বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস/২০১৩ পালিত “রোগ দমন ও প্রতিরোধে প্রয়োজন প্রতিষেধক ও জনসচেতনতা”

প্রতি বছরের মতো এবারও ২৭শে এপ্রিল বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস উদযাপিত হয়। বিশ্বের সকল দেশেই প্রতি বছরই ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা জাকজমক পূর্ণভাবে এ দিবসটি উদযাপণ করে থাকেন। বাংলাদেশের ভেটেরিনারি পেশাভূক্ত ডাক্তার, কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনে তৎপর। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল “ঠধপপরহধঃরড়হ ঃড় ঢ়ৎবাবহঃ ধহফ ঢ়ৎড়ঃবপঃ” অর্থাৎ রোগের দমন ও প্রতিরোধে প্রতিষেধক। এদিবসটিতে বাংলাদেশের ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বিনামূল্যে প্রতিষেধক টিকা প্রদান, রোগের চিকিৎসা, ঔষধ বিতরণ, র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেন। এ লক্ষ্যে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরে বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে। এ বিশ্বে শতশত রোগ যা প্রাণি হতে মানুষে সংক্রমিত হয়। অনেক রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এবং কিছু রোগ শুধু বন্যপ্রাণি ও গৃহপালিত প্রাণির জন্যই ক্ষতিকর। কিছু রোগ ঔষধ সেবনে ভাল হয়, কিছু ঔষধের পাশাপাশি প্রতিষেধক টিকায় প্রতিকার বা প্রতিরোধ করা সম্ভব। কয়েকটি মারাত্মক রোগ রয়েছে যার উপসর্গ দেখা দেওয়ার অর্থই হচ্ছে শতভাগ মৃত্যু। বিশ্বে প্রায় ৬৬টি তড়ড়হড়ঃরপ রোগ যা আক্রান্ত পশু হতে মানুষে এবং আক্রান্ত মানুষ হতে পশুতে সংক্রামিত হতে পারে। এ রোগের মধ্যে জলাতঙ্ক সবচেয়ে মারাত্মক। তাছাড়া বার্ডফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, এ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, ব্রƒসেলোসিস, গ্লান্ডার, লেপটোস্পাইরোসিস, লিস্টারিওসিস, প্লেগ, টিটেনাস, র‌্যাটবাইট ফিভার, টুলারেমিয়া, ভিবরিওসিস, টক্সোপ্লাসমোসিস, ম্যাডকাউ, বিফ টেপওয়াম, পর্ক টেপওয়াম, ফিস টেপওয়ার্ম, হাইডাটিড ডিজিজ ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে জলাতঙ্কই একমাত্র রোগ যার উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার অর্থই হচ্ছে শতভাগ মৃত্যু। অর্থাৎ এ রোগের কোন চিকিৎসা নেই। লাইসা নামক ভাইরাস এ রোগের জীবাণু। ৯০-৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগের প্রধান বাহক বেওয়ারিশ কুকুর। তাছাড়া নেকড়ে বাঘ, শিয়াল, বিড়াল, বেজী, বানর ও বাঁদুরের কামড়, আঁচড় বা লালার সংস্পর্শে এ ভাইরাস মানুষসহ যে কোন সুস্থ প্রাণির দেহে প্রবেশ করে রোগের সংক্রমণ ঘটায়। তবে আক্রান্ত প্রাণির সব কামড়ে বা আঁচড়ে জলাতংক রোগ হয় না। ক্ষতস্থান সাথে সাথে সাবান পানি দ্বারা ধৌত ও যথা সময়ে জলাতঙ্ক টিকা প্রয়োগে সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। জলাতঙ্ক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য আক্রান্ত কুকুর নিধন, কুকুরের বন্ধ্যাত্বকরণ, গৃহপালিত কুকুরকে ভেকসিনেশন, রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডভোকেসি সভা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তবে দুঃখের বিষয়  জলাতঙ্কসহ আরও অনেক রোগের ক্ষেত্রে অজ্ঞতার কারণে প্রতিষেধক না নিয়ে কবিরাজ বা ফকিরের পানি পড়া, গুড় পড়া ও ঝাড়-ফুকের কারণে অধিকাংশ মানুষসহ গবাদি প্রাণির অকাল মৃত্যু ঘটে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে জলাতংক রোগের প্রকোপ বেশী। বর্তমানে জলাতঙ্ক রোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪র্থ স্থানে। যে এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেশী সেখানেই জলাতঙ্ক রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশী। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল যেমন বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে কুকুরের সংখ্যা বেশী হওয়ায় ঐ অঞ্চলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণির সংখ্যাও বেশী । বর্তমানে উন্নয়নশীল বিশ্বে ৮০টি দেশের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ কুকুর থেকে সংক্রামিত জলাতঙ্ক রোগের ঝুকিতে রয়েছেন। আমাদের জানা প্রয়োজন সঠিক সময়ে প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগে যেমন শতভাগ সুস্থ হওয়া সম্ভব, তেমনি টিকা প্রয়োগ না করলে শতভাগ প্রাণির মৃত্যুও অবধারিত। বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে ১ জন মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায় অর্থাৎ বৎসরের গড়ে প্রায় ৫৫-৬০ হাজার। আর প্রাণি মৃত্যু হার অবশ্যই মানুষের চেয়ে বেশী নিঃসন্দেহে। একটি পাগলা কুকুর গড়ে প্রায় ৮/১০টি গবাদি প্রাণিকে কামড়ানোর ঘটনাও রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে প্রতি বৎসর ১ লক্ষেরও বেশী মানুষকে জলাতঙ্ক রোগে সংক্রমণ পরবর্তী টিকা প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশে বছরে ২ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যায়। গবাদি প্রাণিকে বছরে প্রায় ৫০ হাজার মাত্রা সংক্রমণ পরবর্তী টিকা প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তবে প্রায় ৫০ শতাংশ গবাদি প্রাণিকে সময়মত প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগ না করায় মৃত্যু মুখে পতিত হয়।

বিশ্বের অনেক দেশই নিয়মিত প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগ ও বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের মাধ্যমে জলাতঙ্ক নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রির্পোট অনুযায়ী লিবিয়া, কংগো, অষ্ট্রেলিয়া, মালায়েশিয়া, হংকং, বাহরাইন, মালদ্বীপ, সিংগাপুর, ফিজি, নিউজিল্যান্ড, উরুগুয়ে, জ্যামাইকা, মাল্টা, গ্রীস, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য সহ আরও অনেক দেশ জলাতঙ্ক নির্মূলে সক্ষম হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৬ এর রিপোর্ট অনুযায়ী এশিয়া মহাদেশের মধ্যে জাপান এবং মালায়েশিয়া সম্পূর্ন রুপে এবং ইন্দোনেশিয়ার অধিকাংশ স্থানেই জলাতঙ্ক রোগ দমনে সক্ষম হয়েছে। আর একটি মারাত্মক রোগের নাম সোয়াইন ফ্লু। এইচ১ এন১ নামক ভাইরাস দ্বারা সোয়াইন ফ্লু রোগের সৃষ্টি হয়। ২০০৯ সালে সর্ব প্রথম এ রোগটি দেখা দেয় মেক্সিকোতে। পরবর্তীতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে সুকুরের মাধ্যমে এবং প্রায় দুই লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এ বছর ভারতে এরোগে প্রায় ১০০ জন মারা যায়। বার্ডফ্লু রোগেও বিশ্বে অনেক মানুষের প্রাণহাণি ঘটেছে। সুতরাং জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকল রোগের দমন ও প্রতিরোধ ভেটেরিনারিয়ানদের পাশাপাশি হেলথ সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে যেমন জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সবাই কাজ করছেন। এ ব্যাপারে ছঁধৎধহঃরহব অপঃ এর সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন দক্ষ ভেটেরিনারিয়ান তৈরী ও তাদের সঠিক পদ বিন্যাস। অন্যথায় প্রাণি হতে বিভিন্ন তড়ড়হড়ঃরপ রোগ ছাড়িয়ে পড়তে পারে অস্বাভাবিকভাবে। এখনই যথাযথ ব্যবস্থানিতে হবে। বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস/২০১৩ বিশ্বের ভেটেরিনারিয়ানদের একযোগে কাজ করার অঙ্গিকার করার একটি প্লাটফর্ম। সারা বিশ্বে রোগ দমন ও প্রতিরোধে প্রয়োজন প্রতিষেধক প্রয়োগ ও জনসচেতনতা।

লেখক:

প্রফেসর ডাঃ মোঃ ফজলুল হক

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *