বৃষ্টিপাত হয় একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে

ড. মো. আবু বকর*

মহান আল্লাহ হচ্ছেন “রাব্বুল আলামীন” বা জগৎ  সমুহের ‘রব’ সমগ্র সৃষ্টির তিনিই প্রতিপালক। ‘রব’ হওয়ার জন্য যে সকল ক্ষমতা এখতিয়ার এবং গুণাবলী দরকার তা এক মাত্র আল্লাহ তায়লার ই রয়েছে। অন্য কোন সত্ত্বাই এর অধিকারী হতে পারেনা। ‘রব’ এমন সত্ত্বা যিনি সৃষ্টি করার অধিকারী তিনি ব্যতীত অন্য স্রষ্ঠা নেই। তিনি তার সৃষ্টির সকল অভাব অভিযোগ ও যাবতীয় প্রয়োজনের কথা শ্রবণ করেন এবং তার সৃষ্টির সকল প্রয়াজন পূরণে সক্ষম। এসবের কোন একটির দিক দিয়াই অন্য কোন সত্ত্বা এ সকল গুনাবলী এবং ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেনা। তাই আল্লাহ হচ্ছেন সমগ্র সৃষ্টির ‘রব’। তিনিই মানুষের সকল প্রকার প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা নিয়েছেন। মানুষের যে সকল মৌলিক প্রয়োজন রয়েছে তার প্রথমটি হচ্ছে খাদ্য। এ ছাড়া রয়েছে বস্ত্র ও বাসস্থান। মানুষ স্বভাব গত ভাবে লজ্জাশীল। সে তার দেহের অঙ্গ প্রতঙ্গগুলো ঢেকে রাখতে চায়। এ ছাড়াও প্রতিকুল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে তার দেহকে বাচিয়ে আরাম আয়াসে থাকতে চায়। সে জন্য একদিকে যেমন প্রয়োজন তার দেহকে আবৃত করা অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এমন বাসস্থান যা তাকে সার্বিকভাবে নিরাপত্তা প্রদান করে। এছাড়াও মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষা পাওয়া কেই মৌলিক প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো মানুষের এ মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণের দায়িত্ব কার। এ প্রশ্নের স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক উত্তর হল যিনি স্রষ্টা লালন পালন করার দায়িত্বও তারই। কাজেই মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহ তায়ালাকে স্রষ্ঠা হিসাবে মেনে নেন তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালাকে ‘রব’ বা লালন পালনকারী হিসাবে মেনে না নেয়ার কোনই কারণ থাকতে পারেনা। অথচ বড়ই অদ্ভুদ ও আশ্চর্য্যরে বিষয় হলো এই যে কিছু সংখ্যক মানুষ আল্লাহ তায়ালাকে স্রষ্ঠা স্বীকার করলেও লালন পালনে তাঁর কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছে। ফলে জীবন পরিচালনায় খোদায়ী বিধানের প্রয়োজন এবং যথার্থতা ও তাদের বিবেচনায় স্থান পাচ্ছেনা। যারা আল্লাহ কে তাদের স্রষ্ঠা হিসাবে মেনে নেয়নি তাদের ব্যপারে এ পর্যায়ে আলোচনা নি¯প্রয়োজন। এখন যারা আললাহ তায়ালাকে স্রষ্ঠা ও পালন কর্তা হিসাবে মেনে নিয়েছেন তাদেরকে মহান আল্লাহ কিভাবে লালন পালন করেছেন সে বিষয়টির উপর আলোচনায় আসা যাক।

প্রথমতঃ এ বিষয়টি এমন নয় যে যারা আল্লাহকে ‘রব’ মেনে নিয়েছে, আল্লাহ তায়ালা শুধু তাদের লালন পালনেরই দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং আল্লাহ এতই মহান যে তিনি বিশ্বাসী অবিশ্বাসী কাফের-মূশরেক মুমিন মোনাফেক নির্বিশেষে দুনিয়ার জিন্দেগীতে সকলেরই বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণ করে থাকেন। এ ব্যপারে কারো প্রতি কোন প্রকার পক্ষপাতিত্ব করেন না। উদাহরন স্বরূপ বলা যায় সূর্যালোক এবং বাতাস ও পানি মানুষের জীবন ধারণের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ যা আল্লাহ তায়ালারই দয়ার দান। যেখানে সূর্য্যরে আলো পৌছে সেখানে শুধু মাত্র বিশ্বাসীগণই তা পায় এমন নয় কিংবা যেখানে বৃষ্টিপাত হয় তার কল্যাণ অকল্যাণ শুধু ঈমানদার কিংবা অবিশ্বাসীরাই ভোগ করেনা বরং খোদা প্রদত্ত জীবন যাপনের এ সকল দানের প্রভাব সার্বজনীন। তবে মানুষের পার্থিব জীবন পরিচালনা ও জীবন যাপন পদ্ধতির উপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নীতি নির্ধারণী নির্দেশনা ও গাইড লাইন রয়েছে যা প্রেরীত হয়েছে আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতার মাধ্যমে এবং মানুষের মধ্যে থেকে তাঁরই মনোনীত নবী, রসুল ও পয়গম্বরগণের কাছে। ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলে ওহী। কোরানুল কারীম আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতা জীবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট প্রেরিত ওহীগুলোরই সমাহার এবং এতে অন্য কারো কোন একটি শব্দেরও সংমিশ্রণ নেই। কাজেই কোরানুল কারীম থেকে যা পাওয়া যায় তা সরাসরি এবং একান্তভাবে আল্লাহ তায়ালারই বাণী। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা ও গাইড লাইন যুগে যুগে মানুষের নিকট প্রেরণ করেছেন এ জন্যই যে সৃষ্টির প্রথম মানব ও মানবী হযরত আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ) কে পৃথিবীতে প্রেরণ কালীন এ নির্দেশনা প্রেরণের ওয়াদা করেছিলেন। এরশাদ হয়েছিল কোরআনের ভাষায় এ ভাবে “কূলনাহবিতুমিনহা জামীয়া, ফাইম্মা ইয়া’তিয়ান্নাকুম মিন্নি হুদান ফামান তাবিয়া হুদায়া ফালা খাওফুন আ’লাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহজ্বানূন” (সুরা বাকারা  : আয়াত-৩৮)। অর্থাৎ আমি (তাদের) বললাম, তোমরা সবাই (এবার) এখান থেকে নেমে যাও, তবে (যেখানে যাবে অবশ্যই সেখানে) আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে (জীবন বিধান সম্পর্কিত), হেদায়াত আসবে। অতঃপর যে আমার সে বিধান মেনে চলবে (তার কিংবা) তাদের কোন ভয় নেই, তাদের কোন প্রকার উৎকণ্ঠিত ও হতে হবে না।

মহান আল্লাহ পরম দয়ালু ও মেহেরবান এবং অতিশয় ওয়াদা পালনকারী। তিনি কখনও ওয়াদার বরখেলাফ করেন না। সেজন্যই যুগে যুগে নবী রসুল পাঠিয়ে মানুষের সাথে কৃত ওয়াদা পালন করে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় আর্বিভূত হয়েছেন শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহ্ম্মাদ (সাঃ) যার নিকট নাযিল হয়েছে মহাগ্রস্থ আল কোরান। এতে রয়েছে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর ২৩ বৎসরের নবুয়তী জীবনে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আসা সকল প্রকারের নির্দেশনা যা তাঁর প্রতি ওহী আকারে নাযিল হয়েছে। মানুষকে দুনিয়ায় সঠিক পথে পরিচালনার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই দিক নির্দেশনা পাঠিয়েছেন নবী রসুল ও পয়গম্বরগণের মাধ্যমে এ নির্দেশনাই একমাত্র নির্ভুল। এর মোকাবেলায় রয়েছে মানুষের নিজের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা প্রণীত জীবন পরিচালনার পদ্ধতি। মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মনুষের তৈরি জীবন যাপন পদ্ধতি মানুষের জন্য যথাযথ হতে পারে না। অনদিকে আল্লার জ্ঞান কোন সীমাদ্বারা আবদ্ধ নয় ফলে আল্লাহই পারেন মানুষের সব প্রয়োজন পুরন করতে। ইতোপূর্বে আমরা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন সমূহের কথা উল্লেখ করেছি। মানুষের সর্ব প্রথম প্রয়োজন খাদ্য যা উৎপাদনে প্রয়োজন পানির। অনুরূপভাবে বাসস্থান ও আসবাব পত্র তৈরিতে প্রয়োজন কাঠ যা উৎপাদনেও প্রয়োজন পানি বা বৃষ্টি। মানুষের বসবাসের পরিবেশ কে উপযোগী রাখার জন্য সবুজ গাছ গাছালী প্রয়োজন তা ও পানি ব্যতীত উৎপন্ন হতে পারেনা। এ পানি সরবরাহে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্থাপন করেছেন এক অতীব সুন্দর বিতরণ ব্যবস্থা। দুনিয়ার নদ-নদী, খাল-বিল, সাগর-মহাসাগরে পানির অভাব নেই। কিন্তু সেই পানি এ গাছ পালা, ফল ফলাদী ও শস্য উৎপাদনে কিরূপে ব্যবহৃত হবে? এ ছাড়া অল্প কয়েকটি উৎস ব্যতীত অন্যান্য সকল উৎসের পানি লবণাক্ত। এ লোনা পানির বেশীর ভাগই গাছ পালা ও শস্য উৎপাদনে সরাসরি কাজে লাগনো যায় না। পরম কুশলী মহান আল্লাহ এ পানি কাজে লাগানোর প্রকৃতিক বিধান স্থাপন করেছন যার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ একমাত্র তাঁরই হাতে। তিনি যেমনি সৃষ্টি করেছেন অফুরন্ত পানির সাগর মহাসাগর তেমনি পৃথিবী পৃষ্ঠে স্থাপন করেছেন উঁচু উঁচু পাহাড় ও পর্বতমালা। সূর্যকে পৃথিবী থেকে এমন দুরত্বে স্থাপন করেছেন যেখান থেকে তাপ দিয়ে সাগর মহাসাগরের কিছু পানিকে বাস্পাকারে পৃথিবী সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলে উঠিয়ে নেন যা মেঘমালার আকারে ভেসে বেড়ায়। প্রয়োজন ও মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনা অনুযায়ী সে মেঘ থেকে বৃষ্টির আকারে তা বর্ষিত হয়। এ ছাড়া এ মেঘ উঁচু পাহাড় পর্বতের চুড়ায় বাধা পেয়ে বৃষ্টির আকারে আবার পৃথিবীতে নেমে আসে। সৃষ্টি হয় ঝর্না ও নদীর এবং পরিশেষে আবার তা এসে মিলিত হয় সাগর মহাসাগরের পানির সাথে। এ এক অতি সুক্ষ ও বিজ্ঞানময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। মানুষের ক্ষমতায় যা আদৌ সম্ভব নয়। মহা বিজ্ঞানী ও কর্মকুশলী আল্লাহ তায়ালার পক্ষেই তা সম্ভব। ভূ পৃষ্ঠের কোথায় কখন বৃষ্টি হবে তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই নির্ধারণ করেন। এ সম্পর্কে কোরানুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ওয়াহুয়াল্লাজী ইউরছিলুর রিয়াহা বুশরাম বাইনা ইয়াদাই রাহমাতিহী, হাত্তা ইজা আক্বাল্লাৎ ছাহাবান ছিকালান ছুক্বনাহু লিবালাদিম মায়্যিতিম ফা আনজালনা বিহিল মা আ ফা আখরাজনা বিহী মিন কুল্লিস ছামারাত। কাজালিকা নুখরিজুল মাওতা লা’আল্লাকুম তাশকূরুন। (আল আরাফ: আয়াত-৫৭)।

অর্থাৎ তিনিই সে মহান আল্লাহ যিনি (যখন বৃষ্টি বর্ষণের ইচ্ছা করেন তখন) বাতাসকে রহমতের (আগাম) সুসংবাদবাহী হিসাবে (জনপদের দিকে) পাঠান, শেষ পর্যন্ত যখন সে বাতাস ভারী মেঘমালা বহন করে (চলতে থাকে) তখন আমি তাকে একটি মৃত জনপদের দিকে পাঠিয়ে দেই, অতঃপর (সে) মেঘমালা থেকেই আমি পানি বর্ষণ করি এবং তা দিয়ে (জমিন থেকে) সব ধরনের ফল মূল বের করে আনি; এভাবেই আমি মৃতকে জীবিত করে (মাটি থেকে) বের করে আনব সম্ভবতঃ এ নিদর্শন থেকে তোমরা কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। (চলবে)

*লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত)

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *