ভবিষ্যত “খাদ্য উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তায়” বাংলাদেশের করণীয়

 

ড. মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার

বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত উপ-উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের দেশ। প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর জমির এ দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সম্ভব। বিবিএস ২০১৪-১৫ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৩০ লাখ এবং প্রতি বছর ২০-২২ লক্ষ লোক জনসংখ্যায় যোগ হচ্ছে। ধারনা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি ১.৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন লোক সংখ্যা হবে প্রায় ২৩.০কোটি হবে। এই বাড়তি জনগোষ্ঠির খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ আবশ্যক। জিডিপিতে কৃষি সেক্টরের অবদান ১৫.৩৩% এবং কৃষি সেক্টরে ফসল খাতের অবদান ৫৪.২৭% (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬)। বৈশ্বিক হিসেবে, বিশ্বের ১৬ কোটি হেক্টর ধানি জমিতে ৪৭ কোটি টন চাল উৎপন্ন হয়। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের যে জনসংখ্যা হবে তার চাহিদা পূরণ করতে প্রয়োজন হবে আরও ২৫ ভাগ বাড়তি উৎপাদন। ইউএনডিপির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ২.৮৫ ভাগ এবং ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ১.২২ ভাগে। বর্ণিত হিসেবে বাংলাদেশে ২০৫০ সালে  জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২১ কোটি ৫৪ লাখ এবং স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে অর্থাৎ ২০৭১ সালে ২৪ কোটি ২৮ লাখে এসে স্থিতিশীল হবে (BRRI ২০১৫)। সর্বোপরি ২৫ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করার চিন্তা মাথায় রেখে বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে (BRRI ২০১৫)।

সরকারের জনবান্ধব কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি সারে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি এবং তেলের মুল্য হ্রাস, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, উন্নত মানের ধানের বীজ সরবরাহ, প্রতিকূলতা সহিঞ্চু জাত উদ্ভাবন ইত্যাদি কর্মকান্ডের ফলে বিগত বছরগুলোয় চালের উৎপাদন ৩.৪ লক্ষ টন হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দানা শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূত সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৪৭ লাখ টন। শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে ৪ কোটি ৭২ লাখ টন এবং এর বিপরীতে ২০৫০ সালে ২১ কোটি ৫৪ লাখ লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টন অর্থাৎ ২০৫০ সালে দেশে ৯৩ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে।

বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় প্রধান প্রধান ফসল যেমন: ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তৈলবীজ, ফল ও সব্জি ফসলের উৎপাদন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শস্য বহুমুখীকরণ, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, গবেষণা ও সম্প্রসারণে অগ্রগতি সর্বোপরি সরকারের উপকরণ বিতরণ পলিসি এ সাফল্যের কারণ। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ধানের আধুনিক জাতগুলোর কৌলিতাত্ত্বিক অর্জন বা জেনেটিক গেইন ত্বরান্বিতকরণ। দেশে প্রতি বছর ফসলি জমি কমছে ০.৭৩% বা ৬৮,৭৬০ হেক্টর হারে (সূত্র এসআরডিআই-২০১৩)। ফলে চাষাবাদের  জমি সম্প্রসারণের সুযোগ কম। তাই দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে লাভজনক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবেলা, উপকরণসমূহ ব্যবহারে দক্ষতা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতি, কৃষি পণ্য সংরক্ষণ ও বিতরণসহ ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমিতে ক্রমবর্ধমান বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বাংলাদেশের কৃষির জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। এমতাবস্থায়, খাদ্য উৎপাদনের আনুভূমিক সম্প্রসারণ (Horizontal Expansion) রুদ্ধ হয়ে পড়ায় উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ (Vertical Expansion) অনিবার্য। ইতোমধ্যে ফসল উৎপাদনে উচ্চ ফলনশীল জাতের (HYV) সাথে সংকর (Hybrid)  জাত ব্যবহৃত হচ্ছে। বিটি (Bit) জীন সমৃদ্ধ বেগুন ও RB জীন সমৃদ্ধ আলুর নতুন জাত ও অন্যান্য জিএমও (GMO) বীজ  দ্বারা ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কৃষি উপকরণগুলোর মধ্যে বীজ হলো অন্যতম। শুধুমাত্র ভাল বীজ ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদনশীলতা প্রায় ২০% বাড়ানো যায়। বাংলাদেশের কৃষিতে ২৩% মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করা হয় এবং প্রায় ২০% বীজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষাপূর্বক প্যাকেটজাত করে কৃষকদের নিকট সরবরাহ/বিক্রি করা হয়ে থাকে। অবশিষ্ট ৮০% বীজ পরীক্ষা বিহীনভাবে খোলা অবস্থায় বিক্রি করা হয়;  যা দিয়ে কাংখিত ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়।

সরকার ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে খাল খনন, নদীতে রাবারড্যাম স্থাপনসহ বেশ কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সেচ সাশ্রয়ী ফসল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নুতনভাবে শস্য বিন্যাস (Cropping pattern) ঘটিয়ে ফসলের উৎপাদনশীলতা ও শস্যের নিবিড়তা (Cropping Intensity) বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে আধুনিক জাতগুলোর গড় ফলন ৩.১৭ টন/হেক্টর। অত্যাধুনিক প্রজনন কৌশল অবলম্বন ও মাঠ পর্যায়ে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে গড় ফলন ৪.৮২ টন/হেক্টর পর্যন্ত বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এজন্য প্রতি বছর ০.৪৪ টন/হেক্টর হারে জেনেটিক গেইন ত্বরান্বিত করতে হবে। জনগণের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে “পুষ্টি সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা” কার্যক্রম পরিচালনার ফলে খাদ্য তালিকায় গুণগত পরিবর্তন আসছে। জনগণ ভাতের পরিবর্তে রুটি ব্যবহার করছে এবং ফলমূল ও সবজির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ফসলের উন্নত জাত ও টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করে গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র বিমোচন করা হচ্ছে সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। ধান, গম, ভুট্টা, পাট, তুলা, আঁখ এবং অন্যান্য শস্য যেমনঃ কন্দাল ফসল, ডাল, তৈলবীজ, শাকসবজি, ফল, ফুল, মসলা ইত্যাদির নতুন জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণবিদগণ বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চল অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব ফসলের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির উপর জোর দিচ্ছেন। বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থা যেমন-খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা এবং অধিক তাপমাত্রা সহিষ্ণু তথা উচ্চফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণা অব্যাহত আছে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় কৃষি খাতের অন্যতম লক্ষ্য হলো জনগণের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় শক্তি যোগানের নিমিত্ত পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বৈচিত্রময় খাদ্য উৎপাদন। প্রতি বছর কৃষি জমি ঘরবাড়ি, রাস্তা ঘাট ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে জমি হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত সমস্যা, উপকরণ ব্যবহারে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব, ভূমির স্বাস্থ্য ক্ষয়, সংগ্রহোত্তর ক্ষতি, সংরক্ষণাগারের অভাব, উৎপাদন উপকরণসমূহে প্রয়োজনীয় ভর্তুকীসহ অন্যান্য কর্মকান্ডের অভাবে জনগণের খাদ্য চাহিদার সাথে মিল রেখে গুরুত্ত্বপূর্ণ ফসলসমূহের সামঞ্জস্যপূর্ন উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। সরকার সারের মূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছে এবং সহজে ব্যাংক থেকে কৃষকের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। তাই, সময়মত ন্যায্য মূল্যে মান সম্পন্ন বীজ চাষীদের দোরগোঁড়ায় পৌছে দিতে পারলে ফসল উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। প্রধান ও অপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ ফসলসমূহের টেকসই সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদন নিশ্চিতকরণে আরো বেশী বিনিয়োগ ও সংস্কার করা জরুরী।

সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির ন্যায় দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকেও উন্নয়নের জন্য মাষ্টার প্লান গ্রহণ করছে। সপ্তমপঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, জাতীয় কৃষি নীতি, জাতীয় বীজ নীতি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG)এর সাথে সঙ্গতি রেখে দেশের জনগণের পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা বিধানকল্পে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নিরাপদ খাদ্য (Safe food) উৎপাদন, পশ্চাৎপদ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাহাড়ি অঞ্চলে ফলের বাগান সৃষ্টি ও সবজি আবাদের বিস্তার এবং অনুন্নত চর অঞ্চলে সমন্বিত কৃষি সহায়ক প্রকল্পসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনকে ভবিষ্যত ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার সাথে মিল রেখে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরী। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কৃষি খাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। ফলে ফসল উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপি স্বীকৃত কৃষি ভর্তুকির হার বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কৃষি উৎপাদন বিষয়ক তথ্যাদি কৃষকের দোরগোঁড়ায় পৌঁছে দিতে ই-কৃষিকে আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বাজার ব্যবস্থায়ও আমূল পবির্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ সমূহঃ

১)            ক্রমান্বয়ে কৃষি জমি হ্রাস (বার্ষিক ০.৭৩% বা ৬৮,৭৬০ হেক্টর হারে) (সূত্র এসআরডিআই-২০১৩)।

২)           জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব যেমন: বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, উচ্চ তাপমাত্রা, নতুন নতুন   পোকামাকড় এবং রোগবালাই এর প্রার্দুভাব।

৩)          সেচের পানির অপ্রতুলতা;

৪)           পানি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব

৫)           ক্রমবর্ধমান হারে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া।

৬)          অধিক ফলন পার্থক্য; (High Yield Gap)।

৭)           উচ্চ মাত্রায় সংগ্রহোত্তর ক্ষতি; (২০ থেকে ৩৫%)।

৮)          মাটির উর্বরতা হ্রাস।

৯)           কৌলি সম্পদের অবক্ষয়।

১০)         অপর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থাপনা।

১১)         ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার।

১২)         গবেষণা ও সম্প্রসারণ খাতে অপ্রতুল বাজেট।

১৩)        ফলন সীমা (Yield ceiling) অতিক্রম করতে না পারা।

১৪)         কৃষি উপকরণ ব্যবহারে দক্ষতার অভাব।

১৫)        পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব।

১৬)        মানসম্পন্ন বীজের অপর্যাপ্ততা।

১৭)         শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষক সংযোগে দুর্বলতা।

১৮)        কৃষক প্রশিক্ষণের স্বল্পতা।

১৯)         পুষ্টি  সর্ম্পকে অজ্ঞতা।

২০)        খাদ্যাভাস পরিবর্তন না করা।

২১)         মাঠ পর্যায়ের সম্প্রসারণ কর্মীদের তদারকি এবং কমিন্টমেন্টের অভাব।

২২)        কৃষিকাজে তরুণ শ্রেণীর আগ্রহের অভাব।

২৩)       কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ধীরগতি।

২৪)        স্বল্প সুদে ঋণের অপ্রতুলতা; এবং ২৫) সংগ্রহোত্তর কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে উদ্যেক্তার অভাব।

চ্যালেঞ্জ উত্তরণে গৃহিতব্য পদক্ষেপসমূহঃ

১.            ফসলের উচ্চ ফলনশীল, পুষ্টিমান সম্পন্ন ও প্রতিকুল পরিবেশ সহিষ্ণু এবং স্থানভিত্তিক জাত উদ্ভাবন।

২.           বিলুপ্ত প্রায় ফসলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও  প্রজনন কাজে ব্যবহার।

৩.          উন্নত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন।

৪.           মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ।

৫.           কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ভিত্তিক লাগসই ফসল নির্বাচন ও ফসল বিন্যাস নির্ধারণ।

৬.          উত্তম কৃষি পদ্ধতি (Good Agricultural Practices) বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ।

৭.           জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি (খরা, বন্যা, জলাবদ্ধতা, অধিক তাপমাত্রা ইত্যাদি)

মোকাবেলায় গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ।

৮.          কৃষিতে জীব প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ ও পোকা-মাকড় প্রতিরোধী, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও উচ্চ তাপ ইত্যাদি সহিষ্ণু ফসলের জাত ও অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা।

৯.           পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের নিমিত্ত বৈচিত্রময় ফসল উৎপাদন।

১০.         শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা।

১১.         কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে উৎসাহিত করা।

১২.         সাপ্লাই ও ভেলুচেইন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উপর গবেষণা পরিচালনা করা।

১৩. এনএআরএস (NARS) কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসলের নতুন জাতের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রজনন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ।

১৪.         শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি উদ্ভাবন।

১৫.        উদ্ভাবিত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তর।

১৬.        কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) এর প্রয়োগ বৃদ্ধি করা।

১৭.         সমন্বিত খামার পদ্ধতি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা।

১৮.        কৃষিতে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানব স¤পদ উন্নয়ন, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করণ।

১৯.         উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ।

২০.        বর্ধিত জনগোষ্ঠির খাদ্য চাহিদা পূরণে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি গবেষণা, মাঠ ও কৃষক পর্যায়ে ফলনের পার্থক্য কমানো।

২১.         জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়নের লক্ষ্যে খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি (ফলিত পুষ্টি) সংক্রান্ত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

২২.        খাদ্যচক্রে (Food Chain) ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব (Heavy Metal) বিষয়ে গবেষণা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ।

২৩.       গণমাধ্যম ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারসহ কৃষি মেলা, বিশ্বখাদ্য দিবস, পুষ্টি সপ্তাহ, পরিবেশ দিবস ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সকল স্তরের জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ।

২৪.        বিভিন্ন শিক্ষাস্তরের কারিকুলামে ফিেলত পুষ্টি বিষয়ক পাঠসমূহ যথাযথ অন্তর্ভুক্ত বা হালনাগাদকরণ,  পাঠ প্রণয়ন এবং প্রণয়নে সহায়তা প্রদান।

২৫.        টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে ধানসহ অন্যান্য ফসলের আধুনিক জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৌলিতাত্ত্বিক অর্জন বা জেনেটিক গেইন ত্বরান্বিতকরণে ফসলের জাত উদ্ভাবনে জীব প্রযুক্তিসহ অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি;

২৬.       OBST কতৃক কৃষিতে মৌলিক গবেষণাকে উৎসাহ প্রদান।

২৭.        মাটির উর্বরতা ও সার ব্যবস্থাপনায় আইন প্রণয়ন এবং জমিতে জৈব সার ব্যবহার বাধ্যতামুলক করা।

২৮.       অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের জন্য উচ্চফলনশীল ধানের জাতের পাশাপাশি স্থান-ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, স্বাদু পানির পরিকল্পিত ব্যবহার, শস্য চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি, উপযুক্ত ফসল ভিত্তিক শস্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়ানো।

২৯.        পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বোরো চাষ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখাসহ কম পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা।

৩০.       আউশের আধুনিক জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ ; (ব্রি, বিনা)।

৩১.        ধানের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মধ্য-স্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ত, চাষিরা ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই সরাসরি কৃষকের নিকট হতে ধান সংগ্রহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৩২.       ফসল উৎপাদনে প্রয়োজন অনুযায়ী বালাই নাশক ব্যবহার করা এবং জীব বালাই নাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি করা।

৩৩.       শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষক সংযোগ জোরদার করা।

৩৪.       কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে প্রর্দশনী স্থাপন করে কৃষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা (চীনে কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়);

৩৫.       বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল ও নদী পুনঃখনন এবং ডিস্যালানাইজেশন ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভূ-উপরস্থ পানির

বর্ধিত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। রাবার ড্যাম, স্লুইস গেইট, ফ্লাস গেইট, ডাগ ওয়েল, হাজামজা পুকুর সংস্কার, আইল            ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পূর্বক সেচ সুবিধা উন্নয়ন করা।

৩৬.       বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষককে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের উপর দেশে/বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ বৃদ্ধি করা।

৩৭.       বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন।

৩৮.       কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার স্থাপন।

৩৯.       কৃষিপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র উদ্যেক্তা পর্যায়ে প্রণোদনা প্রদান এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা; এবং

৪০.চাষাবাদে যান্ত্রিকীকরণ উৎসাহিতকরণ।

উপসংহার:

আমরা জানি কৃষিতে নানাবিধ সমস্যা আছে যার সমাধান ও রয়েছে। আমরা কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট যা ধরে রাখতে হবে। হেক্টর প্রতি চাল উৎপাদনে চীন এবং ভিয়েতনামের পরে বাংলাদেশের অবস্থান (আমাদের সময়-১ এপ্রিল’ ২০১৫)। শ্রীলংকাতে গত ২০১৬ সালে ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানী  করা হয়েছে। তাপমাত্রা সহিঞ্চু গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্বি পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লক্ষ টন গমের চাহিদা রয়েছে, উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২-১৩ লক্ষ টন। যার জন্য খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ৩০-৩৫ লক্ষ টন গম আমদানি করতে হচেছ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০২ লক্ষ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে (২০১৬-১৭)। দেশের চাহিদা পূরণ করে সল্প পরিসরে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে। এ মূহুর্তে সবজি ও ফল খাওয়ার অভ্যাস বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। ডাল ও তৈল জাতীয় ফসলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভোজ্য তেলের প্রায় ৭০% ভাগ আমদানী করতে হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুড়া থেকে রাইস বার্ণ অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈল আমদানী দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানীর পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০% ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষীরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানীও কমেছে। তবে এবছর বন্যার কারণে পেঁয়াজ আবাদে দেরী হওয়াতে পিয়াজের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। সারা বছর ব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল ও আনারস চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টি নির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে কৃষক তার উৎপাদিত দ্রব্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছেনা এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষ করে ধান ও আলু সহ অন্যান্য ফসলে কৃষককে ফসল সংগ্রহের সময় উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করে মধ্যসত্ত্বা ভোগীদের দৌরাত্ব কমিয়ে বাজার ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। তবে এখানে কৃষককে সংগঠিত হতে হবে। যেখানে কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আর ও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

————————————–

লেখক:

কৃষি গবেষক ও পুষ্টিবিদ, উপ-পরিচালক (কৃষি সম্প্র: ও গ্রামীণ অর্থনীতি) জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি (নাটা)।

মোবাইল ঃ ০১৮১৫৫৯৭৩০৪

Email: dhossain1960@ yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare