বিশ্ব খাদ্য দিবসঃ প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আসছে ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফ এ ও) উদ্যোগে প্রতি বছর সদস্যভুক্ত সব দেশে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় দিবসটি। ‘সবার আগে খাদ্য’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৯৮১-৮২ সনে প্রথমবার এ দিবসটি পালনের সূচনা হয় । এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত এবং পুষ্টি সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব খাদ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- “অভিবাসনের ভবিষ্যৎ বদলে দাও, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াও”।

একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি এবং যথাযথ পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম শর্ত। বর্তমানে দেশে আবাদি জমি ১% হারে কমছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে ১.৪৭% হারে। ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।  ১৯৭১-৭২ সালে দেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। আর ওই সময়ে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল এক কোটি টন। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ৩ কোটি ৯৬ লক্ষ ৯০ হাজার টন। গত ৪৪ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। এ সময়ে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি। আর খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। গবেষকদের মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হবে ৪০ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশে প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে। আইলা-সিডর আক্রান্ত এলাকাসহ অনেক এলাকায় ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

অপরদিকে বাংলাদেশের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। স্বাধীনতার পর ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা এবং চিকন চাল ৫৬ টাকায় উঠেছিল। সেই থেকে বাড়তে থাকা চালের দাম আজও স্থিতিশীল হয়নি। চালের দাম ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি উঠে যায় গত সেপ্টেম্বর মাসে। এক কেজি মোটা চাল কিনতে হয় ৫২ টাকায় আর চিকন চাল ৭৫ টাকায়। চালের দাম বাড়ায় বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা। মধ্যবিত্তকে সব কিছু কিনে খেতে হয়। ফলে খাদ্যের দাম যখন বাড়ে তখন তারা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে। খাদ্যপণ্যের এই উচ্চ মূল্যের কারণে দরিদ্র মানুষের পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । খাদ্যের দাম বাড়ায় মানুষ তার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা থেকে পুষ্টি উপাদানগুলো কাটছাঁট করছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী প্রায় ২ কোটি মানুষের দৈনিক আয়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ব্যয় হয় চাল কেনায়। আয় না বেড়ে চালের দাম বাড়লে এ জনগোষ্ঠী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছে। দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের খাদ্য তালিকায় ডিম ও দুধ খুঁজে পাওয়া যাবে না । প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি এবং চাহিদার তুলনায় উদ্ধৃত্ত খাদ্যশস্য থাকার পরও চালের বাজার অস্থির হয়ে পড়া বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠছে। পরিশেষে, খাদ্যনিরাপত্তা সুরক্ষিত করতে হলে গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এরসাথে কৃষি ব্যবস্থা জোরদারকরণ ও বাজার ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। যারা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম করছেন, সেসব কৃষকদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান, তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন করার মধ্যেই বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৭ পালনের সার্থকতা নিহিত । আমরা বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৭ এর সফলতা কামনা করি।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare