ভাসমান খাঁচায় মাগুর মাছের চাষাবাদ কৌশল

জান্নাতুল ফেরদৌস

ভাসমান খাচায় বিলুপ্ত প্রায় মাগুর মাছ চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সফলতা অর্জন করেছে। এর সহজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যম ভাসমান খাঁচায় সুস্বাদু উচ্চমূল্যের দেশীয় মাগুর মাছ চাষ করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী ও পুষ্টির অভাব পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ একটি ফলপ্রসূ ও উৎসাহব্যঞ্জক প্রযুক্তি। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন নদ নদীতে খাঁচায় তেলাপিয়া মাছের চাষ হচ্ছে। কিন্তু দেশীয় প্রজাতির মাছ যেমন পাবদা, গুলশা, মাগুর, শিং ইত্যাদি খাঁচায় চাষের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছে। বিগত কয়েক বছর ধারাবাহিক গবেষণার পর অবশেষে খাঁচায় বিলুপ্ত প্রায় মাগুর মাছ চাষের লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সফলতা আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে খাঁচায় মাছচাষ নতুন আঙ্গিকে শুরু হলেও বিশ^ অ্যাকুয়াকালচারে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের ইতিহাস অনেক পুরোনো। আনুমানিক ৭৫০ বছর আগে চীনের ইয়াংঝি নদীতে সর্বপ্রথম খাঁচায় মাছচাষ শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের জলাশয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ উপযোগী আকারের খাঁচা স্থাপন করে অধিক ঘনত্বে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদনের প্রযুক্তি হলো খাঁচায় মাছচাষ। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^র মানচিত্রে জায়গা করে নিলেও এখনও পর্যন্ত আমাদের বিশাল জলজ সম্পদকে যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে সুষম উৎপাদনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভবপর হয়নি। বর্তমানে আমাদের দেশের মুক্ত জলাশয়ে প্রতি শতাংশ হতে মাত্র ১.০ কেজি মাছ উৎপাদিত হয়। অথচ বদ্ধ জলাশয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতি শতাংশে উৎপাদিত মাছের পরিমাণ ১১ কেজিরও বেশি। ইতোমধ্যে দেশের বদ্ধ জলাশয়সমূহ থেকে চাষাবাদের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তা দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠির প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। দেশের বিশাল এ মুক্ত জলাশয়  প্রধানত ব্যবস্থাপনা নির্ভর সম্পদ হওয়ায় বদ্ধ জলাশয়ের চেয়ে এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত চাষাবাদের বিষয়টিকে পূর্বে ততোটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় সম্ভাবনাময় বিভিন্ন ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে দেশের মুক্ত জলাশয়গুলোকে সঠিক ব্যবহারের আওতায় এনে সহনশীল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভূক্ত করা না হলে চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলবে। এজন্য মুক্ত জলাশয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তবেই খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি জাতীয় চাহিদার নিরিখে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

ভাসমান খাঁচায় মাগুর মাছ চাষের সুবিধা

             মুক্ত জলাশয়কে যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সহজ ব্যবস্থাপনায় ভাসমান খাঁচায় মাছচাষ করা যায়।

             অধিক ঘনত্বে খাঁচায় মাগুর মাছ চাষ করে আশানুরূপ উৎপাদন পাওয়া সম্ভব

             অক্সিজেন সংবেদনশীল হওয়ায় প্রবাহমান পানিতে এ মাছ সহজেই চাষ করা যায়।

             নদীর পানিতে তাপমাত্রার তারতম্য খুব কম হয় বিধায় মাছের রোগ বালাই অপেক্ষাকৃত কম হয়।

             প্রবাহমান থাকায় খাঁচার অভ্যন্তরে পানি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। ফলে পুকুরের চেয়ে অধিক ঘনত্বে এ মাছ চাষ করা যায়।

খাঁচা স্থাপনের উপযোগী স্থান

             নদীর এমন অংশ যেখানে একমুখী প্রবাহ কিংবা জোয়ার ভাটার শান্ত প্রবাহ বিদ্যমান এমন স্থান খাঁচা স্থাপনের জন্য উপযোগী। নদীর মূল প্রবাহ অর্থাৎ ¯্রােত যেখানে অত্যধিক বিদ্যমান এমন স্থানে খাঁচা স্থাপন না করাই ভালো। নদীতে প্রতি সেকেন্ডে ৪-৮ ইঞ্চি মাত্রার পানি প্রবাহে খাঁচা স্থাপন মাছের জন্য ভালো। লক্ষ্য রাখা দরকার পানি প্রবাহের এ মাত্রা সর্বোচ্চ সেকেন্ডে ১৬ ইঞ্চি এর বেশি হওয়া উচিত নয়।

             স্থানটি লোকালয়ের নিকটে স্থাপন করতে হবে যেন সহজেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

             খাঁচা স্থাপনের স্থান থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে উৎপাদিত মাছ সহজে বাজারজাত করা যায়

             খাঁচা স্থাপনের কারণে যেন কোন ভাবেই নৌ চলাচল বিঘœ না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

             শিল্প-কারখানার বর্জ্য কিংবা পয়ঃনিষ্কাশন পানি অথবা কৃষি জমির সাথে সংযোগ রয়েছে এমন স্থান খাঁচা স্থাপনের জন্য নির্বাচন না করাই উত্তম।

ভাসমান খাঁচা তৈরির উপকরণ, প্রস্তুত ও স্থাপন পদ্ধতি

             খাঁচায় মাগুর মাছ চাষের জন্য ১.০ সে.মি. ফাঁসের নটলেস পলিইথিলিন জাল ও খাঁচার উপরিভাগ ঢাকার জন্য ৭.০-৭.৫ সে.মি. ফাঁসের কড়ের জাল ব্যবহার করা উত্তম

             সাধারণত ১৮ (৩ঢ৩ঢ২) ঘনমিটার আকারের জালের খাঁচা মাগুর মাছ চাষের জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে।

             অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের জালের খাঁচায় মাছ চাষের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা সহজতর হয়।

             খাঁচার তলদেশ এবং চারপাশে খাঁচা তৈরির জাল দিয়ে সেলাই করে আটকে দিতে হবে। অতঃপর উপরিতলে ঢাকনার জাল সেলাই করে দিতে হবে।

             নদীতে খাঁচা স্থাপনের জন্য প্রথমে খাঁচার মাপের বাঁশের তৈরি ফ্রেম প্লাস্টিকের ড্রামের সাথে বেঁধে পানিতে স্থাপন করা যেতে পারে অথবা বাঁশের খুটির সাথে বেঁধে দেয়া যেতে পারে।

             খাঁচার চার কোনায় প্লাস্টিক রশির লুপ বেঁধে ফ্রেমের সাথে জাল পানিতে ঝুলিয়ে স্থাপন করতে হবে।

             নদীর নির্দিষ্ট স্থানে খাঁচা সারিবদ্ধভাবে বিন্যাস করার পর চতুর্দিকে বাঁশের বেষ্টনী তৈরি করতে হবে।

             খাঁচাগুলিকে দুইপাশে মোটা প্লাস্টিক রশি দ্বারা বেঁধে জলাশয়ের পাড় থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে নোঙ্গরের সাহায্যে স্থাপন করতে হবে।

খাঁচায় পোনা মজুদকরণ

             সুস্থ-সবল পোনা ও সঠিক মজুদ ঘনত্ব নির্ধারণ খাঁচায় মাছ চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

             পোনা মজুদের ক্ষেত্রে পোনার ওজন গড়ে ২.৫-৩.০ গ্রাম হলে ভাল হয়।

             খাঁচায় প্রতি ঘনমিটারের গড়ে ২০০টি মাগুর মাছের সুস্থ সবল পোনা ৫-৬ মাস চাষ করে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

             মজুদ খাঁচায় পোনা ছাড়ার পূর্বে নার্সারি পুকুরে পোনাগুলোকে অন্তত ১-১.৫ মাস লালন করে নিলে খাঁচায় পোনার মজুদের পরে মৃত্যুর হার কম হয়।

খাদ্য প্রয়োগ

             খাঁচায় অধিক মজুদ ঘনত্বে মাছচাষ করা হয় বিধায় মাছের বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের ভূমিকা নেই বললেই চলে। এ কারণে বাহির হতে সরবরাহকৃত সম্পূরক খাদ্যের উপর মাছের বৃদ্ধি নির্ভর করে। তাই লাভজনকভাবে খাঁচায় মাছ চাষের খাদ্য নির্বাচন ও প্রয়োগ অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

             ভাসমান খাঁচায় মাগুর মাছ চাষের ক্ষেত্রে সম্পূরক খাদ্যে কমপক্ষে ৩৫-৪০% প্রোটিন থাকা আবশ্যক।

             চাষকালীন ১ম দুই মাস ২০-১৫%, পরবর্তী ২ মাস ১২-৮% এবং শেষ দুই মাস ৬-৫% হিসেবে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।

             অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে ভাসমান পিলেট জাতীয় খাদ্যই বেশি উপযোগী।

             স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পিলেট খাদ্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে খাঁচার ভিতর ফিডিং ট্রে ব্যবহার করতে হবে।

             ভাসমান পিলেট জাতীয় খাদ্য দৈনিক ২/৩ বার যতক্ষণ খাঁচার মাছ খাদ্য গ্রহণে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

             প্রতি ১৫ দিন পরপর একবার খাঁচায় মাছ নমুনায়ন করে সরবরাহকৃত সম্পূরক খাদ্যের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যেতে পারে।

পরিচর্যা

             উন্মুক্ত জলাশয়ে অধিক ঘনত্বে খাঁচায় মাছ চাষের ক্ষেত্রে জলাশয়ের শ্যাওলাসহ বিভিন্ন ধরণের কীটপতঙ্গ ও পরজীবী খাঁচার জালকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে গ্রহণ করে, যার ফলে জালের ফাঁস দিয়ে পানি প্রবাহ কমে যায়। ফলে খাঁচার মাছ বিভিন্ন প্রকার রোগসহ পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

             খাঁচার তলদেশের অব্যবহৃত খাদ্য নিয়মিত পরিষ্কার করে খাঁচার পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে হবে।

             ¯্রােতে ভেসে আসা জলজ উদ্ভিদ/আগাছা যেন খাঁচার বাহিরে জমা হয়ে পানি প্রবাহ কমিয়ে না দেয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

             নিয়মিত ব্রাশ দিয়ে খাঁচা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এ সময় পানি যেন অধিক ঘোলা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

             প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার সরবরাহ থেকে বিরত থাকতে হবে।

মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ

             মাছ একত্রে আহরণ অপেক্ষা ৪-৫ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে ৬ মাস পর্যন্ত বেছে বড় মাছ আহরণ করলে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

             ভোরবেলা মাছ আহরণ করা উত্তম

             আহরণের পর মাগুর মাছ দ্রুত বাজারে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

             এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ১৫-১৬ কেজি উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।

             যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল হলে দ্রুত তাজা মাছ বাজারে নিয়ে যাওয়া যায় এবং অধিক মূল্য পাওয়া যায়।

খাঁচায় মাগুর মাছ চাষের আয়-ব্যয়ের হিসাব

একটি ১৮ (৩ঢ৩ ঢ ২) ঘনমিটার আকারের ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষে ছয় মাসে উৎপাদিত মাগুর মাছের আয়-ব্যয়ের হিসাব:

 

 

————————————–

লেখকঃ পাবলিসিটি ও পাবলিক রিলেশন অফিসার, বিএফআরআই, ময়মনসিংহ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare