৷ বিশ্বের সকল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে সচেতনতার মাধ্যমে সবাইকে ঐক্য করার জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহ প্রতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে৷ বাংলাদেশেও কৃষি মন্ত্রণালয়, এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্ব খাদ্যদিবস পালন করে৷ এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- Healthy People depend on healthy food system অর্থাত্‍ স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের উপর জনগণের স্বাস্থ্য নির্ভর করে৷ এই প্রতিপাদ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে- সবাই মিলে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ক্ষুধামুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা৷ এজন্য ভেজালমুক্ত, বিষমুক্ত, রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত, কৃত্রিম রঙ মুক্ত বিশুদ্ধ স্বাস্থ্যসম্মত, পুষ্টিকর খাদ্য উত্‍পাদন ও সহজলভ্য করা প্রয়োজন৷ ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খাওয়ার জন্য অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ হয়৷ পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশসমুহ বিশেষ করে বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্য, বিষাক্ত খাদ্য, রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো খাদ্য, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যে সয়লাব হয়ে গেছে৷ এজন্য এদেশের মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে৷ সুন্দর স্বাস্থ্য ও সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিকল্প নেই৷
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, সব মানুষের কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য চাহিদার বিপরীতে পছন্দমতো পর্যাপ্ত নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির বাস্তব ও আর্থিক ক্রয় ক্ষমতা থাকাই হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা৷ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জিত হয়েছে কিনা বোঝার উপায় হচ্ছে- জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ থাকবে, সময় ও অঞ্চলভেদে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে৷ অর্থাত্‍ খাদ্য নিরাপত্তার মূল বিষয় তিনটি (১) খাদ্যের সহজ প্রাপ্যতা (২) খাদ্যের সহজলভ্যতা (৩) স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য৷
দেশে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থযুক্ত ফল, শাকসবজি, খাদ্যশস্য, মাছ, মাংস, ডিম, দুধসহ প্রায় সব খাদ্যে সয়লাব হয়ে গেছে৷ স্বাস্থ্যকর খাদ্য পাওয়া মুশকিল৷ ফল, শাকসবজি, খাদ্যশস্য দ্রুত বৃদ্ধি, বড় করা, পরিপক্ক, পাকানো, আকর্ষণীয় করা, সংরক্ষণ, রোগ ও পোকা দমনের জন্য অসাধু ব্যবসায়ী ও কৃষকরা রাসায়নিক পদার্থ, হরমোন ও কীটনাশক দিয়ে থাকে৷ তবে এসব বিষাক্ত পদার্থ ছাড়াও কৃষি পণ্য উত্‍পাদন, পাকানো ও সংরক্ষণ করা যায়৷ বর্তমানে দেশে ৯২টি রাসায়নিক গ্রুপের দুই হাজারের অধিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্য উত্‍পাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে৷ প্রায় সবই বালাইনাশক৷ বালাইনাশকের ব্যবহার খুব দ্রুত বাড়ছে৷ ১৯৯৯ সালে দেশে ১৪ হাজার ৩৪০ টন বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছে৷ ২০১০ সালে ৪ গুণ ব্যবহার বেড়ে ৪৫ হাজার ১৭২টন হয়েছে৷ দেশে বর্তমানে ১৬৯টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি বালাইনাশক আমদানি করছে৷ বালাইনাশক ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিরাট হুমকির মুখে পড়েছে৷ ভেজাল ও অনঅনুমোদিত কীটনাশক, রাসায়নিক পদার্থ ও হরমোন ব্যবহার করায় আরো ক্ষতি বেশি হচ্ছে৷ দেশের আজ ১৬ কোটি মানুষই রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত৷ মানব স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনা করে সরকার ইতোমধ্যে ১০৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করেছে৷ বিষাক্ততা ধীরগতি হওয়ায় দ্রুত বোঝা যায় না৷ খাদ্য বিষাক্ততার জন্য ১৫/২০ টি দেশ বাংলাদেশ থেকে শাকসবজি ও চিংড়ী ক্রয় বন্ধ করে দিয়েছে৷ বালাইনাশকের প্রভাব ১৫দিন থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়৷ খাদ্যের মধ্যে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে ভেজাল খাদ্য তৈরি করছে ফলে দেশে জটিল রোগীর সংখ্যা বাড়ছে৷
ক্ষতিকর দিক
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায়, খাদ্যে কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থের বিষক্রিয়ায় মানবদেহে হৃদপিণ্ড, যকৃত ও কিডনির বিভিন্ন সমস্যা, ক্যান্সার, হাঁপানি, অন্ত্রে ব্যথা, পেটের পীড়া, গর্ভপাত, বন্ধ্যাত্ব, শ্বাসকষ্ট, স্নায়ুর ক্ষতি, ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিস, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, মাংসপেশীর সংকোচন, বমি, মুখে লালা আসা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, মাথাব্যাথা, চোখের মনি ছোট হওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, দুর্বলতা, তলপেটে ব্যাথা, খিচুঁনি ইত্যাদি রোগ ও লক্ষণ দেখা দেয়৷ কিডনি ফাউন্ডেশন থেকে জানা যায়, দেশের ১৬ ভাগ রোগ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই কিডনি রোগ হচ্ছে৷ প্রতি মাসে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার রোগী দ্বিগুণ হারে বাড়ছে৷ দীর্ঘদিন বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মা ও তার পেটের ভ্রুণ ক্ষতি হয় সন্তানও ক্যান্সার, কিডনিসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে৷ এছাড়াও শিশু স্বল্পবুদ্ধি, স্মরণশক্তি কম ও অল্প বয়সে বৃদ্ধ হয়৷ প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হচ্ছে৷ খাদ্যের সাথে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণের পরে নিঃশেষ না হয়ে দেহের ভেতর দীর্ঘদিন জমা থাকে৷ ফলে এই বিষক্রিয়া বংশ থেকে বংশে স্থানান্তর হয়৷ খাদ্যে মিশ্রিত ৩০০০ রকমের বিষাক্ত পদার্থের মধ্যে কার্বন টেট্টাক্লোরাইডের বিষাক্ততা মানুষের লিভার নস্ট করে, ক্লোরোফেনক্সি এসিটেট জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ত্বক-মুখগহবর বা অন্ত্রে প্রদাহ, মাংসপেশী, স্নায়ু এবং মস্তিস্কের ক্ষতি করে৷ খাদ্যে পেট্টোলিয়াম জাতীয় পদার্থ মিশ্রিত থাকলে ফুসফুসের ক্ষতি, পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, জ্বর, মাংসপেশীতে ব্যথা বা দুর্বলতা দেখা দেয়৷ পেন্টাক্লোরোফেনল জাতীয় পদার্থ দ্বারা লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে৷ এলড্রিন, ক্লোরডেন, ডিডিটি, ডায়েলড্রিন, এনড্রিল, লিনডিন দ্বারা অন্ত্র, মস্তিস্ক, লিভার, শ্বাসতন্ত্র ও কিডনির ক্ষতি করে৷ অরগানোফসফরাস ও কারবোমেট দ্বারা স্নায়ু, মস্তিস্ক, মাংসপেশী ও শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হয়৷ ফেনল ও ক্রোয়েসোট দ্বারা হৃদপিন্ড, মস্তিস্ক, লিভার ও কিডনির ক্ষতি করে৷ বিভিন্ন খাদ্যের সাথে ইরাইথ্রোসিন নামক কৃত্রিম লাল রঙ গ্রহনে শিশুদের মস্তিস্কের স্বাভাবিক ক্রিয়া ব্যাহত হয়৷ পনসিফোর আর নামক লাল রঙ গ্রহণে এজমা এবং এসপিরিন সংবেদনশীল রোগীদের সমস্যা হয়৷ উরামিন, রোভোমিল, সুদান ইত্যাদি ক্যান্সার, কিডনি, প্লীহা ও লিভার সমস্যা করে৷ লেড ক্রোসেট ব্যবহারে অ্যানিমিয়া, প্যারালাইসিস ও সন্তান নষ্ট হতে পারে৷ সালফার ডাই অক্সাইড (আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুরে দেয়া হয়) গ্রহণে পেটে ব্যথা, এজমা, লিভার, কিডনি ও এলার্জিতে সমস্যা হয়৷ ফরমালিন (মাছ, দুধ, মাংস, খাদ্য সংরক্ষণে দেয়) গ্রহণে ত্বক ক্যান্সার, চোখের সমস্যা, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম, কিডনি, লিভার ও পেটে সমস্যা হয়৷ বাই ফিলাইলের কারণে মাথা ঘোরা, বমি ও চোখ-নাকে যন্ত্রনা হয়৷ প্রোপাইলন গ্লাইকল গ্রহণে স্নায়ুকেন্দ্র ও কিডনিতে সমস্যা হয়৷ রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্যে নিউরোটকসিন ও মাইকোটকসিন জাতীয় পদার্থ তৈরি হয়৷ নিউরোটকসিন দেহে প্রবেশের পর স্নায়ুতন্ত্র নষ্ট করে৷ মাইকোটকসিন মানবদেহে ক্যান্সরসহ জটিল রোগ সৃষ্টি করে৷ এক কথায়, সকল রাসায়নিক পদার্থ মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর৷ নিম্নলিখিতভাবে ভেজাল খাদ্যের সাথে আমরা বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাচ্ছি ৷
frut2
ফলে বিষাক্ততা
গ্যাস লাইটে ব্যবহৃত ইথিলিন তরমুজে দেয়া হয় লাল করার জন্য৷ এই তরমুজ খেয়ে ডায়রিয়া, বমি ও জ্বর হয়৷ বেশি খেলে এমনকি মৃতু্যও হতে পারে৷ আম রং ও সংরক্ষণ করতে ইথিনাল জাতীয় ইডিন, কার্বাইড দেয়া হয়৷ এসব আম খেলে হৃদপিন্ড, যকৃত ও কিডনিতে সমস্যা হয়৷ কলা ও আনারস গাছে থাকা অবস্থায় গ্রোথ হরমোন-বেফোলান, লিটোসেন, বায়োফল ইত্যাদি দেয়া হয়৷ বরইয়ের রঙ উজ্জ্বল করার জন্য লিটোসেন দেয়া হয়৷ কাঁঠাল, লিচু ও আপেল পাকানোর জন্য ইথিলিন গ্যাস দেয়া হয়৷ বিভিন্ন ফল পাকাতে ইথোফেন হরমোন প্রয়োগ করা হয়৷ FAO অনুযায়ী বিষাক্ততার শ্রেণী অনুসারে ১ম কার্বোফুরান গ্রুপ, ২য় ডাইমেথয়েট গ্রুপ, ৩য় ক্লোরো পাইরিফস গ্রুপ ও ৪র্থ হচ্ছে- ইথোফেন গ্রুপ৷ পেয়ারার রোগ ও পোকা দমনের জন্য রিডোমিল, ডায়থেনএম ৪৫, রুভরাল, টপসিন, রিপর্কড ইত্যাদি বালাইনাশক প্রয়োগ করা হয়৷ এগুলোর বিষাক্ততা দূর হওয়ার আগেই বাজারজাত করা হয়৷ কলা পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথিলিন, কার্বনডাইঅক্সাইড, এসিটিলিন গ্যাস ইথোপেন, ক্লোরোমাইল, ইথারেল, ইত্যাদি প্রয়োগ করা হয়৷ বিদেশ থেকে আনা ফলেও ফরমালিনসহ বিভিন্ন ক্যামিক্যাল পাওয়া যায়৷ ফল সংলক্ষণের জন্যই ফরমালিনসহ বিভিন্ন বিষাক্ত ক্যামিক্যাল দেয়া হয়৷ ফরমালিনমুক্ত ফলে মাছি, বোলতা ও পোকা বসে৷ এসব কলা খেলে বিভিন্ন জটিল রোগ সৃষ্টি হয়৷ বিষমুক্ত ফল হচ্ছে- জাম, আমড়া, নারিকেল, কামরাঙা, বাতাবিলেবু, লিচু, আতা, শরিফা, চালতা, লটকন, বেল, কদবেল, তেঁতুল, তাল, ডালিম, জলপাই, জামরুল, আমলকি, বাঙ্গী ইত্যাদি৷ প্রাকৃতিকভাবে ফল পরিপক্ক, পাকানো ও সংরক্ষণ করা যায়৷ বাজারে ফলের জুসে ফলের রস নেই আছে শুধু রাসায়নিক পদার্থ৷
fresh-market-vegetables-chiang-mai
শাকসবজিতে বিষাক্ততা
রোগ ও পোকা দমনের জন্য বালাইনাশক প্রয়োগ করার অধিকাংশ শাসকসবজিই বিষাক্ত৷ শাকসবজিতে শতাধিক বালাইনাশক প্রয়োগ করা হয়৷ এসব বালাইনাশক প্রয়োগের ১৫ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত বিষাক্ততা শাকসবজিতে থাকে৷ কিন্তু দেখা যায় বালাইনাশক প্রয়োগের ২-৩ দিন পরই শাকসবজি সংগ্রহ করে বাজারজাত করে৷ ফলে বিষাক্ত শাসকসবজি আমরা নিয়মিত খাচ্ছি৷ আমাদের খাবারের শতকরা ৯৮ ধরনের শাকসবজিতেই বালইনাশক প্রয়োগ করা হয়৷ এই বালাইনাশক রান্নার সময় তাপে নষ্ট হয় না বরং কোন কোনটি তাপে কার্যকারিতা বেড়ে যায়৷ গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিষযুক্ত ১২টি কীটনাশকের প্রভাবে গত ৫০ বছরে পুরুষ ও মহিলার সন্তান উত্‍পাদন ক্ষমতা শতকরা ৪২ ভাগ কমে গেছে৷ মানবদেহের রক্তে, মাংসপেশীতে ও দুধে কীটনাশক পাওয়া গেছে৷ কীটনাশকের প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে৷ কিডনি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, লিভার, পিত্ত, পাকস্থলির রোগের প্রধান কারণ কীটনাশক৷ টমেটো পাকানো, রঙিন ও সংরক্ষনের জন্য রাইপেন, ইথোপেন, টমটমসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা হয়৷ শাসকসবজি কাটার আগে ও পরে ভালো করে পানিতে পরিস্কার করলে কিছুটা বিষাক্ততা কমে৷ শাকসবজির পোকা ও রোগ দূর করার জন্য বালাইনাশকের পরিবর্তে আইপিএম পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে৷ আইপিএম পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে উপকারী পোকা দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন, বালাই সহনশীল জাতের চাষ, আধুনিক চাষ পদ্ধতি, যান্ত্রিক পদ্ধতি, সেক্সফেরোমেন ফাঁদ, আলোর ফাঁদ, ডিমের গাদা নষ্ট করা, আক্রান্ত ডগা তোলা ইত্যাদি৷ ফসলের গাছের রোগ দমনের জন্য হোমিওপ্যাথি খুব কার্যকরী৷ জৈব কীটনাশক স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত৷
খাদ্যশস্যে ভেজাল
ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, ইত্যাদি ফসলের মাঠে ও সংরক্ষণাগারে রোগ ও পোকা দমনের জন্য বালাইনাশক প্রয়োগ করা হয়৷ ফসলের মাঠে প্রয়োগকৃত বালাইনাশকের বিষাক্ততা খাদ্যশস্যে তেমন থাকে না৷ কিন্তু গুদামে সংরক্ষনের সময় প্রয়োগকৃত বালাইনাশকের বিষাক্ততা থাকে৷ নিম, নিশিন্দা, বিষকাটালিসহ বিভিন্ন জৈব পদ্ধতিতেও খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা যায়৷ ডাল, চাল ও আটায় রং মিশিয়ে, চকচকে করে বাজারজাত করা হচ্ছে৷ মাষকলাই ভাঙানোর পর রঙ মিশিয়ে মুগ ডাল বানানো হচ্ছে৷
মাছ ও মাংস বিষাক্ততা
মাছ ও মাংস সংরক্ষনের জন্য ফরমালিন দেয়া হয়৷ ফরমালিনযুক্ত মাছ ও মাংস খেয়ে স্মৃতি শক্তি লোপ পায়, লিভার ও কিডনির রোগ হয় এবং ক্যান্সার হয়৷ ফরমালিনযুক্ত মাছ ও মাংস কালচে দেখায়৷ হরমোন দিয়ে গরু মোটাতাজা করা হয়৷ যার মাংস মানবস্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর৷
ডিম ও মুরগির মাংসে বিষাক্ততা
মুরগির খাদ্য বিষাক্ত চামড়া শিল্পের বর্জ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হয়৷ চামড়া শিল্পে দুই শতাধিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার হয় চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে৷ চামড়া শিল্পের বর্জ্য পদার্থের মধ্যে ঐসব বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে৷ এই র্বজ্য পদার্থ দিয়ে যে পোল্ট্রি খাদ্য তৈরি হয় সেই খাদ্য খাওয়া মুরগির মাংসে এবং ডিমে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে৷ এই বিষাক্ত ডিম ও মাংস খেয়ে কিডনি, ক্যান্সার ও লিভারে রোগ হচ্ছে৷ এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগলের মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর৷
দুধে ভেজাল
দুধে আটা, ময়দা, ভাতের মাড়, এরারোট, বরিক এসিড, ইউরিয়া, চিনি, সোডিয়াম, বেনজোয়েট, ফরমালিন, ময়লা পানি, রঙ, স্কিম মিল্ক পাউডার, ইত্যাদি মেশানো হচ্ছে৷ এসব বিষাক্ত দুধ পানে কিডনির নেফরোটক্সিসিটি ও লিভারের হেস্পটোটক্সিমসহ দেহের গুরুত্বর ক্ষতি হচ্ছে৷ বিশেষ করে শিশুদের ক্ষতি বেশি হচ্ছে৷ কনডেন্স মিল্ক-এর সম্পূর্ণ ক্যামিকেল৷ এসব ভেজাল দুধ দিয়ে মিষ্টি দ্রব্য তৈরি হচ্ছে৷ ফুড এন্ড নিউট্রিশন পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর এসব তথ্য পাওয়া যায়৷ বিদেশ থেকে আসা গুঁড়া দুধে ক্ষতিকর জীবাণু ও তেজস্ক্রিয় পদার্থ আছে বলে অনেকেই ধারণা করছে৷
তেলে ভেজাল
এক ব্যারেল বা ২২৫ লিটার সয়াবিন তেল বা ফার্নেস অয়েলের মধ্যে ৫ থেকে ৭ ফোঁটা এলিল আইসো থায়ো সায়ানাইড মেশালে পুরো ব্যারেল সরিষার তেলের রঙ ও গন্ধ হয়৷ এই তেল খেলে কিডনি মস্তিস্ক ও স্নায়ু ক্ষতি করে৷ সরিষার তেলে ঝাঁঝ বাড়ানোর জন্য পিয়াজের রস দেয়া হয়৷
কোমল পানীয়, জুস, আইসক্রিম
কোমল পানীয়তে দেয়া হয় ফসফেরিক এসিড, ইথাইলিন গ্লাইকল৷ এগুলো আর্সেনিকের মত ধীরঘাতক৷ হাড় ও দাঁতের খুব ক্ষতি করে৷ কোমলপানীয়তে থাকে উচ্চচাপযুক্ত বিষাক্ত কার্বনডাই অক্সাইড৷ ফলের জুসে ও আইসক্রিমে থাকে রাসায়নিক পদার্থ, রঙ, স্যাকারনি ও চিনি৷ ফলের রস ও দুধ পাওয়া মুশকিল৷ এসব ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খেলে কিডনি, যকৃত, হাড়ক্ষয়, ক্যান্সারসহ জটিল রোগ হয়৷ বোতলজাত মিনারেল ওয়াটারে পাওয়া যায় শেওলা, ময়লা ও দুর্গন্ধ৷ কোন্ পানি দিয়ে বোতলজাত করা হয় এর কোন প্রমাণ পরীক্ষা নেই৷ সস ও জেলিতে মিশানো হচ্ছে বিষাক্ত রঙ ও ক্যামিক্যাল৷ শরবত তৈরির প্যাকেটজাত পাউডার ও বোতলজাত তরল পদার্থে রয়েছে স্যাকারিনসহ বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ৷ চকলেট, চুইংগামসহ বাচ্চাদের সকল খাদ্যে রয়েছে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ৷ পাবলিক হেলথ ইনষ্টিটিউট-এর পরীক্ষকরা বলেছেন, এসব খেয়ে বাচ্চাদের কিডনি নষ্ট, ক্যান্সার, লিভার ব্যাধি, পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, হৃদরোগ ও চোখের রোগ হতে পারে৷
অন্যান্য খাদ্যে ভেজাল
গুড় আকর্ষণীয় করার জন্য বিষাক্ত হাইড্রোজ পাউডার মেশানো হয়৷ এছাড়াও চিটাগুড়, আটা ও ক্যামিক্যাল দিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করে৷ অথচ বন ঢেঁড়শের নির্যাশ দিলে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গুড় আকর্ষণীয় করা যায়৷ মুড়ি ভাজতে ইউরিয়া সার দেয়া হয়৷ লুডুলস, সেমাই, বিস্কুট ইত্যাদি মচমচে করতে কাপড়ে দেয়ার রঙ ব্যবহার হয়৷ পচা ডিম দিয়ে বেকারিতে কেক ও বিস্কুট তৈরি হচ্ছে৷ গাড়ির পোড়া মবিল দিয়ে চানাচুর ভাজা হচ্ছে৷ ফাস্টফুডের অধিকাংশ খাদ্যই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি৷ দোকানের তৈরিকৃত খাদ্য সবই অস্বাস্থ্যকর ও ভেজাল৷
বিষমুক্ত ফল ও সবজি উত্‍পাদন লাভ বেশি
টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ধনবাড়িতে হরমোন ও বালাইনাশক ছাড়া জৈব পদ্ধতিতে কলা ও আনারস চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে৷ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ডানিডা ও কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিষমুক্ত ফল উত্‍পাদন খুব জনপ্রিয় হয়েছে৷ এখানকার কৃষকরা কলা ও আনারস চাষে এখন হরমোন ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে না৷ অর্গানিক পদ্ধতিতে উত্‍পাদিত খাদ্য স্বাস্থ্যসম্মত৷
আইন এবং করণীয়
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও ভেজাল খাদ্য বিক্রি করার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতু্যদণ্ড এবং ১৪ বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে৷ এছাড়াও জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডের বিধান রয়েছে৷ বিএসটিই-এর ভেজাল বিরোধী অভিযান, প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট, পরিবেশবাদীদের আন্দোলনসহ বিভিন্ন তত্‍পরতায় ভেজাল খাদ্য উত্‍পাদন ও বিক্রি বন্ধ করা যাচ্ছে না৷ বিএসটিআই-এর অনুমতি ও পরীক্ষা ছাড়াই সকল খাদ্যে বিএসটিআই-এর মনোগ্রাম লাগানো থাকে৷ খাদ্যের প্যাকেটে উত্‍পাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ থাকলেও সঠিক নয়৷ একই প্রতিষ্ঠানকে মোবাইল কোর্ট বারবার জরিমানা করলেও ভেজাল বন্ধ করা যাচ্ছে না৷ ভেজাল ও বিষমুক্ত খাদ্য উত্‍পাদনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সকল গবেষণা ও সমপ্রসারণ প্রতিষ্ঠান, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে৷ এর কুফল সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রচার করা, সভাসমাবেশ করে জনসচেতনতা সৃষ্টিকরা, কীটনাশকের আমদানি কমানো, চোরাপথে আসা বন্ধ করা, মোবাইল কোর্ট বসানো, আইন বাস্তবায়ন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে৷ জনগণ সচেতন হয়ে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য ক্রয় না করলে এসব বন্ধ হবে৷

লেখকঃ কৃষি প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক
সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূয়াপুর, টাঙ্গাইল-১৯০০
মোবাইল- ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *