বৃক্ষ রোপণ একটি সামাজিক আন্দোলন

নিতাই চন্দ্র রায়

forest

‘বেশি বেশি করে গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান। পরিবেশ না বাঁচলে তো আমরাও ভালভাবে বাঁচতে পারবোনা। পাখ-পাখালি বাঁচতে পারবে না। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতিকে ভালোবাসা আমাদের দায়িত্ব।’ এটা হলো-দেশবাসির প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের বৃক্ষ প্রেমিক কার্তিক প্রামানিকের আবেদন।  যার বৃক্ষ রোপণের গল্প অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্য পুস্তকে ছাপা হয়েছে। কার্তিক প্রমানিকের বাবা আরো বেশি গুরুত্ব দিতেন বৃক্ষরোপণের ওপর। তিনি বলতেন, ‘গাছ লাগানো অনেক পূণ্যের কাজ। কী হবে গয়া-কাশী গিয়ে? তার থেকে বেশি পূণ্য হবে গাছ লাগালে।’ কার্তিক প্রামানিক  একজন  শ্রমজিবী মানুষ। তাঁর পেশা বাজারে  মানুষের চুল কাটা। বাবার এই উপদেশ শুনে  শিশু কাল থেকে শুরু করে জীবনের দীর্ঘ ৫০ টি বছর তিনি নিঃস্বার্থভাবে গ্রামের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, ঈদগাহ-কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সীমান্ত ফাঁড়িতে গাছ লাগিয়েছেন।  সন্তানের মতো ভালবেসে  পরম যতœ  করে প্রতিটি বৃক্ষকে বড় করেছেন।। নিজের হাতে লাগানো গাছের ছায়ার দাঁড়িয়ে  খুঁজেছেন মানব  জীবনের সার্থকতা ও সীমাহীন শান্তি। শ্যামপুর গ্রামে এমন কোনো রাস্তা নেই, হাট নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে কার্তিক প্রমানিকের মায়াবী হাতের ছোয়ায় রোপণ করা সবুজ বৃক্ষ নেই।তাঁর সামান্য আয়ের অর্থ দিয়ে বৃক্ষ রোপণের জন্য তিনি নার্সারী  গড়েছেন। চারা তৈরী করেছেন। গাছের ঠেকা দেয়ার জন্য গাঁটের টাকা খরচ করে বাঁশ কিনেছেন। কত মহৎ হৃদয়ের অধিকারী হলে এ ধরণের জনকল্যাণকর কাজ করতে পারেন একজন ক্ষুদ্র আয়ের  স্বল্প শিক্ষিত মানুষ।

বৃক্ষ মানুষের কত উপকার  করে তা বলে শেষ করা যাবে না। বৃক্ষের দেয়া অক্সিজেন ছাড়া পৃথিবীতে কোনো প্রাণি এক মুহুর্তও বাঁচতে পারবে না।  বৃক্ষ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও ওষুধের ব্যবস্থা করে। পশু-পাখির খাবার ও আশ্রয় দেয়। শিল্পের কাঁচামাল যোগায়। মানুষের সৌন্দর্য পিপাসা মেটায়। বৃক্ষ মানুষকে  ছায়া দেয়, নির্মল বায়ু দেয়, বৃষ্টির পানি দেয়।  মরুময়তা হ্রাস করে। নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করে। শব্দ দূষণ রোধ করে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষা করে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কমাতে সহায়তা করে ভীষণভাবে। তাপমাত্রা হ্রাসে বৃক্ষের কী  যাদুকরী অবদান তা  ঢাকা নগরের বর্তমান অবস্থা থেকেই ভালভাবে বোঝা যায়। দেশের যে কোনো গ্রামের চেয়ে রাজধানী ঢাকা নগরের তাপমাত্রা  এখন ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এ ছাড়া সন্ধ্যায় ফ্লাটবাড়ির বাইরের অংশের চেয়ে ভেতরের অংশের তাপমাত্রাও থাকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’টি গবেষণায়  এ ভয়াবহ  পরিবেশ বিপর্যয়ের তথ্যটি বেরিয়ে এসছে। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সাব্বির আহমেদ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে  এ বিষয়ে গবেষণা করে  ঢাকা নগরের তপ্ত ভূখন্ড তৈরীর কারণ হিসেবে গাছ-পালা ও জলাশয় ধ্বংস করে অপরিকল্পিত নগরায়নের বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন । এটা শুধু ঢাকায় নয়; সারা দেশের নগরগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে  গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নগরে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। ইমারত নির্মাণ বিধি মালায় স্থাপনার জন্য নির্বাচিত জমির একটি নিদিষ্ট পরিমাণ অংশে বৃক্ষ রোপণকে বাধ্যতা মূলক করতে হবে। বসতবাড়ির ছাদে, বারান্দায় ও বেলকোনিতে ফল-মূল, ভেষজ ও   সৌন্দর্য বর্ধনকারী গাছ লাগানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশ গ্রহণে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্ম সংস্থানের জন্য বৃক্ষ রোপণ কে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

এবারের জাতীয় বৃক্ষ রোপণ অভিযান  ও বৃক্ষমেলা-২০১৫ এর প্রতিপাদ্য  হলো – পাহাড়, সমতল উপকূলে, গাছ লাগাই সবাই মিলে। বাড়ির আঙ্গিনা ও চারপাশ, পতিত ও প্রান্তিক জমি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জলাশয়, খাল-বিল ও রাস্তার পাশে বৃক্ষ রোপণ করে সবুজায়নের মহৎ উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণের জন্য দেশবাসিকে উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, পরিবেশের উন্নয়ন এবং সম্পদ সৃজনে বৃক্ষের অবদান অনুধাবন করে  বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচিকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছে বর্তমান সরকার। এ জন্য সারা দেশে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’ গত ৫ই জুন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও মাসব্যাপী বৃক্ষমেলা উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে এসব কথা বলেন।

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর কোটি কোটি গাছের চারা রোপণ করার পরও জাতিসংঘ বলছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায়  এক কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনভূমি। সে হিসেবে প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে  প্রায়  আট হেক্টর বনভূমি। যে হারে পৃথিবীতে বন উজার হচ্ছে, সে হারে কিন্তু  নতুনভাবে লাগানো হচ্ছে না গাছ। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায়  এক লাখ ৩০ হাজার গাছ কাটার বিপরীতে  লাগানো হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার বৃক্ষ। এতেই বুঝা যায়, প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্রের সাথে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছি আমারা। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, একটি গাছ তার ৫০ বছরের জীবনে পৃথিবীর প্রাণীকুলকে  প্রায় ৩৫ লাখ টাকার  বিভিন্ন  সুবিধা দিয়ে থাকে। কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বায়ু দূষণ রোধ করে ১০ লাখ টাকার, বাতাসে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে বায়ুমণ্ডলকে ঠাণ্ডা রাখে ৫ লাখ টাকার, বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে ৫ লাখ টাকার, মাটি ক্ষয় রোধ করে উর্বরতা বাড়ায় ৫ লাখ টাকার, পাখিও প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দেয় ৫ লাখ টাকার এবং ফল ও কাঠ দেয় ৫ লাখ টাকার। একটি আড়াইশ মিটার চওড়া বন বাতাসে জমে থাকা সালফারডাই অক্সাইডের প্রায় ৩৫ শতাংশ শুষে নিতে সক্ষম। একটি গাড়ি ২৫ হাজার কিলোমিটার পথ চলে  যে বায়ু দূষণ সৃষ্টি করে তার পুরুটাই শুষে নিতে পারে একটি বড় গাছ। ক্যান্সার নিরাময়ের যাদুকরী গুণ আছে পৃথিবীর প্রায় এক হাজার  ৪‘শ বৃক্ষ প্রজাতির। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে ঝড়- জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাবে । কোটি কোটি মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে অভিবাসী হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এ ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হলে ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণের কোনো বিকল্প নেই। একটি দেশের পরিবেশ সুার জন্য কমপক্ষে  শতকরা ২৫ বনভূমি  থাকা প্রয়োজন। আমাদের দেশের বনভূমি রয়েছে মাত্র শতকরা ৭ থেকে ৮ভাগ। অন্যদিকে জাপানে ৬৩ ভাগ, মালয়েশিয়ায় -৬২ , থাইল্যান্ডে ৪৮ এবং মায়ানমারে শতকরা ৬৭  ভাগ  বনভূমি  রয়েছে।

আগাম মৌসুমী বৃক্ষষ্টিপাতের  কারণে সারা দেশে চলছে বৃক্ষরোণের   মহোৎসব। মানুষ কিনছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ, ভেষজ ও শোভাবর্ধণকারী  গাছের চারা। তবে উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে – উত্তরাঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারীতে বিক্রিত চারার শতকরা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ হলো- ইউক্যালিপ্টাস ও আকাশমনির। ইউক্যালিপটাস গাছ তাড়াতাড়ি বড় হয়। চারার দাম কম ও সহজ লভ্য। কাঠ বেশ শক্ত। সহজে ঘুণে ধরে না। ক্ষেত-খামারের আইলে, বসতবাড়ির আশে-পাশে, রাস্তার ধারে, জলাশয়ের পাশের লাগানো যায়। এ কাঠ দিয়ে খুঁটি তৈরী করা যায়। জানালা, দরোজার চৌকাঠ ও ঘরের রোয়া, বাতা ও বিম তৈরী কাজে এ গাছ কাজে লাগে। মানুষ এ গাছের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। ক্ষেতের আইলে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগালে পানির অভাবে ওই ক্ষেতের ফসলের ফলন ব্যাপক হ্রাস পায়। ইউক্যারিপটাস গাছকে বলা হয় সৌর নলকূপ। কারণ এ গাছটি মাটি থেকে প্রচুর পানি গ্রহণ করে এবং প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় তা বায়ু মন্ডলে ছেড়ে দেয়।একটি ইউক্যালিপ্টাস গাছ দিনে  বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৫০ লিটার পানি ত্যাগ করে। পাকিস্তানে পাহাড়ি ঝরনার পাশে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণের ফলে  ৮০ শতাংশ ঝরনার পানি শুকিয়ে যায়। সেই এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৫ বছরে ২ ইঞ্চি কমে যায়। পানির স্তর ৫ থেকে ১০ ফুট নিচে চলে যায়। ভুট্টা ক্ষেতের পাশে এ গাছ রোপণের ফলে ইথিওপিয়ায় ভুট্টার ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৯ থেকে ১৩.৫ টন  হ্রাস পায়। সম্প্রতি আফ্রিকান দেশ কেনিয়াতে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেনিয়ার পরিবেশ মন্ত্রী জন মাইচোকি আজ থেকে কয়েক বছর আগে ইউক্যালিপটাস গাছ তার দেশ থেকে সমূলে উচ্ছেদের আদেশ দেন। ইউক্যালিপটাস গাছ পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ। এগাছে কোনো পাখি ও প্রজাপতি বসে না। এ গাছের আশে-পাশে কোনো গাছ বা  বন্যপ্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। মানুষ যেভাবে সাময়িক লাভের আশায় দেশে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনির মতো ক্ষতিকর গাছ রোপণ করছে, তা অব্যাহত থাকলে এক সময় দেশের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হবে। পানির স্তর আরো নিচে চলে যাবে। মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাবে। পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাবে। প্রাকৃতিক জলাশয়গুলি শুকিয়ে যাবে। জলজ  উদ্ভিদও প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিক হয়ে পড়বে। বন্য প্রাণি ও গাছপালার অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই এই পরিবেশবিনাশী বৃক্ষ রোপণ থেকে সকলকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্রের জন্য ক্ষতিকর ইউক্যালিপ্টাস ও আকাশমনির মতো গাছের চারা উৎপাদন, বিক্রয় ও রোপণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, পরিবেশবাদী সংগঠন, কৃষিবিদ,  ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে।

————————————–

মহাব্যবস্থাপক(কৃষি), সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস্ লিঃ, সেতাবগঞ্জ দিনাজপুর

মোবাইল: ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইল:হবঃধরৎড়ু১৮@ুধযড়ড়.পড়স

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare