ভাতের মাড়ের পুষ্টিগুণ

ড. মো. দেলোয়ার হেসেন মজুমদার

ভাতের মাড়কে ফেন বলা হয়। ভাত রান্নার পর মাড় নিংড়িয়ে ফেলে দেয়া গ্রাম বাংলার চির ঐতিহ্য। কোন কোন এলাকায় মাড় গরীবের খাদ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। হতদরিদ্র লোকদের মধ্যে মাড় খাওয়ার অভ্যেস লক্ষ্য করা যায়। অকাল বা দুুর্ভিক্ষের সময় মধ্যবিত্ত পরিবারেও এর এক সময় কদর ছিল। জঠরজ্বালা মেটাতে কিংবা পেট ভরাব জন্য মাড় খাওয়ার প্রচলন আছে। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা মাড় দেখলেই নাক ছিটকাতো। অথচ ভাতের মাড় পুষ্টিগুণে গরীব নয় বরং ধনী। ভাতের মাড় হলো চালের নির্যাস। চালের পুষ্টিমাণ ধান ছাঁটাইয়ের সময় নষ্ট হয়, সর্বশেষ অপচয় হয় ভাতের মাড় নিংড়ানোর সময়। এভাবে ভাত পুষ্টিশূন্য না হলে ও এতে পুষ্টি থাকে কম। চিন্তার বিষয় আসল জিনিসটা ফেলে দিয়ে ভাত নামক ছাবাটা আমরা খেয়ে থাকি। এর চেয়ে বোকামি আর কী হতে পারে ।

 

mar20150728144629

মাড়ের পুষ্টিগুণ:

ভাতের মাড়ে থাকে হরেক রকম পুষ্টিমান। গবেষণায় দেখা গেছে, ভাতের মাড়ে উল্লেখযোগ্য হারে ভিটামিন বি এবং ভিটামিন-ই রয়েছে। এছাড়া এতে রয়েছে আর্মিষ, শর্করা, লৌহ, ফসফরাস ও অন্যন্যা পুষ্টি উপাদান। আমরা মাড় নিয়ে না ভাবলেও বিশ্বের  বিভিন্ন দেশ নানা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। চীনা বিজ্ঞানী মিলিন ফেলে দেয়া ভাতের মাড় নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন ভাতের মাড়ে ক্যালসিয়াম, লৌহ, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, মেলেনিয়াম- এ ছয়টি উপাদান থাকে। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন মাড়ের মধ্যে লৌহ ১০ গুন, ক্যালসিয়াম ৪ গুন, ম্যাঙ্গানিজ ১২ গুন, কপার ৬ গুন ও মেলেনিয়াম ২ গুন রয়েছে। এছাড়াও আছে টোকোট্রাইনোল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ।

মাড়ের সাথে পুষ্টির অপচয়:

আমাদের দেশে প্রচলিত নিয়মে মাড় নিংড়িয়ে ফেলে দেয়ার কারণে পুষ্টির মারাত্মক অপচয় হয়। আমরা যদি জানতাম কি পরিমাণ পুষ্টি মাড়ের সাথে  চলে যায় তাহলে হয়তো কখনো এ অপচয় করতাম না। আসুন দেখে নেই মাড় নিংড়ানোর দরুন কী পরিমাণ পুষ্টিহানি হয়ে থাকে: পুষ্টি উপাদান এবং মাড় নিংড়ানো জনিত পুষ্টিহানি (শতকরা) ক্যলরি ১৫%, আর্মিষ ১৫%, শর্করা ১০%, লোহ ৫০%, ফসফরাস ৫০%, আয়োডিন ৪০%, রিবোফোভিন ২৫%, নায়াসিন ২৩% এবং ক্যালসিয়াম ৫০%।

পুষ্টি রক্ষার উপায়:

১. আমরা বাঙালিরা আতপ চাল ও ডালের খিচুড়ি ও জাউ খাওয়ার অভ্যস্ত। পুষ্টি বিবেচনায় এ ধরণের রান্নাই উত্তম। এভাবে প্রায় শতভাগ পুষ্টি রক্ষা পায়।

২. আমাদের দেশের সিলেট, চট্রগ্রাম ছাড়াও কিছু কিছু এলাকায় বটি ভাত খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এ ভাত রান্নায় চাল ও পানির অনুপাত এমন মাপে দেয়া হয় যে, চাল ফুটে ভাত হওয়ার সাথে সাথে পানি শুকিয়ে যায়। এ সহজ প্রযুক্তিতে রান্না করা হলে মাড় নিংড়ানোর প্রয়োজন পড়েনা। এতে পুষ্টিহানির আশংকা নেই বললেই চলে। আমরা বটি ভাত খাওয়ার অভ্যেস করে ভাতের পুষ্টি সংরক্ষণ করতে পারি।

৩. নি¤œ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে ভাতের মাড়ের সাথে জলপাই বা তেতুলের টক, গুড়া চিংড়ি ডালের মতো রান্না করে খাওয়ার প্রচলন আছে। এতেও পুষ্টি রক্ষা পায়।

৪. ভাতের মাড়ের সাথে লবণ ও ঝাল সুমেত স্যুপ রান্না করে খাওয়া যায় । সাধারণ স্যুপ বা থাই সুপ্যের মতো চিংড়ি বা মুরগির গোশত সমেত রান্না করে একে মজাদার করা যায়।

মাড়ের ঔষুধি গুণ: ভাতের মাড়ের মধ্যে রয়েছে নানা বিস্ময়কর ঔষুধিগুণ।

*             যারা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন তাদের জন্য ভাতের মাড় হিতকর। এর কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই।

*             ভাতের মাড়ে যথেষ্ট গ্লুকোজ থাকে। ফলে রক্তে পর্যাপ্ত শর্করা সরররাহ করে। ডায়াবেটিসের ঝুকি উপশমে ভাতের মাড় উপকারী।

*             মাড় কোষ্ঠকাঠিন্য হ্রাস করে এমনকি ক্যন্সারের ঝুকি কমায়।

*             মাড় সহজ প্রাচ্য। তাই গ্যাস্ট্রিকের রোগীদের জন্য হিতকর। মাড় আলসারের ঝুকিও কমায়।

*             মানবদেহের মেলানিন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে মাড় বাধা দেয়। তাছাড়া সূর্যের আল্টাভায়োলেট রশ্মি যাতে দেহে প্রবেশ করতে না পারে তাতেও মাড় বাদ সাধে।

*             ভাতের মাড়ে যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে এন্টি-অক্সিডেন্ট ও স্টেরয়েড থাকে। খেলোয়াড়রা মাংসপেশীকে অধিক শক্তিশালী ও কর্মক্ষম রাখতে বাজার থেকে স্টেরয়েড বড়ি কিনে খান। এ বড়ি খেলে কারো কারো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে এবং হিতে বিপরীত হতে পারে। অথচ ভাতের মাড়ে প্রাকৃতিক স্টেরয়েড থাকায় মাংসপেশীতে অধিক শক্তিশালী ও কর্মক্ষম রাখে অথচ এতে কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব নেই।

রুপ-চর্চায় মাড়:

জাপান সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সৌন্দর্য পিপাসু মেয়েরা ভাতের মাড় ব্যবহার করে থাকেন। মুখে ভাতের মাড় মাখলে ত্বকের রঙ উজ্জল হয় এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। আমাদের দেশে বিউটি পার্লার গুলোতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির অন্যতম উপাদান হিসেবে মাড়ের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ভাতের মাড়ে রয়েছে বহুরুপী গুন, যা মোটেই ফেলনা নয়।

পুষ্টির গুরত্ব:

বাংলাদেশে এখানো প্রতি ৩ জনে  ১ জন পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। শতকরা ৪০ ভাগ শিশু বয়সের তুলনায় খর্বকায়। এখনও শতকরা ৭৭ ভাগ ক্যালরি গ্রহণ করে ভাত থেকে। আর শতকরা ৫০ ভাগ প্রোটিন আসে ভাত থেকে। যেহেতু ভাত বাঙ্গালির প্রধান খাদ্য। অতএব ভাতের মাড়ের পুষ্টিগুণ সর্ম্পকে এখনই এর ব্যাপক প্রচার করা উচিত।  চট্রগ্রাম  ও সিলেট অঞ্চলের  লোকদের মত দেশের অন্যান্য অঞ্চলের লোকদের বইটাভাত খাওয়া অভ্যাস করা এবং এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সবাইকে সজাগ করা উচিত। আর এটা সম্ভব হলে মানুষের পুষ্টিহীনতা ভুগার হার একটু হলেও কমবে বলে আশা করা যায়। এর সাথে খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করে ভাত একটু কম গ্রহণ করে প্রতিদিন অন্তত একটি ফল ও পরিমাণ মত সবজি খেলে মানুষের পুষ্টিচাহিদা অনেকাংশে পূরণ হত। এতে মানুষ সাধারণ অসুখে কম ভুগতো এবং ডাক্তারের কাছে কম যাওয়া লাগতো। এ ব্যাপারে গণ মাধ্যম গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ ভাত খায় সব দেশে বইটা ভাত খাবার অভ্যাস প্রচলন আছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এর মধ্যে অন্যতম। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। অতএব গ্রাম সহ শহরের আপামর জনসাধারণ কে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনা সৃষ্টি করা একান্ত জরুরি।

————————————–

লেখক:

কৃষি গবেষক ও পুষ্টিবিদ, উপ-পরিচালক, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি গাজীপুর।

মোবাইলঃ- ০১৮১৫৫৯৭৩০৪

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *